রাত একটা বেজে একত্রিশ মিনিট

রাস্তায় পা দিতেই আকাশের এমাথা-ওমাথা ফালা ফালা করে বিদ্যুৎ চমকে গেল।

নিশুতি এই রাতে লোকজন বেশি থাকার কথা না। অভ্যাসমতো জয়নুল কব্জি ঘুরিয়ে ঘড়ির রেডিয়াম ডায়ালে ছোটো কাঁটাটা কোথায় আছে দেখার চেষ্টা করল। ভারী কাচের চশমাটা একটু আগুপিছু করে দেখে বুঝল ঘড়িটা বন্ধ হয়ে আছে। কীভাবে বন্ধ হলো? সেদিনই না সাতমসজিদ রোডের মাথায় টাইম সিরিজ ঘড়ির দোকানে ঘড়িটা সারিয়ে আনল সাড়ে বারশ টাকা দিয়ে? মেকানিক ছেলেটা খুব দাঁত কেলিয়ে বললো, স্যার নিয়া যান, এক্কেরে নতুনের লাহান কইরা দিসি। এই তার নমুনা! ছেলেটা তাঁরই ছাত্র, ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। দুনিয়া জোচ্চোরে ভরে গেছে একেবারে।

রাত দেড়টা দেখাচ্ছে। রাত দেড়টা? কীভাবে? একটু আগেই না বের হলেন? বিপত্নীক জয়নুল আহসান নিজের অসামাজিক খোলস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন বন্ধু নিয়াজের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। আসলে নিমন্ত্রণ নয়, বন্ধুপত্নীর আত্নীয়াকে দেখানোই উদ্দেশ্য। বড়ো বিরক্ত হয়েছিল জয়নুল। কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারে নাই। রিমির অকালমৃত্যুর পর একরকম নিজেই দুটো চাল-ডাল ফুটিয়ে খান হাত পুড়িয়ে। ভালো-মন্দ তেমন খাওয়া হয় না। তাই ভিতরে ভিতরে চটে গেলেও ওরকম এলাহি আয়োজনে হাসি-হাসি মুখেই বসেছিলেন। ওদের হাত থেকে ছাড়া পেতে পেতে রাত একটা বেজে গেছিল। সাতমসজিদ রোড ধরে মাত্র পাঁচ মিনিট হেঁটেছেন। তাহলে দেড়টা হবে কেন? ঘড়িটা কি আগে থেকেই বন্ধ ছিল?

হঠাৎ ভীষণ ধন্দে পড়ে গেলেন। পিছনের ঘটনাগুলি মনে করতে গিয়ে সব যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছে। কিছুতেই মনে করতে পারছেন না। অথচ ছোটোখাটো ব্যাপারগুলি উনি খুবই মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করে থাকেন। নোটও লিখে রাখেন। মনে পড়ছে বিয়ের কিছুদিন পর রিমির সাথে তাঁর বিরাট মনোমালিন্য এই নোট নিয়ে। বাসর রাতের পর নোটে লিখে রেখেছিলেন, ঈষৎ নাসিকাগর্জন সমস্যার কারণ হতে পারে যদিও নাকটা বাঁশির মতো আর পর্বতযুগলে সিমেট্রি নাই তেমন ইত্যাদি!

অনেক বছর আগের কথা মনে করে হেসে ফেলেও গম্ভীর হয়ে গেলেন। কিছু স্মৃতি বোধহয় কোনো দিনই ফিকে হয়ে যাবে না। রিমিকে ভোলা অসম্ভব প্রায়! ঠিক তখনই খেয়াল করলেন ধূলির এক প্রকারের ঝড় উঠেছে। বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ভাগ্যিস ছাতাটা সঙ্গে করে দিয়েছে ভাবি। এই তো ছাতার কথাটা দিব্যি মনে করতে পারছেন। ঘড়িটা কেন মনে করতে পারছেন না?

প্রবল বেগে বৃষ্টি শুরু হলো। বাংলা কী মাস এটা? আশ্বিন নাকি ভাদ্র? আবার দ্বন্দ্ব লেগে গেল। যেটাই হোক, এরকম ঘোর বর্ষা তো হওয়ার কথা না। ছাতাটা পুরোনোই বটে। ছাতার ফ্যাঁকাসে মেটে রঙের জীর্ণ কাপড়ের মধ্য দিয়ে চুইয়ে পড়া বৃষ্টির কণা চশমার কাচে দিব্যি জমে যাচ্ছে। বাইরে মোটামুটি তাণ্ডব শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রবল ঝড়ে গাছের মাথাগুলি যেন আছড়ে আছড়ে পড়ছে। বিপজ্জনকভাবে দুলছে। ও কী, ভেঙে পড়বে নাকি? ছাতার বাঁট শক্ত করে ধরে রাখতে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, যেকোনো সময়ে ছাতাটা উড়েই যাবে।

রিমি মারা যাবার পর ইশ্বরে আর বিশ্বাস নেই জয়নুলের। বহুদিন প্রাকটিস করেন না। অথচ নিতান্ত অভ্যস্ততায় দোয়া ইউনুস বিড়বিড় করে পড়তে শুরু করলেন। চূড়ান্ত অন্যমনস্ক বলে বিপরীত দিক থেকে আসা অটোটা ঠিক খেয়াল করলেন না।

ঘ্যাচাং করে থেমে গেল অটোটা। সাথে একটা অশ্রাব্য খিস্তি। আর একটু হলে মাড়িয়ে দিচ্ছিল আর কি!

কৌতূহলে ছাতাটা কাত করে দেখলেন অমাবস্যার মতো কালো বদখত একটা লোক মাথাটা বাড়িয়ে গালির তুবড়ি ছুটিয়েছে। দোষটা তাঁরই। কোন্‌ বদ খেয়ালে রাস্তার মাঝ দিয়ে হাঁটছিলেন, কে জানে? জয়নুল কিছু বলেন না। শুধু মাথাটা নাড়িয়ে পাশের ফুটপাথে উঠে গেলেন। তখনই দেখতে পেলেন নেমে যাওয়া যাত্রীকে।

মিস রোজি। এক ঝলক দেখেই হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলেন। এইসব সঙ্গ যথাসম্ভব পরিত্যাজ্য। কথাও বলতে চান না তিনি।

ফুটপাথের জায়গায় জায়গায় পানি জমে গেছে। ঝড়জলের রাতে ভিজে চুপসে যাওয়া হাজার পঞ্চাশ টাকা পঁচাত্তর পয়সার বাটা ছপ ছপ ছপ ছপ একটানা শব্দ তুলেছে। বামে মোড় নিলেন জয়নুল। রাস্তাটায় গাঢ় অন্ধকার এমনিতেই থাকে। রাতের বাতিগুলো অধিকাংশই নষ্ট। ঝড়ে অনিবার্য লোডশেডিং -এ আরও নিকষকালো হয়েছে আঁধার। হঠাৎ শুনতে পেলেন আরও একজোড়া পায়ের শব্দ দ্রুত তাঁর দিকে ধাবমান। কেউ কি দৌড়ে আসছে তাঁর দিকে? এ কী বিপদ?

কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা খিলখিল হাসি ছাতার নিচে চলে এলো।

স্যার, আমারে দেইখা পলাইলেন ক্যান? আমি কি বাঘ না ভালুক যে আপনারে খায়া ফালামু?

দামী সিল্কের শাড়ি, উগ্র প্রসাধন এবং সুগন্ধি আর দুর্বিনীত যৌবন… জয়নুলের এ মেয়েটিকে চেনারই কথা। তিনি যে পাঁচতলা বাড়িতে ভাড়া থাকেন, সেটার সবচে উপরের তলায় থাকে মেয়েটি। মিস রোজি এর নাম নয়; এই মেয়েটাকে তিনি ভালোই চেনেন কিন্তু বিচিত্র কারণে আসল নামটা মনে করতে পারছেন না।

বেশ খানিকটা উষ্মার সাথেই বললেন, মিস রোজি, তুমি আমার ছাতার নিচে এলে কেন? বেরিয়ে যাও এখনি।

মিস রোজির তাতে কোনো ভাবান্তর হলো না। বরং দ্বিগুণ হাসিতে ফেটে পড়ল। ভীষণ অস্বস্তিতে পড়লেন জয়নুল।

মিস রোজি! কী কইয়া ডাকলেন আমারে? স্যার কি আমার নাম ভুইলা গেছেন?

মধুর জলতরঙ্গ ঝড়জলের শব্দ ছাপিয়ে জয়নুলের কানে মধু ঢালতে লাগল। এ অন্যায়! নিজেকে মৃদু তিরস্কার করেন জয়নুল।

মিস রোজিই তো তোমার নাম ইদানীংকালে। ভুল বলি নাই। আর এরকম ভাষায় কথা বলবে না আমার সাথে।

কী ভাষায় কইতাছি? ওরে আমার বিশিষ্ট নাগর! (খিলখিল হাসি)

এই প্রকারের তারল্যে খুবই রুষ্ট হলেন জয়নুল।

তুমি এখনই বের হয়ে যাবে আমার ছাতার নিচে থেকে স্বেচ্ছায় নইলে…

নাহলে কী? ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবেন? দেন দেখি?

হাঁটা থামিয়ে একদৃষ্টে চেয়ে থাকলেন মেয়েটির দিকে। ঠিক তখনই আকাশ চিড়ে আলোর ঝলকানিতে একটা বাজ পড়ল। সেই আলোতে অনন্যসুন্দর মুখখানি দেখেই চকিতে নামটা মনে পড়ে গেল। রুনু – হ্যাঁ রুনুই তো নাম!

রুনু! কেন এরকম করছ? এত রাতে কোথায় গিয়েছিলে?

বহুদিনের অশ্রুত এ ডাকে মিস রোজি রূপোপজীবিনী ক্ষণকালের জন্য বিহ্বল হয়ে পড়ে। অতঃপর দ্রুত সামলে নেয় নিজেকে।

এত রাতে কোথায় গিয়েছিলাম? জানেন না কোথায় গিয়েছিলাম? আপনি বোকার মতো প্রশ্ন করছেন, স্যার।

ওহ সরি! তোমাকে ও প্রশ্নটা করা ঠিক হয় নাই। যাহোক, চলো এগুনো যাক। তাড়া আছে আমার। সময় নাই, পৌঁছাতে হবে খুব তাড়াতাড়ি।

মিস রোজি ওরফে রুনু যে প্রগলভতা নিয়ে ছাতার নিচে এসেছিল, তা নেই হয়ে গেল আলগোছে। এখন কেমন জড়সড় হয়ে হাঁটছে। দামী সিল্কের আঁচল প্রবল বর্ষণে বেশ ভিজে যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে প্রায় এক দশক আগের অনুপম ফুল রুনুর ছবিটা হঠাৎ ভেসে উঠল। কীভাবে যে সব তছনছ হয়ে গেল!

তুমি আরেকটু ভিতরে আসতে পার। ভিজে যাচ্ছ তো?

আসব? আপনার বিশিষ্টতায় দাগ পড়বে না তো? বাজারি মেয়ে হয়ে গেছি আমি! অকস্মাৎ খুব করুণ শোনাল কন্ঠটা।

জয়নুল মরমে বিদ্ধ হয়ে গেল যেন বাজারি হওয়ার পেছনে সেও দায়ী। অথচ তা তো নয়। গল্প শোনার মানুষ নয় জয়নুল। কাটখোট্টা ধরনের। তবুও একটা ইচ্ছে যেন অস্থির আঁকিবুঁকি কাটছে। অথচ অদ্ভুত একটা ভাব হচ্ছে, মনে হচ্ছে সময় বেশি নেই। গল্পটা শোনা হবে কিনা বুঝতে পারছে না।

রুনু, কীভাবে এসব হলো?

মানে জানতে চাচ্ছেন কীভাবে রুনু চৌধুরি মিস রোজি হলো? কী লাভ এসব জেনে?

লাভ হয়তো নাই, কিন্তু বিশ্বাস কর দুই বছর আগে যখন তোমাকে প্রথম আবিষ্কার করলাম মিস রোজি হিসেবে, আমার উচিত ছিল সবটুকু জানাটা। এটুকু সৌজন্য তোমার প্রাপ্য ছিল। আমি সেটুকুও দিতে পারি নাই। কী এক প্রচণ্ড অভিমানে তোমার সঙ্গ এড়িয়ে চলেছি। তোমার কাছে যে আমার ঋণের শেষ নাই!

ছি ছি জয়নুল ভাই, এসব কী বলছেন! আমি আপনাকে কোনো দয়া করি নাই। আমি যে আপনাকে চেয়েছিলাম!

রুনু!!

কী, এই এত বছর পরেও আমাকে বকবেন? যেমন বকেছিলেন প্রথম ধরা পড়ার পর।

জয়নুল অস্বস্তিতে পড়ে যায়।

স্যার, দোষ আমারই ছিল। আপনি পড়াতে এলে আমি শুধু আপনাকেই দেখতাম। কী ভীষণ মেধাবী একটা ছেলে ফিজিক্সের মতো চরম ফালতু একটা সাবজেক্ট পানির মতো বুঝিয়ে দিত! আপনার বুদ্ধিদীপ্ত স্বপ্নীল চোখ আর ক্যাবলাকান্ত হাসি… হায়, আঠারো বছরের একটা মেয়ের জন্য যে কী হতে পারে, সে বুঝার মতো মনই আপনার ছিল না।

এক্সকিউজ মি! ক্যাবলাকান্ত হাসি আবার কী? রেগে ওঠে জয়নুল।

বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই! গলিতে হাঁটুসমান পানি জমে গেছে। শো শো শব্দে আরও জোরে বাতাস ফুঁসছে। মুহুর্মুহু বাজ পড়ছে আশেপাশে কোথাও। সেরকম একটা শব্দে আরও ঘন সন্নিবেশিত হয়ে যায় রুনু জয়নুলের। রুনুর গুরুভার বক্ষের স্পর্শে চমকে ওঠে জয়নুল! বহুদিনের অনাস্বাদিত রক্তমাংসের স্বাদ বিস্মৃতির অতল গহ্বর থেকে যেন সহসাই উঠে আসে। কিন্তু জয়নুল কোনো অন্যায় সুযোগ নিতে চায় না। হোক সে হাইক্লাস রূপোপজীবিনী। প্রবল নিয়ন্ত্রণে চকিতে সরে আসে।

ও কী, ভয় পেলেন নাকি স্যার? খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে রুনু। অভাবে দেহ বেচি ঠিকই, তবে আপনাকে ফাঁদে ফেলার কোনোই অভিরুচি নাই আমার।

না, না ভুল বুঝবে না।

না, আমি ভুল বুঝি নাই। চিরকালের আদর্শবাদী! আপনাকে একটা সময় খুব ঘৃণা করতাম জানেন?

এখন করো না?

