তোমায় পাই নি বলে…

আমি তোমায় পেতে গিয়েও পাই নি
তাই কাউকেও পেতে দেই নি এই আমাকে!
আমি তোমায় ধরতে চেয়েও
কেবল ব্যর্থতাই পেয়েছি।
ছুটে গেছে আকাংখিতের বাড়ানো সেই হাত।
প্রাপ্তির খাতায় তাই নিঃস্বতা
হাসে অপার বেদনার্ত চোখে।
এখন শুধু মন নিয়ে খেলি…
আমি চৌকস খেলোয়াড় হয়ে গেছি।
আজ আমার সকল আগল খোলা
আজ কেবল খেলতেই ভালোবাসি!

আমি তোমায় হারিয়ে ফেলেছি।
তাই কোথাও লিখি না মনের ঠিকানা।
খুলে রাখি, হা হা বিষম ঔদাসীন্যে
খুলে রাখি দেহের সকল তালা!
নির্বিবাদে চোখ মুদে থাকি…
আসলে আসুক যত পারে
মৌসুমের সম্ভোগী প্রজাপতি…
করি না পরোয়া!

আমি তোমার নাগাল পাই নি
তাই কাছে থেকেও কেমন থাকি অধরা!
আমি তোমাকে ছুঁতে পারি নি
যদিও বুকে ছিলো শত জনমের তৃষ্ণা!
আমি তোমায় পাই নি
তাই কাউকেও পেতে দেই নি জমানো হৃদয়-মালা।
কত বসন্ত এলো গেলো,

কত কোকিল গান শোনালো…
তবুও মেটে কি হায়

সেই কবেকার পাওয়া বিষম জ্বালা!

আমি তোমায় পাই নি
তাই মন নিয়ে আক্রোশে খেলি।
আলগা খাঁচায় প্রগলভা পাখি পুরে
সৃষ্টিছাড়া আনন্দ খুঁজি!
আমি খেলি, এখন কেবলই খেলি।
আমি খেলোয়াড় হয়ে গিয়েছি!
আর অভিমানে ঈশ্বরকে দেই নিকৃষ্টতম অভিশাপ।
একটা মনই তো চেয়েছিলাম…
এই কি আমার আজন্মের পাপ!

প্রথম প্রকাশঃ প্রজন্ম ফোরাম (এপ্রিল ২০১৩)

একটু কান্নার জন্য!

একটু কান্নার জন্য করি আকুতি
যদি ঝরতো জল অঝোরে এক নদী,
মন হালকা হতো।
দেখাতে পারতাম যদি
বুকের চাপা কষ্টগুলো!
কেমন মুখ বুজে সই
যত আঘাত – সংহারি…
মন হালকা হতো।
ভালোবাসতে পারতাম যদি
নিঃশেষ উপেক্ষা,
দিন শেষের মন উথালি-পাথালি…
মন হালকা হতো।
আঁকতে পারতাম যদি
বিস্মৃতির ধোঁয়াশা!
যন্ত্রণার নীলে মিশতো
উদাসীনের ধূসরতা…
মন হালকা হতো।
যদি কাঁদতে পারতাম
এক বুক হাপুস নয়ন –
সমর্পনে নির্বাপন অন্তর্দহন…
মন হালকা হতো!

কিন্তু এ চোখ অশ্রুবিহীন
আঘাতে আঘাতে পাথর – যেন অনুভূতিহীন!
বুক ফাটে তবু চোখ ফাটে না
ভরা বেদনায় রুদ্ধ এ কণ্ঠ
তবুও জল গড়ায় না!

আহ, কাঁদতে পারতাম যদি
দু’কূল ছাপাতো মৌনতায় স্তব্ধ
পাথরের হৃদয় নদী…
মন হালকা হতো!

প্রথম প্রকাশঃ প্রজন্ম ফোরাম (মার্চ ২০১৩)

অন্তরঙ্গে নিমীলিত তোমার আঁখি!