নাঃ, সে মনই তো আর নাই। সব মরে গেছে। বাবা মরে যাবার পর আমাদের অনেক সম্পত্তি বাবার ব্যবসার ঋণ চুকাতে খরচ হয়ে যায়। বাকীটা আমাদের পারিবারিক শত্রুতার জেরে সব হারিয়ে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাই। আমার পড়া আর এগোয় না। পড়াশোনায় ভালোও ছিলাম না জানেনই তো। মা আর তিন ভাইবোন নিয়ে আমরা ছোটো একটা ভাড়া বাড়িতে উঠে যাই অন্য শহরে। সামান্য সঞ্চয় ফুরিয়ে আসে দ্রুত। অতঃপর একদিন মা-ও…

আমাকে জানাও নাই কেন?

অভিমানে জানাই নাই! কী ছেলেমানুষ ছিলাম, তাই না? আপনি আমাকে প্রত্যাখান করেছিলেন। মনে আছে সে কথা? বয়সের ফারাকের দোহাই দিয়ে যা-তা বুঝিয়ে… আপনি একটা যাচ্ছেতাই। আপনি এত পাষাণ কেন?

আজ এত বছর পর এই প্রশ্নের কী উত্তর দিবে জয়নুল? চুপ হয়ে থাকে। পথ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। ভিতরে ভিতরে অদ্ভুত চঞ্চল হয়ে ওঠে জয়নুল। কীসের যেন একটা তাড়া! অভ্যাসমতো কব্জি উলটে দেখে ঘড়িটা। এখনও থেমে আছে সময়।

রাস্তায় খানাখন্দ আগেই ছিল। এই আকস্মিক প্লাবনে সেগুলির ঠাহর করা মুশকিলই বটে! তারই একটাতে এই ঝড়জলের দুর্যোগে পড়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু না। হলোও তাই। কিন্তু সিনেমার মতো মেয়েটা পড়ল না। পড়ল জয়নুল।

ছাতাটা উলটে ভেসে গেল। কোনোমতে জয়নুলকে ধরে রেখে পানিতে পড়ে যাবার হাত থেকে বাঁচালো রুনু।

এবার কোমরটা ছাড়লে ভালো হয়। খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে রুনু।

অপ্রস্তুত জয়নুল তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিতে যায়। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে আরও জোরে চেপে ধরে।

অঝোর ধারায় ঝরে যাচ্ছে বাদল। রুনুর সিল্ক ভিজে একশা। লেপ্টে রয়েছে শরীরে। জয়নুলের চোখে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। অদ্ভুত পরিবেশ – অদ্ভুত সময় – অদ্ভুত যোগাযোগ! দুটি ঠোঁট কখন যে কী আজন্মের উত্তর খুঁজতে থাকে, কেউ জানে না। বুঝতে পারে না। দুর্যোগের ঘনঘটা ভিতরে এবং বাইরে। জয়নুলের সব প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে গেল।

ধাতস্থ হলে দুজন ছিটকে যায় দুদিকে। কিন্তু পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। এ কি ক্ষণকালের মোহ নাকি বহুকাল আগের অবহেলিত অস্বীকারী দুর্নিবার আকাংখা? দুটি হাত কেমন চিরচেনা আশ্বাসে গভীর আশ্লেষে পরস্পর ডুবে থাকে।

গন্তব্য কাছে আসতে থাকলে জয়নুলকে বেশ আন্দোলিত দেখায়। পাঁচতলা দালানের সামনে এসে থেমে পড়ে। কড়াৎ শব্দে একটা বাজ কাছে কোথাও পড়ে। ঝটিতি হাত ছেড়ে দেয় জয়নুল।

প্রবল দুঃখভরে রুনু বলে, ওঃ, বুঝতে পেরেছি। ভুলেই গিয়েছিলাম আমার সীমানা!

জয়নুলের বুকটা হাহাকার করে ওঠে। তাড়াতাড়ি রুনুর হাত দুটো নিজের বুকে চেপে ধরে। রুনু, ভুল বুঝো না! আমি তোমার উপরে অন্যায় করেছিলাম। সব বুঝেও তোমাকে প্রত্যাখান করেছিলাম অথচ তুমি তোমার সর্বস্ব দিয়ে আমাকে চেয়েছিলে। সব সঞ্চয় দিয়ে আমার পড়ার খরচও যুগিয়েছিলে। কেন করেছিলে? কেন, কেন? শোনো রুনু, সময় আর বেশি নাই। সত্যটা বলে যাই। আমি তোমাকে… রুনু জয়নুলের মুখে হাত রাখে।

বলতে হবে না, আমি জানি এবং বরাবরই জেনে এসেছি।

হঠাৎ জয়নুলকে বেশ শান্ত দেখায়। যত অস্বস্তি এবং দ্বন্দ্ব ছিল সব মিলিয়ে গেল কর্পূরের মতো। সব পরিষ্কার লাগছে এখন।

গেটের কাছে মাথা ঢুকিয়ে রুনু জয়নুলকেও ডাকে ভিতরে। কিন্তু জয়নুল নড়েন না।

তুমি যাও, রুনু। আর হয়তো দেখা হবে না! বিড়বিড় করে বলেন জয়নুল।

শেষ কথাগুলো শুনতে পায় না রুনু। যদি শুনতে পেত তাহলে দেখতে পেত যুগপৎ আনন্দ এবং বিষাদ নিয়ে কী অপার্থিব ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছেন জয়নুল!

অভ্যাসবশত কব্জি উলটে দেখে রেডিয়াম ডায়ালে মিনিটের কাঁটাটা এক মিনিট এগিয়েছে। একটা বেজে একত্রিশ মিনিট। জয়নুলের মুখে পরিতৃপ্তির হাসি।

একতলায় জটলা দেখে সামনে গিয়ে চিৎকার করে ওঠে মিস রোজি। সিভিয়ার হার্টএটাকে এইমাত্র মারা গেছেন অধ্যাপক জয়নুল আহসান। দেয়াল ঘড়িতে একটা বেজে একত্রিশ মিনিট।

☼ সমাপ্ত ☼

অবশেষে!

ক্রিং ক্রিং ক্রিং… তারস্বরে মোবাইল এলার্মটা বেজে উঠল। রাত আড়াইটা।

প্রবল ঘুম-জড়ানো চোখে চয়ন সেটাকে স্নুজ করতে গিয়ে সম্বিৎ ফিরে পেল যেন! এ নিয়ে দুইবার করেছে বোধহয়। কী সর্বনাশ! তাকে যে ফ্লাইট ধরতে হবে। সে বিমান বন্দরও কাছেকূলে নয়। নৈশ বাস, হাঁটা ইত্যাদি করে মেলা পথ পাড়ি দিতে হবে। তড়াক করে লাফিয়ে উঠে কোনমতে গুছিয়ে নিয়ে, পিঠে একটা রুকস্যাক চাপিয়ে বের হয়ে গেল। সাড়ে তিনটার নৈশ বাস ফস্কে গেলে অনেক দুর্ভোগ আছে কপালে!

জমাট শীত তার থাবা বিস্তার করতে শুরু করেছে। একটা ঝুম হয়ে থাকা ঠাণ্ডা জাঁকিয়ে বসতে চাচ্ছে যেন। পথঘাট প্রায় ফাঁকাই। শুধু সদাজাগ্রত ট্রাফিকের শব্দই রাতের নিরবতাকে খানখান করে দিচ্ছে। সেদিকে তাকাবার সময় নেই চয়নের। দীর্ঘদেহি চয়ন বড় বড় পা ফেলে মুহূর্তেই পৌঁছে গেল বাসস্টপে।

এবং যারপরনাই বিস্মিত হয়ে গেল। কেউ নেই শুধু অনিন্দ্যসুন্দর এক তরুণী ছাড়া। সাথে ঢাউস একটা লাগেজ। আর আরো বিস্ময়ের সে পরে আছে একটা ময়ূরকণ্ঠী নীল জামদানি! এই শীতেও তাঁর পরনে কোন শীতের পোশাক নেই। চয়নের মনে হল, ওতে ভালই হয়েছে নইলে এমন চমৎকার দেহ-বল্লরী কি দেখতে পেত! সে বোধহয় হাঁ হয়ে গিয়েছিল! চমক ভাঙ্গল অপ্রিয়কর এক জল-তরঙ্গ কণ্ঠে।

কী মেয়েমানুষ দেখস নাই জীবনে? খবিস জানি কুনহানকার! হাঁ কইরা গিলতাছে…

আ…আমাকে বললেন? বিস্ময়ে তোতলাতে থাকে চয়ন।

হ, তুই ছাড়া আর কে আছে এইহানে?

চয়ন সামলে নেয়। আপনি অভদ্রতা করছেন কিন্তু! তুই-তোকারি কেন করছেন? কীসব আজেবাজে কথা বলছেন!

ঠিক এই সময়ে বাসটা হেলতে দুলতে চলে আসে। চয়ন ভদ্রতা করে মেয়েটাকে আগে ওঠার জন্য হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে। মেয়েটা উঠে পড়ে এবং পেছন ফিরে চয়নকে উদ্দেশ্য করে,

সং -এর মত দাঁড়ায় আছস ক্যান? এই ভারী লাগেজ আমি টাইন্যা তুলব তুই থাকতে?

ভারী রাগ হয়ে গেল চয়নের। সে আমি কী জানি? নিজের লাগেজ নিজেই টেনে নিন।

মেয়েটা কেমন অদ্ভুত চোখে তাকাল। হঠাত চয়নের বড় পছন্দ হয়ে গেল এই মুখরা মেয়েটাকে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠিয়ে দিল। আর দেমাগি মেয়েটা গটগট করে একটা ফাঁকা আসনে গিয়ে বসে পড়ল। একটা ধন্যবাদ তো তার পাওনা ছিল নাকি?

আপনার পাশে বসতে পারি?

না, পারেন না। অসভ্য লোকদের আমি দু’চোক্ষে দেখতে পারি না।

বারে! আমি অসভ্য?

একশো বার। কিন্তু চয়নের রোখ চেপে গেল। সে ওর পাশে গিয়েই বসে পড়ল।

এ কী? বসতে মানা করলাম, তা-ও বসে পড়লেন? বেশরমও দেখি!

আরে, এখন দেখি সুন্দর ভাষায় কথা বলছেন! আমি ভাবলাম…

কী ভেবেছিলেন? ভ্রুকুটি করে তরুণী।

কী মুখে কী ভাষা! হা হা হেসে ফেলে চয়ন।

ঠিক তখনই মেয়েটাও হেসে ফেলে। হাসলে গালে একটা টোল পড়ছে। নাকের ফুলটা বাসের মৃদু আলোতেও চমকে ওঠে।

আমি মিথি মানে মিথিলা। আপনি তো চয়ন, তাই না? আপনাকে অনেক কটু কথা বলে ভড়কে দিয়েছি। প্লিজ কিছু মনে করবেন না। সেলফ ডিফেন্স আর কী! আসেন সন্ধি করি – চাঁপাকলি আংগুলে হাত বাড়িয়ে দেয় মিথিলা।

চয়নের প্রকাণ্ড কর্কশ হাতে এই পেলব হাতটুকু যেন একটু অন্যরকম পরশ বুলিয়ে দেয়। সে নিজেকে সংযত করার একটা প্রবল চেষ্টা করতে থাকে।

ও বাবা, সেলফ ডিফেন্স! তা আমার নাম জানলেন কী করে? যতদূর জানি আমি তো কেউকেটা কেউ নই! ফিল্মেও কাজ করি না। যদিও দেখতে মন্দ নই, কী বলেন?

ঠোঁট উলটে ফেলে মিথিলা। বাব্বাহ, নিজের চেহারা নিয়ে এত দেমাগ? আপনার নাম ইংরেজি বাংলা দুটোতেই লেখা আছে ঐ রুকস্যাকের ট্যাগে।

বাহ্‌, দারুণ চোখ তো আপনার! তা আপনার নিজেরও কি দেমাগ নেই?

কেন, বলেন তো? অবাক হয়ে যায় মিথি।

ন্যাকামো হচ্ছে? জানেন না বুঝি? মেয়েরা তো জানতাম খুব আয়না দেখে। এখন অবশ্য মোবাইলের সেলফি ক্যামেরাতেও দেখে।

কচু জানেন। লজ্জা পেয়ে যায় মিথি। আপনি কিন্তু ফ্লার্ট করছেন।

অ্যাঁ, করছি নাকি? ফ্লার্টিং -এর আর দোষ কী? আপনি বস্তুটাই ওরকম।

কী!! আমি বস্তু?

না মানে সবাই তো বস্তু, পদার্থ আর কী! হাসতে থাকে চয়ন।

যান, আপনার সাথে আর কথাই নাই! মেয়েদের সম্মান করতে জানতে হয়, বুঝলেন মিস্টার?

জ্বি, সে খুব ভাল জানি, মিস মিথিলা।

কে বললো আমি মিস? মিসেসও তো হতে পারি।

আপনি মিসেস?!

এতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে? হলে কি ফ্লার্ট করতেন না? এখন কি অন্য আসনে গিয়ে বসবেন? খুট করে হেসে ফেলে মিথি।

আপনি বড় অন্যরকম মিথিলা। বেশ সহজ। আর পাঁচটা মেয়ের মত না। তা হাসব্যান্ডের কাছে যাওয়া হচ্ছে নাকি?

ধরে নিন তাই।

সেজন্য শাড়ি পরেছেন নাকি? আপনাকে কিন্তু দারুণ দেখাচ্ছিল একেবার ঋতুপর্ণার মত!

আবার ফ্লার্ট করছেন?

এই তো আপনাদের সমস্যা। সত্যটা শুনতে চান কিন্তু বলতে গেলে তেড়ে আসেন মারতে।

মনে হচ্ছে খুব অভিজ্ঞতা মেয়েদের ব্যাপারে। তা সত্যবাদী যুধিষ্ঠির, আপনার উম্যান সম্পর্কে কিছু বলেন দেখি!

সে ডিপার্টমেন্ট -এ তো লবডঙ্কা!

এই তো মিথ্যে বলছেন। জুলফিতে পাক ধরেছে আর বলছেন কেউ নেই!

নেই তো বানিয়ে বলব নাকি? সেজন্য তো হ্যাংলার মত তাকিয়ে ফেলি মাঝেমাঝে।

সে তো দেখতেই পাচ্ছি!

কী বললেন?

নাহ কিছু না। এই বোরিং জার্নিটা ভালই লাগছে। আপনি না থাকলে হয়তো ঘুমিয়ে পড়তাম। আর কেমন ফিল্মি লাগছে তাই না?

চয়ন নিজের প্রশস্ত কাঁধটা দেখিয়ে দিয়ে, চাইলে এখনও পড়তে পারেন। ওটা ফাঁকাই আছে বহুদিন। হা হা হা।

যাহ, ফান নয়। সত্যিই আপনার কেউ নেই? যদি আপত্তি থাকে বলতে হবে না। এই অল্প সময়ের পরিচয়ে খুব বেশি তো দাবী করা যায় না, শোভনও নয়!