তোমার নিমীলিত আঁখি
তিরতির কাঁপা পল্লব যেন আচঞ্চল পাখি!
কী কথা বলে নীরবে, কে জানে?
আমি শুধু চেয়ে থাকি পূর্ণ চোখে…
অথচ তুমি থাকো নীরবে নতমুখে।
যতই টানি কাছে, খুব কাছে
কেন যাও সরে? দূরে, আরো দূরে।

তোমার নিমীলিত আঁখি
আমি অবাক চোখে চেয়ে দেখি।
কপট রাগে সরিয়ে মুখখানি
কেন রাখো ঝুলিয়ে হন্তারক হাসি!
আমি ব্যাকুল, কেবলই ভাসি
ভরা জোয়ারে তৃষ্ণার জল খুঁজি।
আর ছুঁতে চাই গভীর আশ্লেষে
দু’ঠোঁটে কামনার নীরব খুনসুটি!

তোমার নিমীলিত আঁখি…
আমি উদ্বেল উদাসীন,
নির্বিবাদে তোমাতে মিশি।
ভালোবাসি সখি, ভালোবাসি
কেবল তোমার আরাধনাই করি!

অন্তরঙ্গ

অভিমান

ঘড়িতে এগারোটা বেজে পঁচিশ মিনিট।

লীনার উদ্বেগ বাড়তেই থাকে। ছেলেমানুষি উদ্বেগ। কিন্তু অস্বীকারের উপায়ও নেই! আরমান বিছানায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আজকে যেন একটু বেশিই আগে ঘুমাতে গেছে। ও নিশ্চয়ই ভুলে গেছে। চোখ ফেটে কান্না আসে লীনার।

চার রুমের ছিমছাম গোছানো ফ্লাটটিতে বড্ড নিঃসঙ্গ বোধ করতে থাকে লীনা। বাইরের বিনিদ্র ট্রাফিকের একটানা চাপা শব্দ ছাড়া আর কোনো সাড়া নেই। পায়ে পায়ে বারান্দায় এসে পৌঁছায়। চমৎকার জ্যোৎস্না ফুটেছে আজ। অন্ধকার বারান্দায় চাঁদের রুপালি আলো গলে গলে পড়ছে। মায়াময় সেই আলোতে কেন জানি আরো বিষন্ন হয়ে যায় লীনা।

বেতের চেয়ারে এলিয়ে পড়ে লীনা। বড় ক্লান্ত বোধ করে। এই ক্লান্তিটা দেহের নাকি মনের – ঠিক ঠাহর হয় না। সারাদিন অফিস করে ক্লান্ত হয়ে পড়াই স্বাভাবিক। কিন্তু সে তো রোজই করে এবং এক ধরণের অভ্যাসও হয়ে গেছে। তবে কি মনে ক্লান্তি?

লীনার বুকে অভিমানের ঝড় উঠতে থাকে। গলায় কী একটা দলার মত আটকে থাকে। গতবার আরমান কিন্তু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো কোনোভাবেই ভুলে যাবে না। আর এমন একটা দিন মানুষ ভোলে কীভাবে? পাঁচটা বছর কি যথেষ্ট নয় একটা বিশেষ দিন মনে রাখবার জন্য?

লীনার এখনো ভালো মনে আছে সেই দিনটির কথা। বাবা কোত্থেকে একটা সরল চেহারার ছেলের সন্ধান এনে হাজির করলেন। লীনার মতই ভালো চাকুরে। লীনার ক্ষনস্থায়ি সব প্রেমই তখন অতীত। না না করেও এবং প্রথমে দেখে গোপনে নাক কুঁচকালেও কেন জানি রাজী হয়ে যায়! চেহারা খানিকটা বোকাটে হলেও চোখগুলো অদ্ভুতভাবে উজ্জ্বল! আর কেমন মায়া মায়া…যেন ডেকে বলছেঃ ‘আমার কেউ নেই, একটু জায়গা দেবে?’

তো জায়গার বন্দোবস্ত খুব শীঘ্রই হয়ে গেলো। তারিখটা ফেব্রুয়ারির একটা বিশেষ দিনে! বন্ধুবান্ধবেরা পঁচিয়ে মারল। তাদের দৃঢ় ধারণা – আগে থেকেই এই পরিচয় – ডুবে ডুবে গভীর দরিয়ার জল পান করেছে ওরা। ওদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। লীনার ব্যাপারটাই যে ওরকম – বড্ড চাপা স্বভাবের।

বিয়ের রাতেই বুঝলো বোকাটে চেহারার ছেলেটি বোকা তো নয়ই, বরং পাজীর চূড়ান্ত! সেদিনও এমন চাঁদনি ছিলো। ছাদের আলাদা করে বানানো দু’টো ঘরে ওদের থাকতে দেয়া হয়েছিলো। তারপর এমন কিছু ঘটেছিলো… সেই মধু মেশানো পাগলামির ক্ষণগুলো স্মরণ করে লীনার এই এখনকার কান্নাভেজা গালও লাল হয়ে উঠলো! অজান্তে বলে উঠলোঃ ‘পাজী কোথাকার!’

আরমানকে ঠিক বুঝে উঠে না লীনা। মাঝে মাঝে মনে হয় এর থেকে অসাধারণ আর কাউকে সে খুঁজে পেত না। আবার কখনো মনে হয় সে কি ভুল করেছে? সব থেকে বিরক্তিকর হলো আরমানের ভুলোমন। তারিখ আর উপলক্ষ্য সে কিছুতেই মনে রাখতে পারে না। প্রথম প্রথম এসব সহ্য হলেও কয়েকটা বছর পর এসব অসহ্য লাগতে থাকে! সব কিছুই তো পরিবর্তন হয়। তবে, এটা কেন বদলাবে না? বিয়ের তারিখ ভুলে যাওয়াটা কি অন্যায় নয়?

তবে কি অন্য কারণ আছে? হয়তো ওর জীবনে অন্য কেউ ছিলো – বিশেষ কেউ যার কথা সে বেমালুম চেপে গেছে। বাস্তবে এমন অনেক কিছুই করতে হয়, যেটা একেবারেই বুকের গভীরের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন করে না! সেরকম কিছু কি তবে? এই জন্যই এত উদাসীনতা? বুকটা আরো বাষ্পোরুদ্ধ হয়ে যায়।

গেল বার এ নিয়ে বিরাট হাঙ্গামা করেছে লীনা। তুমুল ঝগড়া করে আশেপাশের ক’টা শো-পিস ভেঙ্গে বাসা মাথায় তুলেছে। আরমানের প্রায় নতুন ফতুয়াটা এখনও সেই ঝঞ্ঝার সাক্ষ্য বয়ে চলেছে। তবে জয় বরাবরের মত লীনারই হয়েছিলো। আরমান প্রতিবারই নিঃশর্ত আত্মসমর্পন করেছে। না করে উপায় আছে? নাকে খঁত দিয়ে বলতে হয়েছিলো আগামিবার মনে রাখবেই রাখবে। সেই মুহুর্তে সেই মায়া মায়া চাহনি দেখে পিত্তি জ্বলে গেছিলো লীনার! তবে, ভালোও কি লাগে নি? লোকটা কি জাদু জানে নাকি?

তবে, এই ক্ষণে লীনার চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে আসে – মিথ্যুক কোথাকার! কেমন মরার মত ঘুমাচ্ছে! এবারেও সব ভুলে খেয়ে আছে… উফফ, এ সহ্য করার নয়…

মনে রাখতে চাইলেই মনে রাখা যায়। একটা মোবাইল কোম্পানির এড আছে না… ভুলোমন সঙ্গীটিকে জানিয়ে দেবে বিশেষ বিশেষ দিনের কথা। সেরকম যদি করত! কিংবা ডায়রির পাতায়, ক্যালেণ্ডারে? হ্যাঁ, অনেক উপায় আছে…শুধু ওরই কোনো মাথাব্যথা নাই!