যদি বলি, নাকে দড়ি পরতে যাচ্ছি…

ওমা, কী মজা! সত্যিই?

তা তো খুশি হবেনই। মেয়েরা তো জন্ম থেকেই স্যডিস্ট! মজা তো পাবারই কথা!

কী যে সব বলেন না আপনি!

এরপর আর কথা হয় না। অস্বস্ত নিরবতা নেমে আসে। যেন হঠাৎ করেই একে অপরের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলতে থাকে। মিথিলা জানলা দিয়ে রাতের চলমান নৈশব্দের দিকে তাকিয়ে কী যেন একটা খুঁজতে থাকে। চয়নও চোখ বুজে ফেলে। মনোভঙ্গের উত্তুঙ্গ যাতনার মত কী একটা হারানোর বিষাদ দুই জনের মাঝের ছোট্ট জায়গাটিতে ভারী হয়ে বসে যেতে থাকে। কী এর মানে? জেনেও অজানার মত ভেসে বেড়াতে থাকে উত্তরটা।

মিথিলাও ঘুমিয়ে পড়ে একসময়। হঠাত ঘাড়ের কাছটায় একটা মাথার স্পর্শ পেয়ে চমকে ওঠে চয়ন। মিথিলা! কী অদ্ভুত একটা সুগন্ধ আসছে ওর শরীর থেকে। আর একটা অসহ্য উত্তাপ। সে উত্তাপ ছুঁয়ে স্রেফ মরে যেতে ইচ্ছে হল। কিন্তু এ যে অন্যায়! প্রাণপণে নিজেকে শাসাতে লাগল সে। জগতের তাবৎ ক্রূর ঘটনাগুলিই কেন ঘটে ওর সাথে? সামিন -এর আদল কেন এই যুবতীর উপরে? অলক্ষ্যে চোখ জ্বালা করে ওঠে চয়নের। ঠিক তখনই বাসটা গন্তব্যে পৌঁছে যায়।

সবাই নেমে যেতে থাকে। চয়ন মিথিলাকে আলতো করে ডাকে। ঘুম ভেঙ্গে নিজেকে চয়নের কাঁধে আবিষ্কার করে লজ্জায় এতটুকু হয়ে আসে মিথিলা।

স্যরি, কী কাণ্ড বলেন! ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আপনাকে কষ্ট দিলাম!

স্যরি কেন? আমার তো ভালই লাগল! মুখ টিপে হাসতে থাকে চয়ন।

কী! চোখ পাকিয়ে তাকায় মিথিলা কিন্তু হঠাত চয়নকে টপকে আসনের উপরের তাকে রাখা ছোট্ট হ্যাণ্ড লাগেজটা নামাতে যায়। আর তখনি ওর উন্মুক্ত নাভীমূল আর ফর্সা পেটের অনেকটা চয়নের ঠোঁট ছুঁয়ে যায়! ঘটনার আকস্মিকতায় স্থাণু হয়ে যায় দুজনেই। যুগল পর্বতের মধ্যস্থিত গিরিখাদ পেরিয়ে চিবুকের কিনারা চুমে একজোড়া হরিণ চোখে আটকে যায় চয়ন। ক্ষণমাত্র, কিন্তু তাতেই কোথায় যেন একটা ভয়াবহ ভাংচুর হয়ে যায়। সে খবর যার ভাঙ্গে, সেই কেবল জানে!

বাইরে বেরিয়ে ঠাণ্ডার প্রকোপটা বুঝতে পারে মিথিলা। একটা গরম কিছু না নেয়াটা বিরাট বোকামি হয়ে গিয়েছে। শেষ রাতের হাড় কাঁপানো হাওয়ায় মিথি থেকে থেকে কেঁপে উঠতে থাকে। নাটক-সিনেমার বহুল চর্বিত চর্বণের মত হলেও চয়ন নিজের জ্যাকেটটা দিয়ে মিথিকে মুড়ে দেয়। মিথি বাধা দেয় কিন্তু কোন কথা না বলে শক্ত হাতে তা প্রতিহত করে চয়ন।

বিমান বন্দরের ডিপার্চারের বিশাল পর্দায় যার যার গন্তব্য দেখে নেয় দুজনে। এখান থেকে আলাদা হয়ে যাবে তারা। হয়তো আর কোনোদিন দেখা হবে না। শুধু বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে একে অপরের চোখে। সেখানে কীসের একটা বোঝাপড়া যেন সব বাধা ছাপিয়ে উপচে পড়ে যাচ্ছে! কান্না পেয়ে যায় মিথির। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে, আপনার জ্যাকেটটা?

থাক, তুমিই রাখ। আমাদের বন্ধুত্বের নিদর্শন!

আর কোন কথা হয় না। ওরা বোধহয় হারিয়ে গেল চিরতরে একে অপরের থেকে…

———–০০০০০০————-

কিছু দিন পর… জ্যাকেটের পকেটে একটা চিরকুট পেল মিথিলা,

মিথিলা, ইউ আর আ টেরিব্যল লায়ার! আর একটা ফোন নাম্বার। এগার ডিজিটের।

ওপাশে রুকস্যাকের পকেটে আরেকটা চিরকুট পেল চয়ন,

চয়ন চৌধুরি, কাওয়ার্ড কোথাকার! আমি তোমাকে ঘৃণা করি। কেন বলতে পারলে না?

চয়নের হৃদপিণ্ডটা মুখে যে চলে এসেছিল, এটাও কি বলে দিতে হবে?

♥চুপি চুপি♥

দাঁড়ান বলছি। এত তাড়া দিলে কি চলে? ঘটনাগুলি ঝটপট ঘটে গেলো।

চশমা কিনতে যাবে-এ উপলক্ষ্যে যে আমার ডাক পড়বে…কোনোদিনই ভাবি নাই! জীবনে বোধহয় এই প্রথম নাকের কাঁধে পাকাপাকি চেপে বসা দৈত্যটিকে বেশ ভালো লাগতে থাকল। সম্মতি জানাতে গিয়ে প্রায় তোতলা হয়ে গেলাম। হা ঈশ্বর, এসব কী হচ্ছে? মেয়েটি যদি বুঝে যায়? কোনোমতে বললাম: ‘ফ্রাইডে আফটারনুন –এ যাওয়া যেতে পারে’। হ্যাঁ সূচক একটা মাথা নাড়িয়ে মেইজিন চলে গেলো। আমার ভুলও হতে পারে…একটা অস্পষ্ট হাসির রেখা কি ছিল না ওর ঠোঁটে? বুকের কোথায় যেন কিছু একটা ভাংচুর আবার শুরু হল?

এরকমই হয়ে আসছে বেশ ক’টি বছর। হ্যাঁ, আপনারা যা অনুমান করেছেন তাই হয়তো ঠিক। আমি এই মেয়েটিকে একান্ত চাই…অবশ্যি একতরফা…এটাও নিশ্চয় বলে দিতে হবে না! নাকি অন্য কিছু একটা আছে, প্রচন্ড চাপা স্বভাবের মেয়েটিকে বোঝাই দায়…সত্য বলতে গেলে কথাটা আমার জন্যও খাটে বৈকি!

মেইজিন কে প্রথম দেখাতেই ভাললেগে গিয়েছিলো। আমার সহকর্মী ছিল। কিন্তু অনেকদিন পাশাপাশি কাজ করেও ঐ যে আপনারা যেটা ভালো জানেন, সেটা আর বলা হয়ে ওঠে নি। ইনফ্যাক্ট, কেউই বলতে পারে নি। সহজ ব্যবহারের মোড়কে একধরণের দুর্ভেদ্য দেয়াল ছিলো যেটার ভাঙ্গাটা অসম্ভবের নামান্তর ছিল। আপনারা হয়তো বলবেনঃ ‘এ আর এমন কী? ওরকম হয়েই থাকে। তোমার সাহসে কুলোয় নি!’ হবে হয়তো…কিন্তু বুঝতে বুঝতে বিচ্ছেদটা হয়েই গেলো।  মনে থেকে গেলেও ব্যস্ততার কারণে আর যোগাযোগ হয়ে ওঠেনি। সেদিন হঠাত করেই স্টেশানে দেখা হয়ে গেলো। কথায় কথায় জানলাম চোখে ভালো দেখছে না; আমি যদি সময় করে ওকে নিয়ে যাই? আপনারাই বলেন, আমি ওর জন্য সময় বের করতে পারবো না? এও কি হয়? টানা টানা চোখের দিকে তাকিয়ে হারিয়ে যাওয়া কী যেন একটা খুঁজছিলাম, নিজেও ভালো জানি না।

তারপর মাঝের দিনগুলি কীভাবে যে কেটে গেলো…ভয়ানক অস্থিরতা…কী পরবো, কী বলব…এইসব হাবিজাবি। একটু হাসিও পেলো। নিজেকে বললামঃ ওহে প্রেমের মরা, শপিং –এ সাহায্য করতে তোমায় ডেকেছে। আর তুমি কিনা…ছিঃ ছিঃ! সে যাই হোক, শুক্রবারের সকাল-দুপুরটা অফিসে যেন কাটতেই চাইছিল না। তার উপর সহকর্মী মহিলা জেমস বন্ড মেয়েটির অনুসন্ধিতসু চোখ নাচানিঃ ‘কি হে! আজকাল দেখতেই পাচ্ছো না বুঝি? তা, মেয়েটি কে শুনি, ওই যে আজ বিকেলে যাওয়ার জন্য হেঁদিয়ে মরছ?’

নিঁখুত অভিনয়ে আকাশ থেকে পড়ে বললাম, ‘ কি যা তা বলছ কারমেন, কোথায় আবার যাব?’
থাক, আর জঘণ্যতম অভিনয় করতে হবে না। ইয়েলো স্টিকি নোট এ নাম আর সময় লিখে মনিটরে সাঁটিয়ে পূজো করছো আর বলছো কিনা কী যা-তা বলছি হা হা হা। সত্যিই তাই তো! ভুলোমনের মাশুল আর কী! জিভ কেটে ২০ মিনিট হাওয়া হয়ে যেতে হলো। নইলে কারমেন কী জিনিস যে বুঝবে সে আজীবন মনে রাখবে।

মোবাইলে নক নক শুনে তাকিয়ে দেখি একটা মেসেজ এসেছে। মেইজিন। সে নাকি আমার জন্য স্টেশানে অপেক্ষায় আছে। হাউ সুইট! তড়িঘড়ি করতে গিয়ে টেবলে হোঁচট খেয়ে গেলাম। অট্টহাসি শুনে কারমেন কে জায়গামত একটা রাম-চিমটির অবশ্য পালনীয় প্রতিশ্রুতি দিয়ে বেরিয়ে গেলাম।

বিশাল স্টেশানে ঘরফেরতা গিজগিজে মানুষের ভীড়ে কাউকে খুঁজে বের করাটা বিরাট ঝামেলার। মোবাইল করা যেতে পারে, কিন্তু করতে ইচ্ছে হলো না। অনুমানের উপর ভিত্তি করে গেইটের বাইরে কস্টা কফি’র আশেপাশে চোখ বুলালাম। আর তাতেই সুন্দরী চোখের ফ্রেমে বন্দী হয়ে গেলো। একধরণের ছেলেমানুষি পেয়ে বসল; প্রতীক্ষায় ওকে কেমন দেখা যায় আর কী! আর সে দৃশ্য…একবার মোবাইল, একবার গেইটে। সুন্দর মুখখানায় বহু আকাঙ্খিত কাউকে স্পট করার শিশুসুলভ চাঞ্চল্য-বিরলই বটে! মনের ভেতর দুর্মুখ আমিটি বলে উঠলোঃ আবে গাধা, চশমা কেনা কীভাবে হবে এই চিন্তায় ব্যাকুল হয়েছে আর তুই কিনা ছিঃ ছিঃ! ‘ইয়্যু’ড নট বিলিইভ ইয়্যর আইজ, ইফ টেন মিলিয়ন ফায়ারফ্লাইস…’ মোবাইলের রিংটোনে সম্বিৎ ফিরে দেখি কল করেছে। আমাকে ওদিকটায় ডাকছে। আমার যা স্বভাব, ভাবনায় হারিয়ে গেলে তো খেয়াল থাকে না..দেখেই ফেললো নাকি?

তুমি বুঝি খুঁজছিলে আমাকে অনেকক্ষণ? আমি তো তোমাকে খুঁজেই পাচ্ছিলাম না।

নাহ, এই এই তো…এইমাত্র এলাম। দাঁড়িয়ে দেখছিলাম-এটা কীভাবে বলি আপনারাই বলুন। কিছু কিছু মিথ্যে সত্যের মত করে বলতে হয় নইলে উপায় নাই। টুকটাক কুশল বিনিময়ের ফাঁকে অপ্টিসিয়ানের কাছে যাচ্ছিলাম। বেশ বুঝতে পাচ্ছিলাম আগের মত স্বচ্ছন্দ আর নেই সে। কেমন আড়ষ্ট হাঁটছে। কিন্তু কেন? আমার উপস্থিতি…তবে কী?

তুমি আগের মতই আছো দেখছি! হুটহাট ভাবনায় ডুবে যাও; একটা এক্সিডেন্ট যে এতদিনে করে বস নি এটাই আশ্চর্য!

তা, এক্সিডেন্ট করলেই কী আর না করলেই কী? কেইবা ভাবছে বলো? এ দুনিয়াতে তো আমার বলার মত কেউ নেই!

সে কী! কেউ জুটেনি এতদিনে?

এখন তো মনে হচ্ছে এক্সিডেন্টে কাঁদবার জন্য হলেও একজন থাকলে মন্দ হতো না…হা হা হা।

মেয়েটিও হাসছে। এত সুন্দর লাজুক হাসি! হঠাৎ বড় শূন্য শূন্য লাগতে থাকলো। বুকের ভেতরে একটা চিনচিনে ব্যথা। সেটা এই হঠাৎ প্রাপ্তিতে নাকি বহুকালের অপ্রাপ্তিতে-ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না। এখন আপনারাই বলেন ঐ যে আপনারা কী যেন একটা বলাবলি করছিলেন সেটাই আমাকে পেয়ে বসেছিল কিনা?

চেংড়া অপ্টিসিয়ানটি সময় নিয়ে (একটু বেশিই হবে, আপনারাই বলুন, সহ্য হয়?) ছোটখাট সার্কাস দেখিয়ে একটা প্রেসকৃপশান ধরিয়ে দিল। দেখলাম এমন কিছু নয়; সেও হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। এখন ফ্রেম দেখার পালা।

এত সুন্দর চোখ তোমার…সেগুলি কিনা এই হতচ্ছাড়াগুলি (চশমা) দু’হাত দিয়ে সারাক্ষণ আগলে রাখবে! উহ! ভাবতে পারছি না!

বুঝলেন আপনারা, জানি না কী ছিল এই কথায়…মেইজিন এতো মজা পেয়ে হাসতে থাকলো যে আশে পাশের কয়েকটা চ্যাংড়া ট্রেইনি এসে অযথা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠলো। কীভাবে তারা সাহায্য করে ওকে ধন্য করবে তাই বলে কান ঝালাপালা করে ফেললে। এমন কটমট করে চাইলাম যার মানে করলে দাঁড়ায়ঃ ‘ ভালো চাস তো কেটে পড় উজবুকের দল’। কীভাবে আমি এই কাজটি করতে পারলাম, সেটা আপনারাই বের করুন।

মেইজিন বলে – তোমার চোখও তো সুন্দর! তবে সেগুলি কেন লুকিয়ে রাখো? (মিটিমিটি হাসি)

আহেম, ইয়ে…সেটাও দেখতে পেয়েছো? আশ্চর্য! আনন্দদায়ক কিন্তু অপ্রস্তুত ভাবটা লুকোতে মেয়েদের একটা ফ্রেমের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। ফ্রেমটা পরিয়ে দিতে গিয়ে ওর পুরো মুখটা আমার দু’হাতের মধ্যে হঠাত বন্দী হয়ে জমে গেলো। একটা বারংবার না বলা অচেনা আলো গভীর কিছু উপলব্ধিকে সহসা আলোকিত করে দিয়ে বিস্ময়ে যেন থির হয়ে আছে! আর আমি আবার হারালাম। স্থান-কাল-পাত্র ভুলে গভীরতম ভাষায় প্রাচীনতম বেদনার কথা নিমিষে কোন ফাঁকে জানিয়ে দিলাম, বলতে পারি না।

উড ইয়্যু লাইক টু গেট দ্যট ফ(র) ইয়্যর গার্লফ্রেন্ড, স্যর? আয় ক্যান টেল ইয়্যু ইট’ড বি আ পারফেক্ট ওয়ান ফ(র) হা(র)। সাথে গা-জ্বালানো একটা হাসি ফ্রী।

সম্বিৎ ফিরে পেয়ে দ্রুত হাত সরিয়ে নিয়ে, খানিকটা কেশে বললাম, ‘আমরা বন্ধু মাত্র, অন্য কিছু নয়’

ইয়াহ, উই ক্যান সী দ্যট ভেরি ওয়েল।

ফাজিল কোথাকার! তাড়াতাড়ি দাম মিটিয়ে দিলাম। ও অনেক আপত্তি করল, কিন্তু অনেক করে বুঝিয়ে রাজী করালাম…উপহার দেয়ার কথা বললাম। ভাবলাম,

“How a silly thing like this
can cry out
my long cherished longing?
I do, I do, I do…
love you for anything;
whatever be the price,
in this dear old world, you and I see.”

 

আরে দাঁড়ান, দাঁড়ান। চট করেই পরিসমাপ্তি টেনে বসবেন না যেন আবার! আমি জানি আপনারা অভিজ্ঞজন; অনেকই জানেন। তবুও বলব, সব ঘটনা সবসময় চিরচেনা অভিজ্ঞতার ঋজু পথে হাঁটে না। আমার ক্ষেত্রেও তা হলো কিনা দেখুনই না?

এইসব ঘটনা কিংবা অঘটন এগুলোর কোনটার জন্যই আমরা হয়তো প্রস্তুত ছিলাম না। বাইরে বেরিয়েই মেয়েটা গম্ভীর হয়ে গেলো-একটু বেশিরকমের গম্ভীর! পাশাপাশি হাঁটছি অথচ কেউ কোনো কথা বলছি না। আমি একটু ঘাবড়ে গিয়ে মৌনতাকেই জায়গা করে দিলাম। অনেক সময় নীরবতা না-বলা কথাগুলোকে বাড়াবাড়ি রকমের অনায়াসে বলে ফেলতে পারে। হঠাত কী হলো জানি না…আচমকা থেমে গিয়ে কিছুক্ষণ আমায় খুঁটিয়ে দেখে বলল, ‘যিয়াদ, কফি খেতে ইচ্ছে করছে, খাবে আমার সাথে?’ এই সময় আকাশটাও ভেঙ্গে নেমে পড়ল। আমিও কি ভেঙ্গে পড়ছিলাম না?

স্বচ্ছ কাচের ঢাউস জানালা দিয়ে ক্ষয়াটে বিষন্ন আলো ছোট্ট টেবলটাতে মাখামাখি হয়ে পড়ে আছে। আর মুখোমুখি আমরা দু’জন। আমার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না। এই আলো-আঁধারিতে মেইজিন আর আমি-স্বপ্ন দেখছি না তো? কী একটা অর্ডার করল আমার কানেই গেলো না! আমি আকাশের কান্না দেখছিলাম আর মনে যে কত কিছুর ঝড় বয়ে যাচ্ছে… গাঢ় স্বরে তন্ময়তা ভেঙ্গে গেলো, ‘ শোন, এদিকে তাকাও’

হ্যাঁ, কী বলছিলে? জিজ্ঞাসা করলাম।
আমাকে খুব কঠিন মনে হয়, তাই না?
কেন এ কথা বলছো?
আসলে কেউ আমাকে বুঝতে পারে না। সবাই কেবল বাইরেটাই দেখে। কাজ আর পড়াশুনার চাপে সবার সাথে মিশতে চাইলেও হয়ে ওঠে না। আর একটু ইনট্রোভার্ট…আমার আবেগ-অনুভূতি, ভাললাগাগুলো আমার মধ্যেই থেকে যায়…কেউই বোঝে না…শুধু কেউ কেউ ছাড়া…এই যেমন…

আমি জানি, বললাম।
জান? পূর্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল মেয়েটা। একটা কিছু মাপতে চাইছে।
কী একটা বলবো ভাবছিলাম অমনি ওয়েটার মেয়েটি এসে কথার তুফান মেল ছেড়ে দিলো। এবারেও কী বলল কিছুই কানে ঢুকল না। আমি গভীর চিন্তায় ডুবে গেলাম।

চিন্তায় এলোমেলো থাকলে তোমাকে না বেশ লাগে! ও হেসে ফেললো।
তাই নাকি? ক’বে থেকে দেখলে? আমার চোখের তারায় কৌতুক! আমার আর কী কী ভালোলাগে?
বলব না। কানের কাছে চূর্ন চুলের গোছা পাকাতে পাকাতে চোখ নামিয়ে হাসতে থাকল। আমি আবারও বুকে ব্যথা অনুভব করলাম।
যিয়াদ, শোন…একটু থেমে থেকে বলল, ‘ তোমাকে তো ওর কথা বলাই হয় নি!’
কার কথা বলছো?
ম্যাথিঊ ওর নাম। বড় ভোলাভালা, একদম তোমার মত। যে বছর তুমি অন্য জায়গায় চলে গেলে, সে বছরেই…আমরা ভালো আছি, বিশ্বাস করো।

আমার ভেতরে এবার যেন সত্যিকারের ভাঙ্গনের শব্দ শুনতে পেলাম। বাইরে যে আকাশের কালো, তার থেকেও বেশি বিষাদের কালোয় ঢেকে গেলো আমার নিজস্ব আকাশ! বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম যেন। অর্থহীণ মনে হতে লাগলো সবকিছু। তবে দ্রুতই নিজেকে সামলে নিলাম। অভিনয়ের মুখোশই যে আমার নিয়তি সেটা আবার বুঝলাম। হাসতে হাসতেই বললাম, ‘ এতো দারুন ব্যাপার, অভিনন্দন তোমাকে! একদিন পরিচয় করিয়ে দেবে তো?’ কফির কাপে কফি জুড়িয়ে যাচ্ছে…কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সহসা ও বলল, ‘আমি, আমি খুব খারাপ মেয়ে। তোমাকে বোধহয় কষ্ট দিয়ে ফেললাম। বলো আমাকে ক্ষমা করে দেবে?’

আমি হেসে ফেললাম। ‘কেন ক্ষমা চাইছো? এটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেকের আপন একটা গন্ডী হয়েই যায় এবং সবারই নিজ নিজ পরিধি জানা থাকা উচিত। তোমরা ভালো থেকো।‘ এরপর আর কথা বাড়লো না। এই পরিবেশ অসহ্য লাগছে। বাড়ি ফেরা দরকার। তারপর গহীন নিঃশব্দে ডুব।

বাইরে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। আমার ভেতরেও। ওর ছাতা নেই; ইতস্তত করছে, স্টেশানে যেতে হবে তো। একটানে আমার ছাতার নীচে নিয়ে এলাম। ঝুম বৃষ্টি…ঘন হয়ে হাঁটা ছাড়া উপায় নেই। এইতো অবাধ্য চুলের গোছা মাড়িয়ে দিচ্ছে আমার নাক। আহ, সুগন্ধ! একটা দেহজ কোমল উত্তাপ উচিত-অনুচিত্যের সংকীর্ণ পথ গলিয়ে আমাকে হয়তো শেষবারের মত পাগল করে দিতে চাইছে! হাত বাড়াতে গিয়েও নামিয়ে নিলাম। পথ মোটেই দীর্ঘ নয়; স্টেশান ঝুপ করে এসে গেলো।

বিদায় বেলা।

এই যে দাঁড়ান। আমার গল্পটা কিন্তু এখনো শেষ হয়ে যায় নি। ট্রেনে তুলে দিতে যাবো তখন মেইজিন একটা আজব কান্ড করে বসল; হঠাত জড়িয়ে ধরে…… থাক সেটা আপনারা নাইবা শুনলেন। একলাফে ট্রেনে উঠে গিয়ে হাত নাড়তে নাড়তে বলল, ‘ বুদ্ধু কোথাকার! ম্যাথিউ বলতে কেউ নেই! আর মানুষ হলে না! আর লুকিয়ে লুকিয়ে স্টেশানে কাউকে দেখাটা মোটেই ভালো কথা নয়! হি হি হি’
যুগপৎ আনন্দ আর বিস্ময়ে হতবাক হয়ে ওর হাসিটুকু মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত বুকে ধরে রাখলাম। নক নক। মেসেজ এসেছে। ‘ লভ ইয়্যু মোর দ্যান আয় ক্যান সে…’ আর তক্ষুণি নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য হাত কামড়াতে ইচ্ছে হলো- ইস! মেয়েটা ঠিকই দেখেছিলো স্টেশানে কেমন হ্যাংলার মত তাকিয়ে থেকে থেকে স্থাণু হয়ে গেছিলাম! বুক থেকে আলগোছে একটা শ্বাস বেরিয়ে গেলো। এখন আপনারাই বলুন না তাতে দুঃখ, আনন্দ কিংবা স্বস্তি কোনটা ছিলো?

☼সমাপ্ত

:::স্টিলেটোস(Stilettos):::

চার বছর কি খুব বড় কোনো সময়? আবার নিশ্চয়ই তেমন ছোট সময়ও নয়! একই ছাদের নীচে একটা লোককে জানতে কত দিন লাগে? অরণি আসলেই এর উত্তর জানে না! কত দ্রুত সময়গুলি গড়িয়ে গেলো! অথচ এখনও ঠিক মন পেলো না সেজান -এর। কত কিছুই তো করে। কী খেতে ভালবাসে, কী পরে, কোথায় যেতে পছন্দ করে ইত্যাদি নানান ব্যাপার অরণির নখদর্পনে। কিন্তু তবুও সেজান ওর হয় না!
আজ প্রায় চারদিন হয়ে গেলো বেড়াতে এসেছে মামাত বোনের বাসায়। এ ক’টা দিন একবারও নিজে থেকে ফোন করে নি সেজান । অরণিই যেচে ফোন করে খবর নিয়েছে। এই নিস্পৃহতার পেছনে যে অব্যক্ত চোরা গ্লাণিটা আছে, সেটা অরণি বুঝেও বুঝতে চায় না।
আনমনা হয়ে এইসব সাতপাঁচ ভাবছিলো অরণি। ভুলেই গেছিলো রাস্তার পাশে প্রকাণ্ড শপটায় উইণ্ডো শপিং করছিলো। বড় কোনো জুতোর শপ দেখলেই অরণি থেমে যায়। ঐ দেখাই সার। জানে কখনো কেনা হবে না। অত সাধ্য আছে নাকি তার? সেজান -এর টাকায় সে অবশ্য অবলীলায় কিনতে পারে, কিন্তু কখনো মুখ ফুটে বোধহয় বলতে পারবে না। তাই কী আর করা, শুধু দেখেই যাও! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অরণি।
সব জুতোই যে ওর পছন্দ হয়, তা কিন্তু নয়। এক জোড়া স্টিলেটোস বহুদিন ধরে কিনবে কিনবে করেও কেনা হচ্ছে না। না, তার নিজের গরজে নয় – সত্যি বলতে গেলে সেজান -এর আগ্রহের জন্যই কিনবে। লোকটা স্টিলেটোস বড় পছন্দ করে। সোহানার পায়ে নাকি অদ্ভুত মানিয়ে যায়! হুম, সোহানা। নামটা মনে হতেই আবারও একটা দীর্ঘশ্বাস টুপ করে ঝরে পড়ে।
সোহানা সেজান -এর অরণি পর্বের আগের কাহিনি। সব চুকেবুকে গেছিলো প্রায় বছর পাঁচেক আগে। এক তরফা সম্পর্কচ্ছেদ – সোহানার দিক থেকেই। বিয়ের আগেই সেজান ওকে সব জানিয়েছে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও কারণটা উদ্ধার করতে পারে নি। প্রত্যাখানের জ্বালায় জ্বলতে জ্বলতে যে রাগের মাথায় অরণির সাথে বিয়েতে হ্যাঁ বলে দিয়েছে সেজান, এটা বেশ বুঝতে পেরেছিলো অরণি। কিন্তু করার খুব বেশি কিছু ছিলো না। মামার আশ্রয়ে অনাদরে অবহেলায় বড় হওয়া একটা মেয়ের বলার কি খুব বেশি কিছু থাকতে পারে?
বোঝাবুঝির আগেই একদিন প্রকাণ্ড যন্তরের পাখিটা ওদের নিয়ে আকাশে ডানা মেলে দিলো। গন্তব্যঃ বিভুঁই।

ভিন দেশে অরণি আতান্তরে পড়ে গেলো। মাঝে মাঝে মনে হয় বাইরের শীতল প্রকৃতি যেন সম্পর্কের শীতলতার কাছে নস্যি! সেজান ঠিক রূঢ় শীতল ব্যবহার করে না ওর সাথে। কিন্তু উষ্ণতাও যে নেই, এটাও ধ্রুব সত্যি। আর মাঝে মাঝে সোহানা আসে। নানান কথায়, তুলনায়। ইচ্ছাকৃত কিনা, কে জানে? পায়ের সৌন্দর্য নিয়ে এক ধরণের অবসেশান আছে সেজান -এর। তাই সোহানার পায়ে স্টিলেটোস হিলের প্রশংসা প্রায়ই শুনতে পাওয়া যায়। ওরকম সুন্দর পা নাকি দেখাই যায় না! আরো কত কী? আফসোস, অবসেশান থাকা সত্ত্বেও অরণির পায়ের দিকে কখনোই সেভাবে দেখে নি সেজান। সে কি এতটাই ফেলনা? ইচ্ছে করে এক জোড়া স্টিলেটোস কিনে একদিন দেখিয়ে দেয়!