সুন্দর করে সেজেছিলো লীনা। বেশি কিছু করতে হয় নি। সে এমনিতেই সুন্দর। একটা ময়ূরকন্ঠী নীল শাড়ি যে অনন্য যৌবনবতী কবিতা আওড়ে যাচ্ছে, অসামান্য তার আবেদন! আফসোস, যার জন্য এ আয়োজন তাঁরই কোনো বিকার নেই! চোখের কাজল ভারী অশ্রুধারায় গড়াতে থাকে…এই অভিমানের মূল্য কে দেয়?

লীনা উঠে পড়ে। আর কতক্ষণ বসে থাকবে? অনেক রাত হয়েছে নিশ্চয়ই। হ্যাপি নিঃসঙ্গ ভ্যালেন্টাইন এণ্ড আ মিজরেবল এনিভারস্যরি! টলতে টলতে এগুতে থাকে।

হঠাত একটা প্রবল আকর্ষন অনুভব করে লীনা। একজোড়া সবল হাত লীনার সরু কোমরে জগদ্দলের মত চেপে যায়। লীনার পাখি দেহটা একটা ভালুকের ডেরায় অস্বীকারি এক আনন্দে মোচড়াতে থাকে। মায়া চোখের ভালুকটা লীনারই কেনা একটা পাঞ্জাবি গায়ে চাপিয়ে আছে। তাঁর সাহস দ্রুত বাড়ছে! সে লীনার অভিমানী চোখের জলটুকু শুষে নেয় হাজার রাতের পিয়াসী চাতকের মত। আর তারপর? অশ্রুধারা যে ভরাট ঠোঁটের সঙ্গমে মিশছিলো, বাড়ন্ত সাহসটুকু সেখানে গিয়ে তার নির্লজ্জতা সগৌরবে ঘোষণা করতে থাকে। পাখিটির কোনো আপত্তি ধোপে টেকে না! অবশ্য সে আপত্তির শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলো।

ঘুমাও নি তাহলে? মনে রেখেছো? শয়তান কোথাকার!

অ, তাহলে ঘুমাই গিয়ে আবার? কী ভাবো বলতো? লুকিয়ে লুকিয়ে বাচ্চা মেয়েদের মত কাঁদছিলে? পাগলী কোথাকার! ভালোবাসি কি বলতে হবে? বোঝো না? হ্যাপি এনিভারস্যরি! আর ইয়ে…ঐ যে কী যেন বলে…ধুত তেরি… ভালোবাসাবাসি দিবস… এসো ভালোবাসি… এখন আমার পাওনাটা মিটিয়ে দাও তো!

কীসের পাওনা? বলেই এক ছিটকে বেরিয়ে যায় লীনা – ছুটতে থাকে। পেছনে ভালুকটা ক্ষেপে ওঠে। সারা ফ্লাটে সে দাপিয়ে বেড়ায়…লীনার চাপা হাসি তাকে আরো মরিয়া করে তোলে… অসাধারণ একটা দৃশ্য!

নিচের বাড়িওয়ালা দম্পতি প্রবল শব্দে ঘুম ভেঙ্গে রাগতে গিয়েও হেসে ফেলে!

 

প্রথম প্রকাশঃ প্রজন্ম ফোরাম (ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