এক্সকিউজ মি প্লীজ, আপনি কি বিশেষ কিছু খুঁজছেন? কোনো সাহায্য করতে পারি?
ঘোর কেটে যায় অরণির। তাকিয়ে দেখে উজ্জ্বল চোখের একটা তরুণ শপ এসিস্ট্যান্ট দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় স্যন্ডি ব্লণ্ড চুল। ওর তন্ময়তা দেখে নিশ্চয় খুব মজা পেয়েছে। ফিকফিক হাসছে।
‘না, না আমি ঠিক আছি। ধন্যবাদ!’ এড়িয়ে যেতে চায় অরণি। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা।
হেল্প করাই আমাদের কাজ। আসুন, আপনাকে আরো কয়েকটা দেখাই। কত সাইজ আপনার? উম…৫? এদিকে আসুন, দেখাচ্ছি।
এমন আন্তরিকতায় ‘না’ বলাটা অশোভন দেখায়। অগত্যা অরণিকে যেতে হলো। এই ফাঁকে ব্যাজ থেকে সে নামটা পড়ে নিয়েছে – এইডেন।
এইডেন হরেক রকমের স্টিলেটোস দেখিয়ে চলেছে। সেদিকে তেমন মন নেই অরণির। শেষ ক’বে কে এভাবে তাকে এমন উষ্ণ আন্তরিকতা দেখিয়েছে, মনে করতে পারলো না। ব্লণ্ড ছেলেটা অবশ্যই পেশাগত দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু তা বাদেও কিছু একটা অরণিকে অস্বস্তিতে ফেলে দিলো।
কেউ কি কখনো আপনাকে বলেছে – কত সুন্দর এক জোড়া পা আছে আপনার! যে কোনো স্টিলেটোসই মানিয়ে যাবে…
অপ্রস্তুত অরণি চট করে উঠে দাঁড়ায়। বুকটা কেমন ঢিপঢিপ করতে থাকে।
‘আমার একটু তাড়া আছে, তাছাড়া পার্সটাও বোধ হয় ফেলে এসেছি। পরে একবার আসবো, কেমন?’ হড়বড় করে বলে বেরিয়ে যায়।
‘স্যরি, আমি আপনাকে অপ্রস্তুত করতে চাই নি। ইয়্যু রিয়েলি হ্যভ আ ফাবিয়েলাস পেয়ার আভ ফিট!’ পেছন থেকে হেঁকে উঠে এইডেন।

এভাবেই শুরু। ক’দিন পর অরণি কেন যে আবার সেই শপটাতে গেলো, সে এক রহস্য বটে! কীসের টানে? উইণ্ডো শপিং, স্টিলেটোস নাকি ঐ ব্লণ্ড ছেলেটা? কোনটা যে ঠিক, ঠাহর হয় না! এমন ভাবনায় পায়ে পায়ে পেছনে এইডেন এসে হাজির হয়।
‘কী? আজকে নিশ্চয় পার্সটা নিয়ে এসেছেন, নাকি? কোন্‌টা নেবেন? আবার দেখাবো?’ সকৌতুকে জিজ্ঞেস করে এইডেন।
কাজের থেকে খুচরো কথাই হয় বেশি। জানাশোনা ডালপালা মেলতে থাকে সন্তর্পনে। কিন্তু এবারও জুতোটা কেনা হয় না অরণির। যাওয়ার সময় এইডেন জিজ্ঞেস করে, ‘আপনার নামটাই তো জানা হলো না, মিস্‌?’
কীভাবে নিশ্চিত হলেন আমি মিস্‌ – মিসেস্‌ও তো হতে পারি।
হোয়াটেভা(র)…কী নাম তোমার?
কাল বলবো। হেসে ফেলে অরণি।
‘কাল আসবে?’ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এইডেনের চোখ! কিন্তু অরণি কিছু বলে না। কী একটা আনন্দ দুই চোখের তারায় ঝিকিমিকি খেলতে থাকে।

দিনটার গায়ে শত বর্ণের প্রলেপ লেগে যায়। নদীর ধারে রাস্তাটা ধরে এলোমেলো হাঁটতে থাকে। ইচ্ছে করছে এখানেই থেকে যায়। নতুন করে জীবনটা কি আবার শুরু করা যায় না? দমকা হাওয়ার মত আকস্মিক এই চিন্তাটায় থমকে দাঁড়ায় অরণি। কেন এমন ভাবছে?

বেলা পড়ে এসেছে। শীতের এই বিকেলগুলোতে ঝুপ করে নেমে আসে আঁধার। রুটির টুকরোগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাওয়াচ্ছিলো অচেনা কতগুলি পাখিকে। হটাত সেগুলি ঝাঁক বেঁধে উড়ে চলে যায়। বিষন্ন হয়ে যায় অরণি। সবারই ঘরে ফেরার তাড়া; শুধু তারই নেই! তার ঘর থেকেও হলো না কেন? নিস্তরঙ্গ জীবনে একটা সর্বগ্রাসি ঢেউ উঠেও যেন মিলিয়ে যেতে বসেছে।

হঠাত মুঠোফোনটা বেজে উঠলো। কে আবার, এই সময়ে? বিরক্তিভরে স্ক্রীনে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলো। সেজান ওকে ফোন করেছে? আশ্চর্য হলেও ফোনটা ধরে না। বেজে বেজে ভয়েস মেলে চলে গেলো। কানে লাগিয়ে শুনলোঃ একটা ভরাট কণ্ঠে শুধু দু’টি শব্দ – কোথায় তুমি? এতদিন পর শুধুই দু’টি শব্দ! আর কি কিছুই বলার নেই? কিছুই ভালো লাগছে না। নিজেকে বড্ড প্রতারিত মনে হয়। কিন্তু দোষটা কাকে দেবে সে – ঠিক বুঝে উঠলো না!

সেজান বড় অবাক হয়ে যায়! অরণির মামাত বোনকে ফোন করে জেনে নিয়েছে সেই সকালে নাকি বেরিয়েছে। ফোনও ধরছে না। দু’সপ্তাহ হতে চললো সর্বশেষ কথা হয়েছে। সব সময় অরণিই খোঁজখবর রাখে। শুধু এবারই ব্যতিক্রম। অবজ্ঞার খুব গভীরে কোথায় যেন একটা উদ্বেগের বুদবুদ ভেসে ওঠে। কী হলো মেয়েটার? এই ভাবনাটার জন্য নিজের উপরই এক প্রকার চটে ওঠে সেজান।

সমস্যাটা বোধহয় আস্থার সংকট। বিনা মেঘে ব্জ্রপাতের মত সোহানার মুখ ফিরিয়ে নেয়া সেজানের বিশ্বাসের জায়গাটা একেবারে তছনছ করে দিয়েছে। কাউকে আপন করে নিতে এখন তার বড্ড ভয় হয়। পেয়ে হারানোর ব্যথাটা সে বোঝে। তবুও একটা চেষ্টা সে একবার নিয়েছিলো। অরণিকে আসলে অপছন্দ করার কিছু নেই। চমৎকার মেয়ে; সাবলীল ব্যক্তিত্ব। কিন্তু নিজের করে নিতে পারলো কোথায়? এতগুলি বছর বোধহয় বৃথাই গেলো। আসলে কি তাই?

বাসায় ফিরে অরণি কিছুই খেলো না। রুচি উবে গেছে। বিছানায় শুয়ে কেবল এপাশ-ওপাশ করতে থাকলো। দু’চোখে ঘুম নেই। বুকের ভেতর যেন একটা আজব ম্যাচ চলছে। প্রতিদ্বন্দ্বী – সেজান আর এইডেন। কার পক্ষ যে নেবে, এটাই বুঝে উঠছে না অরণি। প্রচণ্ড টানাপোড়েনে ধুঁকতে ধুঁকতে শেষটায় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লো। সিদ্ধান্ত অবশ্য নেয়া হয়ে যায়।

সকাল থেকেই একটা অদ্ভুত শূন্যতায় পেয়ে বসে সেজানকে। কী যেন একটা খোয়া গেছে – এরকম একটা ভাব। নিজের মনকে বোঝালোঃ আর পাঁচটা অভ্যাসের মত অরণির অস্তিত্বও এক রকম। যেন প্রিয় একটা আসবাব বেখেয়ালে হাতছাড়া হয়ে গেছে! এই ভাবনাটায় এক প্রকারের স্বস্তি অনুসন্ধান করে সেজান। কিন্তু প্রবোধের প্রচ্ছন্ন অসারতায় খুব গভীরে গিয়ে ঠিকই অলখে জব্দ হয়ে যায়!

দুপুর নাগাদ ভেতরে ভেতরে ব্যস্ত হয়ে ওঠে সেজান। মোটে তো ১৫০ মাইল! হাইওয়ে ধরে গেলে কত লাগবে? চলেই যাবে নাকি? হঠাত গিয়ে চমকে দিলে খুব কি ছেলেমানুষি হয়ে যাবে? চুলায় যাক সব দ্বিধা! সেজানের হাতে আলগোছে সি আর ভি –এর চাবিটা উঠে আসে।

শেষ বিকেলের ক্ষণজন্মা মধুর আলোয় অদ্ভুত সুন্দর লাগছে অরণিকে। নদীর ধার ঘেঁষে রাস্তাটা ধরে হেঁটে যাচ্ছে। বেশ ক’জোড়া কৌতূহলী চোখ কখনো আড়চোখে, কখনোবা সরাসরিই তাকিয়ে আছে। সেইসব চোখে নিখাদ মুগ্ধতার সাথে কড়কড়ে অসভ্যতা থাকলেও আজ কিছুই গায়ে মাখে না অরণি। আজ বড্ড আনন্দ হচ্ছে। হঠাত মনে হয় – প্রশংসাকারি চোখগুলি কি এক প্রকারের জীবন্ত আয়না নয়? বন্ধনের বদ্ধ জলে নিজের অপরূপ তরঙ্গটাই তো ভুলতে বসেছিলো!

জুতোর দোকানে গিয়ে জানতে পারলো এইডেন আজ আসে নি। আশ্চর্য! গতকাল তো বলেছিলো আজ আসবে… মনটাই খারাপ হয়ে যায়। শুধু তার সাথেই কেন এসব ঘটে? পেয়েও সব খোয়া যায়।

শীত আরো জেঁকে বসেছে। বাইরে বেরিয়েই জ্যাকেটের হুডটা তুলে দিলো। আনমনে পথের হলুদাভ ঝরা পাতাগুলো দেখতে দেখতে হাঁটছিলো। ঠিক যেন তার মতই বিবর্ণ! হঠাত দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়! কিছু বুঝে উঠার আগেই দেখে স্যন্ডি বণ্ড চুলে ঢাকা উজ্জ্বল চোখে রাজ্যের দুষ্টুমি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এইডেন। তার হাত দু’টো অরণির সরু কোমর ঘিরে শক্ত আকর্ষনে ব্যস্ত!

অদূরে বিনা কারনেই(!) কারো ক’টা হার্টবিট মিস হয়ে যায়!

এই আকস্মিক চমকে অরণির ভালো লাগতে থাকলেও সে দ্রুত বিবেচনা ফিরে পায়। ঝট করে কিছুটা রূঢ়ভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে হাঁপাতে থাকে। এইডেনের চোখে কিংকর্তব্যবিমুঢ় চাহনি। সে কিছুটা ঘাবড়ে গেছে।

আ’ম স্যরি! কালচারাল ডিফরেন্সটা আমায় মাথায়ই আসে নি। কিছু মনে করো নি তো!
‘না, ঠিক আছে’ অদ্ভুত একটা অস্বস্তিতে পড়ে যায় অরণি।
‘আমরা কোথাও বসি যদি তোমার আপত্তি না থাকে?’ জিজ্ঞেস করে এইডেন।
হ্যাঁ, সেটাই ভালো। ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছি।
হেসে ফেলে অরণি। এইডেনও হাসে। পাশের একটা ক্যাফেতে দু’টো গরম কফি নিয়ে দু’জনে বসে পড়ে।
কী কথা হয়, কে জানে? তবে, মাঝে মাঝে বাঁধ ভাঙ্গা কিছু হাসি আর পরিবেশের প্রাঞ্জলতা বলে দেয় অনন্য কিছু সুন্দর সময় যাপনের কথা। কী আশ্চর্য অরণি এতো সুন্দর হাসতে পারে? কই কখনো তো খেয়াল করে নি! সেই হাসিটুকু কেন ওর নিজের নয় – এই ভাবনাটার প্রবল যন্ত্রণাকাতর ঈর্ষায় পুড়তে থাকে সেজান। এ এক নতুনতর অভিজ্ঞতা। সোহানার পর কেউ কখনো এমন প্রবল যন্ত্রণায় ফেলতে পারবে – এই কিছুক্ষণ আগেও যে ভাবতে পারে নি।

অরণি হাত বাড়িয়ে এইডেনের একটা হাত ধরে ফেলে। দু’জন খুব কাছাকাছি চলে আসে। এ কী চুম্বনও হয়ে যাবে নাকি? সেজান আর ভাবতে পারে না। মাথায় দপ করে একটা ক্রোধের আগুন জ্বলে ওঠে। ইচ্ছে করে উঠে গিয়ে ছেলেটাকে দুইটা বসিয়ে দেয়। কিন্তু আগুনটা যেমন ফট করে জ্বলে ওঠে, তেমনি অকস্মাৎ নিভে যায়। কোন অধিকারে করতে যাবে সেটা? এই চার বছরে উপেক্ষার গ্লাণি ছাড়া আর কী দিয়েছে সে অরণিকে? তার অপরাধের তো সীমা পরিসীমা নেই। নিজের ব্যর্থতার ঝাল মিটিয়েছে চমতকার মেয়েটির উপর। অথচ এটা কি ওর প্রাপ্য ছিলো?

ধীরে ধীরে সব মনে পড়ে যেতে থাকে সেজানের। অনেক চেষ্টা করেছে অরণি। কীসে মন পাওয়া যাবে সেজান –এর? সেজান বরাবরই এসব শীতলতার সাথে নিয়েছে। আত্মিক যোগসূত্রে বাঁধা পড়তে চায় নি ইচ্ছে কিংবা অনিচ্ছায়। আহ্‌, কী নিদারুণ অন্যায়! এখন সেই মেয়েটি যদি মনের মত কাউকে খুঁজে নিতে চায়, তাতে কীভাবে দোষ দেখে! বরং সব দোষ নিজের – মেনে নেয় সেজান। তারপর ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এঞ্জিনটা চালু করে। ফিরে যাবার পথ ধরে।

প্রবল বেগে মাথা নাড়াতে থাকে এইডেন। সেটা বোধগম্যতায় নাকি অবুঝ আব্দারের শোকে – ঠিক বুঝতে পারা যায় না। কিন্তু অরণির চোখ সেদিকে নেই। হঠাত ওর দৃষ্টি আটকে গেছে পাশ দিয়ে বেড়িয়ে যাওয়া সি আর ভি টার দিকে – কেমন যেন পরিচিত! দ্রুত লাইসেন্স প্লেটটা পড়ে দম আটকে যায়। এ তো ওদের – কীভাবে এখানে এলো? তার মানে সেজান কি…? আর ভাবতে পারে না অরণি। ঝট করে উঠে দাঁড়ায়। অল্প ক’টা কথায় বিদায় নিয়ে পা বাড়ায়। সময় বেশি নেই!
‘একটু দাঁড়াও, এটা তোমার জন্য এনেছিলাম। প্লীজ, না বলবে না’ এইডেনের চোখে আর্তি।
কী এটা?
একটা ছোট্ট উপহার – এক জোড়া স্টিলেটোস। তোমার পছন্দ হবে। শুধু তোমার আর …… জন্য।

ফাঁকা জায়গাটা ফাঁকাই রেখেই দেয় এইডেন। যে যার মত বসিয়ে নেয় যেন। অরণি ক্ষণকালের জন্য চেয়ে থাকে। একটা নামহীন সম্পর্কের জন্য কেমন একটা ব্যথা অনুভব করতে থাকে। স্টিলেটোস জোড়া শক্ত করে বুকে চেপে ধরে। হিলগুলির সুচালো ডগা বুকের খাঁচায় গিয়ে বেঁধে যেন ওগুলো হিল নয়; একেকটা সত্যিকারের স্টিলেটোস ড্যাগার। দু’টো তীক্ষ্ণাগ্র ডগা যেন অরণির ঘটনাবিহীন জীবনকে এক লহমায় ঘটনাবহুল করে তোলে। কেউ দেখে না একটা সহজ চাওয়া কেমন দু’টো প্রাপ্তির বিপরীত ধারে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যেতে থাকে… জীবনে চাওয়া-পাওয়াগুলো এতো জটিল হয় কেন?

ছোট গল্প: পুনর্ভব

প্রায় প্রতিদিনই তো রাত করে আমায় ফিরতে হয়। মধ্যরাতের শেষ বাসটিকে বিদায় জানিয়ে মিনিট পনেরোর পথ হাঁটছিলাম। জনবিরল রাস্তা; দু’এক জন পথচারি থাকেই তো। অথচ সেদিন কাউকে পেলাম না, আশ্চর্য! বাতিগুলোকে একটু ম্লান মনে হচ্ছে…কিন্তু তাই বা হয় কী করে? এবারে চোখটা দেখাতেই হবে আর কী ভেবে ভেবে এগুচ্ছিলাম। হঠাৎ মাটি ফুঁড়েই যেন একজন সঙ্গী পেয়ে গেলাম। বুকটা অজানা কোনো একটা অস্থিরতা কাটিয়ে উঠে যেন স্বস্তি খুঁজতে চাইল। শীতের নিশুতি রাত; আপাদমস্তক গরম কাপড়ে মোড়া বলে ঠিক বুঝলাম না আমার কোনো প্রতিবেশি কিনা। আমি যেদিকে হাঁটছি ঠিক সেদিকেই যাচ্ছে। বাহ্‌! ভালোই হলো ভাবলাম। তখনো জানতাম না কী অপেক্ষা করছে আমার জন্যে।

হাঁটতে হাঁটতেই দেখলাম আমার সঙ্গী পথচারিটি দ্রুত ব্যবধান কমিয়ে আনছে। মনে হচ্ছে হাঁটার প্রতিযোগিতা বুঝি! আমিও কী মনে করে একটু গতি বাড়িয়ে দিলাম। চোখের কোণা দিয়ে দেখলাম: তারও গতি বেড়েছে। এহে! এই রাতবিরেতে খেলতে চাও? ঠিক আছে, আমিও নাছোড়বান্দা। দ্রুত পা চালালাম…এখন প্রায় ছুটছি…সেও ছুটছে। তখনি ভুলটা করে ফেললাম-ডানে মোড়টা না নিয়ে সোজা যেদিকে পরিত্যক্ত একটা ইস্কুল আছে সেদিকে পা বাড়ালাম। মিনিট পাঁচেক ছোটার পর হুঁশ ফিরে এল-আমি এদিকে কেন? আজব! চারপাশে তাকাতেই গা হিম হয়ে গেলো। প্রায় বিশ গজ দূরে ‘সে’ ও দাঁড়িয়ে আছে! ঠিক একি ভঙ্গি-আপাদ-মস্তক আমার কাপড়ে মোড়া, আমার চোখজোড়া যেন সেখানে বসানো, চশমাটাও আমারি…ঠান্ডার মধ্যেও একটা ঘামের বিন্দু শিরদাঁড়া বেয়ে নামতে চাইছে। এ যে আমিই …শুধু তার মুখে লেগে থাকা একখানা ক্রুর হাসি ছাড়া। এমন আতান্তরে কখনো পড়িনি; পায়ের নীচে ক্ষয়াটে ধূসর মাঠ যেন দুলে উঠলো। চোখটা একটু বুজতেই যেন অতীতের কিছু দৃশ্য শাঁ শাঁ উড়ে গেল…এই একি মাঠ, ভয়ার্ত একটা মানুষের মুখ…ধীরে ধীরে অনুপ্রবেশ…অস্তিত্বের দখলদারিত্বে হেরে যেতে থাকা বিবর্ণ একটা সত্তা। আচমকা সব মনে পড়ে গেলো…অজানা থেকে এসেছিলাম…কৌতুহলে মানুষ হতে চেয়েছিলাম। অজান্তে শিকার করেছিলাম উদাসীন একটা মন কে। কে জানত তার বুকে এতটা কষ্ট ছিল! এ ক’টা দিন তাঁর মতই হতে চেয়েছিলাম, কিন্তু এতটা গভীর ক্ষত শুধু মানুষই বয়ে বেড়াতে পারে। বুঝতেই পারিনি ধীরে ধীরে পরাজিত হচ্ছিলাম! ঝুঁকে পড়া সেই আগুন্তকের ক্রুর হাসিটা হটাৎ কোমল হয়ে যায়! নির্নিমেষ তাকিয়ে থেকে ক্ষমা করে দেয় বুঝি। মানুষই বুঝি পারে এতটা দুর্বোধ্য হতে! এরপর আর কিছু মনে নেই আমার!

☼☼☼☼☼☼

ইস্কুলের মাঠে হঠাৎ নিজেকে আবিষ্কার করলাম! বন্ধ হাতঘড়ির রেডিয়াম আলোয় তারিখটা দেখে আঁতকে উঠলাম! ইয়া আল্লাহ! ছয়মাস সাতদিন কোথা দিয়ে গেলো! কিছুই বুঝতে পারছি না। ধুলো ঝেড়ে দিক ঠিক করে হাঁটতে থাকলাম। একটা অন্য রকম বিষাদে মনটা ভরে আছে। কিন্তু কেন? মন বলছে সব জানি, কিন্তু কিছুই মনে পড়ছে না! আশ্চর্য!!

সমাপ্ত

♥মিলার মুক্তি এবং এক অচেনা যুবক♥

১.

মিলার মনটা বেশ খারাপ। শিহাব গত রাতেও ফেরে নি। এখন এরকম প্রায়ই হচ্ছে। হুট করে ফোন করে বলে কাজে আটকে গেছে। শিহাবকে চাকরি সূত্রে মাঝে মাঝেই এই শহর ছেড়ে অন্যত্র যেতে হয়। কিন্তু ছুটির দিনগুলোতেও কি চাকরি থাকে? জিজ্ঞেস করলেই আগডুম বাগডুম একটা বুঝিয়ে দেয়। মিলা কি সেসব বোঝে না? সে সবই বোঝে। অনাদর কিংবা উপেক্ষাটা চাপা থাকছে না ইদানীং। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলে না। কী লাভ?
চমৎকার সাজানো বেডরুমের শূন্য কিং সাইজ বিছানাটা কি একধরণের নিষ্ঠুর ব্যঙ্গ নয়? মনে হচ্ছে বিশাল সমুদ্রে একা শুয়ে আছে! আজকের সকালটাও কেমন কেমন যেন। থমথমে মুখের মেঘেদের নিয়ে গোপন কোনো অভিমানে বাকরুদ্ধ হয়ে আছে। জানালা দিয়ে টুকরো বিষন্ন আকাশটা দেখে এসবই ভাবছিলো মিলা। এই দু’বছরে বেডখানা কেবল উপহাসই করে গেলো!
বেলা একটু একটু ধীর পায়ে বাড়ছে। ছুটির দিনে উঠতে ইচ্ছে করছে না। উঠে করবেইটা কী? শিহাব নেই তো নাস্তা করবে কার জন্য? নিজের জন্য কোনোদিনই ভাবনা থাকে না মিলার। যাহোক একটা কিছুতে বরাবরই সন্তুষ্ট থেকে এসেছে। নিজের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে কখনো উচ্চকণ্ঠ হতে দেখেনি কেউ তাকে। তাই যখন শিহাবের সাথে সম্বন্ধটা এলো, রাজী হয়ে গেলো এক রকম। যোগ্য ছেলে। মাল্টি ন্যাশনালে ভালো চাকরি করে। যদিও বয়সের পার্থক্যটা একটু বেশিই ছিলো। কিন্তু কেউ গা করলো না! তবে গোপনে কি বুকটা ভিজেছে একটু? রঞ্জুকে কি ভালোবেসেছিলো ও? তবে সেও তো এক তরফাই ছিলো। ঐ যে নিজের কোনো ব্যাপারই গা করে না। ঐটিও এক প্রকারের একটা অপ্রকাশ্য গল্পের মত হয়ে থাকলো!
এইসব গভীর ভাবনায় কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলো মিলা। সম্বিৎ ফিরে পেলো ফোনের শব্দে। আলগোছে তুলে নিয়েছিলো তাই খেয়াল করে নি নাম্বারটা।

হ্যালো? কে বলছেন?
অলস ঝিমঝিমে গলায় শুধায় মিলা। ওপাশে কোনো সাড়া-শব্দ নেই। বেশ কয়েক সেকেন্ড কেটে গেলো। বার কয়েক জিজ্ঞেস করেই কেটে দিলো। দেখতেও ইচ্ছে করলো কে করেছে। মরুক সব! আবার ভাবনাতে ডুবে যাবে অমনি আবার বেজে উঠলো। এবার নাম্বারটা দেখলো। রাগে গা জ্বলে গেলো। আবার সেই লোকটা…
ফোনটা বেজেই চলেছে। বাজতে বাজতে এক সময় থেমেই গেলো। ইচ্ছে করলেই মিউট করে রাখতে পারে। কিন্তু আজ কী যে হয়েছে… কেমন যেন উপেক্ষা ভাব সব কিছুতে। ফোনটা খানিক বিরতি নিয়ে আবার বেজে উঠলো। কী সুন্দর একটা রিংটোন সেট করেছিলো – বৃষ্টির একটানা ধারাপাতের শব্দ! সেটা বেজে বেজে বন্ধ হয়ে গেলো। আবার কিছু বিরতিতে বেজে উঠলো। প্যাটার্নটা পরিচিত হয়ে গেছে। এ সে-ই হবে। আর কেউ নয়! আচ্ছা ছ্যাঁচোড় তো। না ধরা পর্যন্ত জ্বালাতেই থাকবে।
ব্যাপারটা শুরু হয়েছে প্রায় মাস ছয়েক আগে থেকে। কীভাবে নাম্বার যোগাড় করেছে, কে জানে? খুব একটা কথা বলে না। শুধু জিজ্ঞেস করে – ভালো আছেন? আর একটা গুড়গুড়ে হাসি। ব্যস এটুকুই। কখনোই জবাব দেয় না মিলা। এই সামান্য বিষয়টাকে পাত্তা দেবে না বলে ঠিক করেছিলো। তাই কাউকে জানায় নি। শিহাবকেও না। এ কি বলার মত কিছু? কিংবা হয়তোবা কিছু একটা কি আছে? আজকে হঠাত করে একটু দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ে। ঐ আবার বাজছে।
ফোনটা ধরলো মিলা। রাগত স্বরে – কেন জ্বালান আপনি? কথাও তো একটা বলেন না! শুধু জিজ্ঞেস করেন ভালো আছি কিনা! কী চান আপনি? ভালো নেই, আমি ভালো নেই! খুশি? গলা ধরে আসে মিলার।
ওপাশে এই প্রথম বারের মত কণ্ঠটা চিরাচরিত গৎবাঁধা প্রশ্নটা করলো না। হাসলোও না। একটু যেন বিচলিত! গমগমে ভরাট কণ্ঠে একটু কেশে – ভালো নেই? কেন?
মিলা ঝেঁঝে উঠে – সেটা আপনাকে কেন বলবো?
বলবেন না? তাহলে বলতে গেলেন কেন ভালো নেই?
আমার যা ইচ্ছা তা-ই করবো, আপনি কৈফিয়ত চাওয়ার কে, শুনি?
আমি কেউ না।
ঠিক, আপনি কেউ না। দয়া করে আর জ্বালাবেন না। রাখছি।
না, রাখবেন না, প্লীজ।
কেন রাখবো না?
কারণ আপনি কথা বলতে চাচ্ছেন। একটা খুক করে হাসির শব্দ আসে। রাগ বাড়তে থাকে মিলার।
আপনি অন্তর্যামি, তাই না? আমাকে না চিনেই সব বুঝে ফেললেন।
চিনি না, কে বললো? আলবৎ চিনি।
চেনেন, আশ্চর্য! আমি তো আপনাকে চিনতে পারছি না। মিলার কন্ঠে খানিকটা উষ্মা।
কথা বলতে থাকেন। বলতে বলতেই চিনে যাবেন।
আমার অত চেনাজানায় কাজ নেই। বিরক্তিকর একটা! বলেই খুট করে কেটে দেয় মিলা।

২.