অণুগল্পঃ একটি ফাঁদ এবং মধুর বিড়ম্বনা

ভারী পর্দার ফাঁক গলে সরু নলের মত একটা আলো এসে যাঈদের চোখে-মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বিগত রজনীর সুখাবেশ তখনও যাঈদের কপালে আনমনে এক্কাদোক্কা খেলছিলো। সেখানে এ কী বিড়ম্বনা! বিরক্তির ঢেউ শতভাঁজে কুঞ্চিত চামড়ায় আলোড়ন তুলছে। কিন্তু চোখ যে খুলছে না। না খুলুক। কী আসে যায় তাতে? উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে কী একটা মনে করে হালকা হাসির রেখাগুলি ঠোঁটের কোণে আকুলি-বিকুলি করে উঠে। ডানহাতটা অভ্যেস মত বাড়িয়ে দিয়েই কাকে যেন জাপটে ধরতে চাইলো। কিন্তু কেউ নেই –  শূন্য জায়গাটাতে একটা মেয়েলি সুগন্ধ! নাক টেনে শ্বাস নিতে নিতে ঘুম-জড়ানো গলায়, ‘বীথি, এই বীথি। বীথি ডা-র-লি-ন’, কোথায় গেলে?’

বীথি নিত্য দিনের মত সদ্য গোসল সেরে চুলায় পানি চাপিয়েছে। যাঈদের বেড-টিটা না হলে চলেই না। শনশন শব্দে পানি ফুটছে। রোজ রোজ বাসিমুখে ঐ জিনিস গিলে কী যে সুখ, সেটা বীথির মাথায় ঢুকে না। কিন্তু আজ একটা দুষ্টবুদ্ধি খেলে গেলো। কাল রাতে বড্ড জ্বালিয়েছে! সেটা মনে করাতে ঈষৎ রাঙা হয়ে গেলেও যাঈদকে জব্দ করার একটা রাস্তা খুঁজতে থাকে। যত্ন সহকারে চিনি বিহীন লিকারে ইচ্ছেমতো লাল মরিচ আর এক চিমটি হলুদ মিশিয়ে দিলো। একটু চেখে দেখতে জিহ্বা ছোয়াতেই – ও বাবা, ব্রহ্মতালু জ্বলে উঠলো যেন! তবে মনে মনে বেশ একটা তৃপ্তির ভাব জাগল – একদম পারফেক্ট হয়েছে! হাসি আর থামতে চাইছে না – উপচে উপচে পড়ছে যেন।

চায়ের গন্ধে অলস ঘুমটা পালিয়ে গেলো। তবে একটু ঝাঁঝাঁলো গন্ধ কি? দূর, কী সব ভাবছে? খপ করে বীথির হাতটা ধরে নিজের দিকে টানতেই বীথি হা হা করে উঠলো! সাধের বেড-টি পড়ে যাবে যে! পড়ে গেলে খাবে কী?

কেন, তোমাকে খাবো। চোখ পাকিয়ে তাকায় যাঈদ।

এহ, অসভ্য কোথাকার! এখন বসে বসে ঐ বিশ্রী জিনিসটা গেলো।

নাহ, বিশ্রী হবে কেন? তোমার হাতের স্পর্শ যেখানে, সেখানে তো খালি মধু আর মধু। হা হা হা।

(…বাছাধন, বুঝবে একটু পরে। মধুই তো…ঝাল মধু…) মনে মনে হাসতে থাকে বীথি।

কিন্তু অবাক কাণ্ড ঘটছে। প্রায় উদাসীন ভঙ্গীতে চায়ে চুমুক দিয়ে চলেছে যাঈদ। অবাক হয়ে গেলো বীথি। ভুল দেখছে না তো! এত ঝাল লোকটা নিচ্ছে কী করে? গুনে গুনে তিন চামচ শুকনা মরিচের গুড়া দিয়েছে… এই ফলাফল তো কাঙ্খিত না! হঠাত অন্যমনস্ক হওয়াতে খেয়ালই করে নি কখন যাঈদ হাত বাড়িয়ে টান দিয়েছে।

হুড়মুড় করে পড়ে গিয়ে বীথির আশ্রয় ঘটলো যাঈদের বুকে। বীথির ভেজা চুলে শ্যাম্পুর চনমনে গন্ধ! ক’টা চুল যাঈদের মুখে গিয়েও পড়ে। চাঞ্চল্যকর ঘটনা বটে! তবে, যাঈদ কিন্তু অন্য কাজে ব্যস্ত – চায়ের কাপটা হতে লাল আস্তরণটা তুলে নিয়ে আয়েসে মাখাতে থাকে নিজের ঠোঁটে। তারপর সারপ্রাইজ এন্ড এটাক – এই কৌশলে শত্রুপক্ষ বধ করতে নেমে যায়। হাতিয়ার – একজোড়া আবেগী দস্যু!

আক্রমণ শেষে শত্রুর লম্ফ-ঝম্ফ শুরু হয়ে গেলো। সারা ঘরময় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বীথি। মুখে যা আসছে তাই বলে চলেছে। টার্গেট – যাঈদ। নিজের ঝাল মধুতে বীথি নিজেই কুপোকাত হয়ে গেলো। অনবরত পানি ঝরছে।

শরবতটা এক চুমুকে শেষ করে তখনও হাফাচ্ছে বীথি। ঝাল এখনও কাটে নাই। পাশে যাঈদ মিটিমিটি হাসছে।

ব্যাডবয়কে বেড-টি না দিয়ে ব্যাড-টি দিতে গেছো! এখন তো ব্যাড-স্কয়ারড হয়ে গেছি। চাপা হাসি হাসতে থাকে যাঈদ। এবার  আর তোমার নিস্তার নাই! এই এলাম বলে…

এই খবর্দার! দূরে থাকো বলছি!

ব্যাডবয়রা কাছে কাছে থাকে আর গুডিরা দূরে দূরে ……

শয়তান, বিচ্ছু!

আত্মসমর্পনের প্রাক্কালে শুধু এই দু’টি শব্দই বের করতে পেরেছিলো বীথি। বাকী সময়ের শব্দগুলি গাঢ়তর আবেগে দ্বৈতকন্ঠের গান হয়ে গেছিলো।

কী, বিশ্বাস হলো না? তাহলে আপনি নিশ্চিত একটা শতভাগ ‘কেঠো’। হা হা হা।

 

সমাপ্ত

প্রথম প্রকাশঃ প্রজন্ম ফোরাম

 

অপরিচিত!

জানতে চেয়ো না কে আমি?

কী আমার পরিচয়?
দূর ছাই! কে আমি তা নিজেই জানি নাকি?
কোথায় যে আমার বিষয়-আশয়?

মাঝে মাঝে অস্পষ্ট আয়নাটিতে কিংবা
দুলকি চালে চলা ট্রেনের আধ-ঘষা কাচে
নিজেই নিজের বিম্ব দেখি।
দূর ছাই! সেটা নাকি বিম্ব নয়, প্রতিবিম্ব!
তাহলে বিম্বটাকেই শুধোই…
কে হে তুমি? কী চাও বারে বারে?
বিম্বটা, নিয়ে একরাশ বিস্ময়ের ঘনঘটা
প্রশ্নটা যায় পাশ কাটিয়ে – সুচতুরে।
ভেদে গিয়ে নির্বিবাদে
প্রতিবিম্বের দুরুদুরু আত্মা মাঝে
আঁতিপাঁতি খোঁজে দ্বিধান্বিত ছায়ার বিব্রত চারিপাশ!
পাবে কী করে? কে পেয়েছে সহজে কোন্‌ কালে?
মহাকালের মত প্রাচীন প্রশ্নটা যে শূন্যতার জলরং
গায়ে মেখে ঝিমোয় টানাপোড়েনের
অর্থহীন বাহাসে!
দূর ছাই! সেটি নাকি বাহাস নয়, আত্মানুসন্ধান!
বলে গুণীজনে।
হবে হয়তো। তবে সেই সন্ধানের ম্লান-মধুর আলোয়
নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকে দু’টো
অনাদির জিজ্ঞাসু মুখ।
কত কালের চেনা, তবুও যেন
কী অদ্ভূত অপরিচিত!

জানতে চেয়ো না কে আমি?
নিজেই নিজের কাছে যে বড্ড অচেনা!

প্রথম প্রকাশঃ প্রজন্ম ফোরাম  (২৮/০৭/২০১১)