মনটা কি একটু খারাপ হয়ে গেলো? কে এই লোকটা? ওভাবে অভদ্রের মত না রেখে দিলেও তো চলতো। খারাপ তো কিছু বলে নি। জানতে চেয়েছে ভালো আছি কিনা। আশ্চর্যের ব্যাপার, কতদিন পর কেউ একজন সত্যিকারের উদ্বেগে জানতে চেয়েছে ভালো থাকা না থাকার কথা! প্রকৃত আবেগগুলো বুকের গভীরে কখনো ধোঁয়াশা হয়ে থাকে না – ঠিকই পদচ্ছাপ রেখে যায়। মিলা বেশ বুঝতে পারে ঐ জানতে চাওয়াটা কতখানি খাঁটি! উহ, কিছু ভালো লাগছে না। আজকের সকালটাই বড্ড গোলমেলে ঠেকছে!
ভাবনার জাল কাটিয়ে আবার সরব হয়ে ওঠে ফোনটা।
মিলার সাঁড়াশি আক্রমণ – আপনি এত নির্লজ্জ কেন? এভয়েড কথাটি কি আপনার ডিকশনারিতে নেই? না থাকলে এন্ট্রি করে নিন।
ও প্রান্তের কন্ঠটি দরাজ হেসে ওঠে – আমার মনে হচ্ছে না আপনি আমাকে এভয়েড করতে চাইছেন। তারপর সেই বুক ওলটপালট করা নরম কণ্ঠে – বললেন না, মন খারাপ কেন?
কী থেকে কী হয়ে যায় মিলার। ধরা গলাটায় এখন পষ্ট একটা চাপা ফোঁপানির শব্দ শুনতে পাওয়া গেলো। শ্রোতার বিচলতা আরো বাড়ে।
জানেন, ও গতকালও বাড়ি ফেরে নি! এরকম হয়েই চলেছে। বাকীটুকু উদ্গত কান্নায় বলতেই পারে না।
কে বাড়ি ফেরে নি, শিহাব সাহেব? ফোনের রহস্যমানব আলতো স্বরে জিজ্ঞাসা করে।
আবার কে হবে? শিহাব এখন ছুটির দিনেও বাড়ি ফিরছে না। জানেন, আমি আর পারছি না। ও আমাকে ভালোবাসে না। মনে হয় কোনোদিনও বাসে নি!
একটা প্রায় অপরিচিত মানুষের কাছে কীভাবে অকপটে নিজের গোপন দুঃখের কথাগুলি অনায়াসে বলতে পারলো? মিলা বড় লজ্জায় সংকুচিত হয়ে পড়লো। তখনি ব্যাপারটা মাথায় এলো।
আচ্ছা, আপনি শিহাবের নাম জানলেন কী করে? তার মানে ওর পরিচিত কেউ?
অপর প্রান্তে হাসির শব্দ – কী ছিঁচকাঁদুনে, এখন মাথা খুলছে নাকি? হা হা হা। পরিচিত হলেই জানবে। আর কোনোভাবে জানতে নেই? আমি তো আপনার নাম-ঠিকানাও জানি।
জানেন? ওঃ, কীসব বলছি! সব আঁটঘাট বেঁধেই নেমেছেন দেখি!
মিলা!
আপনি কী চান, পরিষ্কার করে বলেন তো? খালি খালি হেঁয়ালি করেন। কী নাম আপনার? থাকেন কোথায়? খালি একটা কথাই ভাঙ্গা রেকর্ডের মত বলেন – ভালো আছেন? কী লাভ আপনার আমি ভালো আছি কিনা জেনে?
লাভ আছে, সে আপনি বুঝবেন না। ভালোবেসেছেন কখনো?
মিলার দম খানিকটা আটকে যায়। সত্যিই তো…সে ভালোবেসেছে কখনো? রঞ্জুর অগোছালো চুলের প্রায় বিস্মৃত মুখটা ভেসে ওঠে। একতরফা বেদনা। তবুও ভালোবাসা তো। কিন্তু নিজেকে বঞ্চিত করে সে সম্ভাবনার গলা সে তো নিজ হাতেই টিপে দিয়েছে। নিজেকে বড় প্রতারিত মনে হতে থাকে। কেন নিজেকে একটুকু পাত্তাও দিলো না এত কাল?
মিলা যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে যায়।
কী, জবাব দেবেন না? ওপাশের নাছোড়বান্দা তাড়া দেয়।
ঘোর ভাঙ্গে মিলার – কী বলছিলেন যেন?
বলছিলাম, ভালো বেসেছেন কখনো…
সে আপনাকে কেন বলবো?
আবার সেই কথা! এই ছ’মাসে আমরা কি একটুও কাছে আসি নি? কাছের মানুষ হতে আর কী কী লাগে, মিলা?
সে আমি জানি না। তবে ভালো করেই বুঝছি, আপনাকে প্রশ্রয় দেয়া আমার মোটেই ঠিক হচ্ছে না। আমি বিবাহিতা.. এটা ঠিক নয়, মিস্টার এক্স…
অপরপ্রান্তে একটা সরল প্রাঞ্জল হাসি ভেসে আসে। সাথে একটু খুনসুটির ভাব।
ভয় পাচ্ছেন? প্রেম প্রেম মনে হচ্ছে? হা হা হা
অকারণ একটা লজ্জা পেয়ে যায় মিলা। আপনি তো ভারী ঠোঁটকাটা! কী সব যা-তা বলছেন?
যা-তা বলছি? আমার তো মনে হচ্ছে আপনার গাল দু’টো লাল হয়ে গেছে। গালের টোলটায়…
থাক, থাক অত বর্ণনায় কাজ নেই! ফোনে শব্দ শুনেই সব বুঝে ফেললেন। আপনি তো রীতিমত ফ্লার্ট করছেন!!
এতক্ষণে বুঝলেন? করলে ক্ষতি কী? বুকে হাত দিয়ে বলেন তো ভালোলাগছে না?
আমার বয়েই গেছে! খেয়েদেয়ে আর কাজ নেই…অসভ্য কোথাকার!
আপনার কণ্ঠটা যে কত মিষ্টি, সে কি জানেন? বলতে গেলে সেই মধু শুনতেই তো হ্যাংলার মত খালি ডায়াল করি। না ধরা পর্যন্ত তীর্থের কাক হয়ে বসে থাকি…
নাহ, আপনার সঙ্গে কথা বলাই আমার ভুল হয়েছে। কোথা থেকে কোথা যে চলে যাবেন। বেশ বিপজ্জনক লোক তো আপনি!
একটা কথা বলি, শুনবেন? গাঢ়স্বরে জিজ্ঞাসা করে ভরাট কণ্ঠ।
শুনছিই তো। বলেন…
ওপাশে খানিক নিস্তব্ধতা। একটা টান টান উত্তেজনার তির এসে যেন সময়ের ধনুকে আপনি জুড়ে যায়। তিরটা একটা কিছু বলবার জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকে। কিন্তু অতি সর্বনাশাও যেন চূড়ান্ত ক্ষণটির আগে কিছুটা বিমূঢ় হয়ে যায়। ভাষা হারিয়ে কাতর চোখে তাকিয়ে থাকে! শেষমেষ অপরিচিতের সেই ব্যাকুলতার কথাগুলো বলা হয়ে উঠে না। সুশীল সংকোচ!!
কী একটা বলতে যাবে অমনি কী করে জানি কিছু একটা বুঝে ফেলে মিলা। বলে – না, না থাক। কাজ নেই আর শুনে।
আহা, শুনেই দেখেন না? ভালোও তো লাগতে পারে।
না, না শুনবো না। এই ফোন সরিয়ে নিলাম।
অপরিচিত হাসতে থাকেন। আশ্চর্য মিলাও হাসতে থাকে। মনোভারের মেঘ কি কাটতে থাকে একটু একটু করে? মনের আকাশ ফর্সা হতে থাকে খুব ধীরে। সাথে জানালার বাইরে থমথমে আকাশটাও। মিলা দেখে মেঘ সরে গিয়ে নরম রোদ্দুর ঝিকিয়ে উঠছে। আচমকা বড় ভালো লাগতে থাকে।
আসেন, আজকে আপনাকে বেড়িয়ে আনি? কেমন হাসছে চারদিক, দেখেছেন?
মিলা কিছু না ভেবেই মুখ ফস্কে শিশুর সারল্যে বলে ফেলে – সত্যিই আসবেন?
পরক্ষণেই বিবেচনা ফিরে পায় যেন। না, না থাক। কিছু মনে করবেন না। সেটা ঠিক সংগত হবে না।
সে আমি বুঝলাম না আপাতত! আমি কিন্তু সত্যিই আপনার জন্য অপেক্ষা করবো… আসবেন মিলা?
না, না। সে হয় না। মিলা ক্ষীণস্বরে আপত্তি জানায়। তাতে অস্বীকার থেকে স্বীকারের পাল্লাই যেন হালকা একটু বেশি ভারী হয়ে থাকে। ওদিকের শ্রোতা ঠিকানা দিয়ে দেয়। একটা পার্ক। বেশি দূরে নয়। মিলাদের বাড়ি থেকে কাছেই। মিলা শুনবো না শুনবো করেও ঠিকই মনে রাখে। মন বড় আশ্চর্যের বস্তু!
ফোনটা একটা দুর্দম প্রতীক্ষার জোরালো প্রতিশ্রুতিতে কেটে যায়।

৩.

মিলা উঠে পড়ে। কি একটা তাড়া যেন বহুদিন বাদে ওকে নাড়া দেয়। বাথটাবের ঈষদুষ্ণ জলে ২৬ বসন্তের লতানো শরীরটা আলতো ডুবিয়ে রাখে। একটা অদ্ভুত পুলক গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। নিজেকে নিয়ে ঠিক ক’বে এরকম ভেবেছিলো, মনে করতে পারলো না। আচ্ছা, সে কি যাবে নাকি? বড় চঞ্চল লাগে।
আবার এ-ও মনে হয়ঃ এই শিহাবের সাথে আরোপিত বন্ধনে সে কী পেয়েছে? শিহাব কেন যে ওকে ঘরে তুলেছে, এ এক আশ্চর্য বটে! বিগত দু’বছরে শিহাবের সাথে কোনো ধরণের এটাচমেন্টই গড়ে উঠলো না। শিহাব কোথায় রাত কাটায়, সেটা আঁচ করতে পারে মিলা। কেন এখন ছুটির দিনগুলোতেও ফিরছে না, এটা বের করাও কঠিন কিছু না। পুরোনো প্রেম ভোলা সহজ নয়। শিহাব ভুলতে পারে নাই। সবাই সব জানে। তবুও শিহাব ফোন করে জানায়। এই আঘাত দেয়ার মধ্যে সুখ পাবার মানসিকতাটা দেখে ঘৃণায় তেতে ওঠে মিলা।
মাঝে মাঝে বড্ড হতাশ লাগে। আজীবন নিজের প্রতি উদাসীন থেকে কী পেলো? অবিশ্বস্ত জীবনসঙ্গী? টানহীন, ভালোবাসাহীন দাম্পত্য? একটা অনাদরের পোকায় খাওয়া তারে ঝুলছে ঘরের সুখস্বপ্ন! অথচ মিলার এটা কি প্রাপ্য ছিলো? সে তো আর দশটা মেয়ের মত একটা ঘরই বাঁধতে চেয়েছিলো। সেটা কি খুব বেশি চাওয়া ছিলো? আর ভাবতে পারে না মিলা। টাবের ফেনিল জলে নীরবে মিশতে থাকে অভিমানের অশ্রুজল। বুকের ভেতর জমে থাকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দিয়ে সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলে।
অনেকদিন বাদে বড় যত্ন নিয়ে সাজছে মিলা। একটা লালপেঁড়ে শাড়ি মুগ্ধ বিস্ময়ে আপ্লুত নদীর মত ছুঁয়ে গেলো মিলার অঢেল সৌষ্ঠব। আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই খানিকটা লজ্জা পেয়ে যায়। অসামান্য স্নিগ্ধ সৌন্দর্যে বুঁদ হয়ে আছে প্রতিটি বাঁক ভাঁজ। আর একটা উপচানো প্রতীক্ষা… কার জন্য? কার জন্য আবার? নিজেই নিজেকে ধ্মকে ওঠে। আচ্ছা, কেমন হবে মানুষটা? যদি হতচ্ছাড়া দেখতে হয়ে থাকে? হলে হবে… সে তো কায়াহীন সত্তাটাকেই কাছে টেনেছে… বাকী ওসবে কী যায় আসে? তবুও এক নিষিদ্ধ আনন্দের মত উত্তেজনায় বিন্দু বিন্দু ঘামে ভিজতে থাকে চিবুকের খাঁজ, কপালের গুচ্ছ চুল।
স্যান্ডেলটা পায়ে গলিয়ে বেরোতে যাবে অমনি বেমক্কা একটা কল পেলো। না দেখে ধরেই জিজ্ঞেস করে – কে? আসছি, বেশিক্ষণ লাগবে না। অপেক্ষা করবেন কিন্তু! যেন নিশ্চিত সেই অচেনা যুবকেই করেছে!
কোথায় যাচ্ছো? বড় অবাক হয়ে যায় শিহাব।
থতমত খেলেও সামলে গেলো মিলা। বলে – ও, তুমি?
কাকে ভেবেছিলে? নাগর-টাগর জুটিয়ে ফেললে নাকি?
ভদ্র ভাষায় কথা বলো, শিহাব। সে শুধু তোমারই জায়গা তা-ই ভেবেছো, না?
মানে কী? স্পষ্ট করে বলো কোথায় যাচ্ছো?
তবে শোনো, একজন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে আমার জন্য। তোমার মত শাক দিয়ে মাছ ঢাকছি না আমি। আমি ক্লান্ত, শিহাব। আর পারছি না। আমি মুক্তি চাই! হয়তো তুমিও চাও…
কথাগুলো অসত্য নয়। নরম মনের একটা মেয়ের থেকে কঠিন এই কথাগুলো শুনেও কিছু বলতে পারলো না। দোষ তো তারও কম নয়! এ তো হবারই ছিলো! লাইনটা আলগোছে কেটে গেলো।

রোদ চড়েছে বেশ। পার্কের গাছগুলো সবুজ পাতার নবযৌবন নিয়ে গর্বিত গ্রীবায় দাঁড়িয়ে আছে। কেউ দৌঁড়াচ্ছে, কেউ হাঁটছে, বাচ্চাকাচ্চার একটা দল হল্লা করছে পাশেই। রেশমি লোমে ঢাকা একটা কুকুর হাতে এক বৃদ্ধ আনমনে চলছিলো। মিলাকে দেখে একটা চোখ টিপে দিলো! কী অসভ্য!
এই রকম মানুষের মেলায় কী করে চিনবে সেই মানুষটাকে? সেই অতি অচেনার তবুও যেন কতকালের চেনা মানুষটাকে? আচ্ছা, ভালোবাসতে কত সময় লাগে? একটা সেইরকম পলই কি যথেষ্ট নয়? অদ্ভুত সেই সময়ে ততোধিক অদ্ভুত প্রতিবোধনের আলো এসে পড়লে যখন বুকের অস্বীকারি উদাসীন তারগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে যেতে থাকে, তখনই প্রেম লাজুক আত্মপ্রকাশ করে। ভাবতে ভাবতেই এলোমেলো হাঁটতে থাকে মিলা। আজ বড় ভারহীন লাগতে থাকে। কোথায় পাওয়া যাবে তাকে? কীভাবে? যদি খুঁজে না পায়? বুকটা ঢিবঢিব করতে থাকে। যদি সে কথা না রাখে। শুধু ফোনে ফোনেই এতদূর! হঠকারিতা কি হয়ে গেলো?
হলে হবে। হঠাত সবকিছুকে ছাপিয়ে যাওয়ার একটা শক্তি যেন ভেতরে ভেতরে টের পায়… নিজেকে নিয়ে ভাবে নি এতকাল। নিজেকে একটুও ভালোবাসে নি। সময় দেয় নি আজন্মের বঞ্চিত সেই দুঃখি মেয়েটাকে। মনে হচ্ছে আজ সেই সময় এসেছে। বেশি ভাববার কী আছে? আজ কিছুতেই খোলসে ঢুকে যাবে না!
সময় পেরিয়ে যাচ্ছে তরতর করে। এদিকে ওদিকে উদ্বিগ্ন চোখে চেয়ে দেখছে। কেউ এগিয়ে এলো না। একটা ঘন্টা বেশি পেরিয়ে গেলো। আচ্ছা, হাতঘড়িটা ঠিক চলছে তো! নাহ, ঠিকই আছে তো! কাউকে কি জিজ্ঞেস করবে সময়টা? এই অধীরতাই কি প্রেম? প্রেম শব্দটা নিজের মনে আউড়ে হঠাত আরক্ত হয়ে যায়। কেমন স্বপ্নীল মনে হতে থাকে সবকিছু! এই কোলাহল, পুঁচকেদের ঝগড়া, বুড়োর চোখটিপি – সব, সব ভালোলাগে। বেভুল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। তখনি কে একটা এসে মিলার আঙ্গুল ধরে টান দিলো।
সম্বিৎ ফিরে দেখে একটা ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে একহাতে একটা গাঢ় লাল গোলাপ আর অন্য হাতে কাউকে দেখিয়ে দিচ্ছে। মিলা খুব মিষ্টি হেসে মেয়েটার গালদুটো নেড়ে দেয়। তারপর…তারপর খুব সন্তর্পনে, সেই ক্রমাগত বাড়তে থাকা ঢিবঢিবানিটা নিয়ে বাচ্চাটির দেখিয়ে দেয়া দিকে পূর্ণচোখ মেলে চাইলো।
অদূরেই দাঁড়িয়ে আছে দীর্ঘদেহি এক যুবক। ঈষৎ অবিন্যস্ত চুল। চোখে ভারী চশমা। আর মুখে লেগে আছে ভারী একটা দুষ্টু দুষ্টু হাসি। মিলার বুকটা একটা অসহ্য ভালোলাগায় টনটন করে ওঠে। ধীর পায়ে হাঁটতে থাকে একে অপরের দিকে। মোটে তো অল্প একটুক পথ। তবু যেন ফুরাতে চায় না। মিলাও চায় না। এত সুন্দর পথচলা যে ওর জীবনে আর আসে নি! আর কখনো আসে নি!
অচেনা যুবক কাছে এসেই ভরাট কন্ঠে বলে ওঠে – ভালো আছো, মিলা!
অস্ফুটে ভালো বলেই চোখ নামিয়ে নেয় মিলা। নত মুখের সেই অনন্য ভঙ্গিমায় মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে যুবক। প্রেম বোধহয় সর্বকালের আশ্চর্যের একটা বস্তু – কোনো বাঁধাই মানে না!

☼সমাপ্ত☼

♥♥প্রথম দেখার সেই রহস্যময়ী!♥♥

আমি মোটেও কচি খোকাটি নই। মধ্য তিরিশের পরিণত যুবক। জীবনের অলিগলিতে প্রচুর হেঁটেছি। মার খেয়েছি, পালিয়েছি, হোঁচট খেয়ে আবার উঠেও দাঁড়িয়েছি। কিন্তু এমন আতান্তরে আর কখনো পড়িনি! প্রচণ্ড গরম পড়েছে। সামনে রাখা ঠাণ্ডা লেবুজলের গ্লাস মুহুর্তে ফাঁকা করে দিয়ে যখনই রাখতে গেছি, তখনই সামনের দিকে তাকিয়ে মনে হলোঃ আবার তেষ্টা পেয়েছে। এ পিপাসা অন্য পিপাসা!

কিছু দিন আগের কথা বলি। মমিনুর রহমানকে অনেকদিন বাদে ভাঙ্গামোড় বাজারে আবিষ্কার করে ফেললাম। আমি, সাদমান রাহী শহরেই থাকি। বহুদিন পর গ্রামে বেড়াতে এসেছি। থাকবো কিছুদিন। শহরের একাকী কাঠখোট্টা জীবনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম। তাই এই প্রত্যন্ত গ্রামে বেড়াতে আসা। কিন্তু মমিন ভাইকে যে পেয়ে যাবো, সেটা ভাবিনি! প্রায় বিশ বছর আগেই তিনি নিরুদ্দেশ হয়েছিলেন। আমার তখন কতইবা বয়স হবে? ১২ কিংবা ১৩ আর মমিনের তিরিশ? তখন একটা ঘটনা ঘটেছিলো যেজন্য মমিন ভাইকে ভোলা আমার পক্ষে কোনোদিনই সম্ভব না! ফ্লাশব্যাকে সব মনে পড়ে গেলো।

এতদিন বাদেও লোকটার তেমন পরিবর্তন ঘটেনি – কেবল কাঁচাপাকা চুলেই বয়স উঁকি মারছে! আমাকে দেখে চিনতে পেরে সে কি খুশী! নানান কুশল জিজ্ঞাসার পর বললেন, ‘বাড়িতে আসিস, সদু। চিনবি তো? ঐ যে বড় পাগারের ধার ঘেঁষে যে রাস্তাটা গেছে, তার মাথায়…’
‘আমার মনে আছে’ জায়গাটা গ্রাম থেকে একটু দূরে ঘন জংলামত হলেও যাওয়া যায়। একটু থেমে জিজ্ঞাসা করলামঃ
‘আমাকে মাফ করছো, মমিন ভাই?’
‘পুরনো সেসব কথা থাক, সদু। তাইলে আসিস কিন্তু, ভুলে যাইস না। একটা সারপ্রাইজও আছে’
‘হ্যাঁ, আসবো। কী সারপ্রাইজ?’
‘আসলেই দেখতে পাবি…এই শুক্রবার বাদ জুমা আয়…’

যথারীতি ভুলে গেলাম। মনে পড়লো পরের শুক্রবারে। ভাবলাম – গিয়েই দেখি, যেতেই তো বলেছে…পরের শুক্রবার – কী এমন তফাৎ?
দরজায় কড়া নাড়লে অনেকক্ষণ কারো সাড়া পাওয়া গেলো না। শেষে চলে যাবো এমন সময় অশীতিপর এক বৃদ্ধা দরজা খুলে রাগি চোখে তাকিয়ে রইল। স্পষ্ট বুঝতে পারছিঃ তাঁর দুপুরের ঘুমটা হারাম করে ফেলেছি। কিন্তু এখন তো করার কিছু নাই!
‘কাকে চাও?’
‘আ…আমি সদু মানে সাদমান। মমিন ভাই বাড়িতে নাই? আমাকে আসতে বলছিলো…’
‘না, নাই। কালকে সকালে আসো। একটু ঘুমাইতেও পারি না, যন্ত্রণা!’

বুড়ির কোনো বোধবুদ্ধি নাই। মেহমানকে একরকম তাড়িয়েই দিচ্ছে। মেজাজটা খারাপ হয়ে গেলো। উল্টো ঘুরে পা বাড়াতেই এক রিনরিনে গলার স্বর শোনা গেলো। ভেতর থেকে কে যেন বুড়িকে তিরস্কার করে উঠলো, ‘পরে ঘুমাও তুমি। ওনাকে ভেতরে নিয়া আসো। মেহমানকে এভাবে বিদায় দিতে নাই!’

কী সুন্দর কন্ঠস্বর! গনগনে রাগের আগুনে যেন জল পড়ে গেলো। এই মোহনীয় কণ্ঠের অধিকারিণীকে না দেখে কীভাবে যাবো– বুঝে উঠলাম না। বুড়ি কিন্তু তখনও জ্বলছে।
‘আসো, ভিতরে আসো। এইখান দিয়া সোজা যাও। ভরদুপুরে মেহমান? যন্ত্রণা!!’

ভয়াবহ গরম পড়েছে। ঝকঝকে লেপা উঠান তাওয়ার মত গনগন করছে। যে ঘরটিতে বসতে দেয়া হলো, সেটা পেয়েই মনে হলো, স্বর্গে বসে আছি। মাটির আধাপাকা ঘর। যত্নের ছাপ সর্বত্র। বাইরের আঁচ খুব একটা এসে পৌঁছাচ্ছে না। গলা শুকিয়ে কাঠ… রুমালে ঘাম মুছছি। এমন সময় আট/নয় বছরের একটা মেয়ে এসে ঝকঝকে গ্লাসে করে খানিকটা লেবুর শরবত দিয়েই উধাও হয়ে গেলো। গ্লাসের শরীরে বিন্দু বিন্দু বাষ্প জমে আছে। আর তর সইল না। ঢকঢক করে এক চুমুকে গ্লাসটা সাবড়ে দিয়ে রাখতে গেছি, তখনই কাণ্ডটা হলো! কিন্নরকণ্ঠীকে দেখতে পাওয়া গেলো।

অসামান্য সুন্দর এক নারী দাঁড়িয়ে আছেন। বয়স আন্দাজ করা শক্ত – মধ্য বিশ অথবা সদ্য ত্রিশের কোঠায়ও হতে পারে। লালপেড়ে একটা শাড়ি বাংলা ধাঁচে পরনে। সেখানে একটা গ্রামীণ সারল্য থাকলেও শরীরী ঐশ্বর্য প্রবল উচ্ছ্বাসে বাঁধ ভেঙ্গে একটা অন্যায় আনন্দের উৎস হতে চাচ্ছে! কাটা কাটা চোখ-নাক-মুখ। মুখে একটা অদ্ভুত হাসি – মৃদু কৌতুকের কি? আমার আবার বড্ড পিপাসা পেয়ে গেলো!

‘প্রথম দেখায় মরণ’ জাতীয় আদিখ্যেতা আমি বরাবরই অস্বীকার করে এসেছি। এসব ছেলেমানুষির কোনো মানে হয় না – এটা ভেবে অতীতে অনেক বিদ্রুপও করেছি। সেই আমিই কিনা… আমার মনে হতে থাকলোঃ আমি যেন তলিয়ে যাচ্ছি। স্থান-কাল-পাত্র ভুলে সেই রুপের আগুনে ঝাঁপ দিয়ে মরে যেতে ইচ্ছে হলো।

আমার এই আতান্তরে মেয়েটি বোধকরি ভিতরে ভিতরে বেশ মজা পেয়ে থাকবে। একটা দমকি হাসি হেসে বললোঃ
‘আপনি নিশ্চয়ই সাদমান ভাই? আমি শিরিন। মমিন সাহেবের স্ত্রী। আপনার কথা বলেছেন উনি’

আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। হঠাত কি বলবো, খুঁজে পেলাম না। গলা খসখস করছে। পঞ্চাশোর্দ্ধ মমিনের এই বউ থাকাটা অষ্টম আশ্চর্যের ঠেকলো! কিন্তু এটা তো হতেই পারে – অস্বাভাবিক কিছু নয় – গ্রাম দেশে এমনটা  অহরহই ঘটে থাকে! অথচ তখন আমার মমিন ভাইকে খুব খারাপ মনে হয়েছিলো। আর একটা গনগনে ঈর্ষা!

দ্রুত সামলে নিলাম আমি। এসব কী ভাবছি? ভদ্রমহিলা মমিন ভাইয়ের স্ত্রী। মমিন ভাইয়ের কাছে আমি আজন্মের ঋণী – কীভাবে এই কুচিন্তা আসে আমার মনে? নিজেকে ধিক্কার দিতে দিতে বাস্তবে ফিরে আসি। একটু গলাটা পরিষ্কার করে,
‘আসলে মাফ করবেন এই ভর দুপুরে জ্বালাচ্ছি বলে। মমিন ভাই বলেছিলো আসতে…’  আমার গলাটা নিশ্চয় আধাভাঙ্গা ফ্যাসফ্যাসে শুনিয়ে থাকবে। মেয়েটা যেন আরো আনন্দ পেয়ে যায়। হাসতে হাসতেই বলে,
‘সেটা তো গত শুক্রবারের কথা। আপনি এলেন না; বেচারা খুব মন খারাপ করেছিলো’
‘আমার ভুলামন ভীষণ…সত্যিই তো, খুব খারাপ হয়েছে কাজটা। আজকেই মনে পড়েছে। আর কিছু না ভেবেই চলে এসেছি!’
‘হ্যাঁ, উনি তো আর জানেন না। নবাবের হাঁটে গিয়েছেন – আসতে রাত হবে অনেক’
‘ও, আমি তাহলে উঠি আজকে। বলবেনঃ আগামিকাল আসবো’

আমার এই তাড়ায় শিরিন ব্যস্ত হয়ে ওঠে।

‘সে কী করে হয়? প্রথম এলেন আমাদের গরিবখানায়। এমনি তো যেতে দিতে পারি না – উনি রাগ করবেন। বসেন, আমাকে ঘন্টাখানেক সময় দেন’ বলেই বের হয়ে যায় শিরিন।

আমাকে কিছু বলার সুযোগই দিলো না – আশ্চর্য মেয়ে! এইমাত্র পরিচয় অথচ মনে হচ্ছে কতদিন ধরে চিনি! খানিকটা পায়চারি করে কাঠের শিকের জানালা দিয়ে উঁকি দিলাম। দিনের আলো নিভে এসেছে –সূর্য ডুবছে। না, ভুল হলো। আকাশে মেঘ করেছে – কালবৈশাখী সম্ভবত। তখনি মেঘের গুড়গুড়ানি শুনতে পেলাম।

শিরিনের ছুটাছুটির কোনো কমতি নেই তাতে। আঁচলটা কোমরে গুঁজে ইয়া বড় একটা মাছ নিয়ে উঠানের একপাশে কাটতে বসেছে। ফর্সা মুখে পাশের চুলার আগুনের আঁচ লেগে আছে। কানের গোঁড়া থেকে হালকা কোঁকড়ান কিছু অবাধ্য চুল গালে এসে পড়েছে। প্রতিটা নড়াচড়া, কমনীয় ভঙ্গি আমাকে নিষিদ্ধ এক সুখে পাগল করে দিতে থাকে। আমার এই দীর্ঘ ব্যাচেলর জীবনে এই প্রথম সত্যি সত্যি কাউকে বড় একান্তে পেতে ইচ্ছে করে বসে!

জানালা দিয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকি। সময় যেন থেমে থাকে অসম্ভব একটা প্রাপ্তির মিথ্যা হাতছানিতে। একে না পেলে আমার বাকী জীবনটা বৃথাই হয়ে যাবে। কিন্তু এ যে অন্যায়! আমার কামনার অন্ধ পশুটি অবশেষে বিবেকের কাছে একটা চাবুক খায়। কাছে কোথাও কড়াত শব্দে একটা বাজ পড়ে। আমার আবার মনে পড়ে যায় সেই বিশ বছর আগের কাহিনি।

মমিন ভাই আমাদের বাড়িতে জায়গীর থেকে আমাকে পড়াতেন। ভীষণ স্নেহ করতেন। আমার নানান দুষ্টামির কারণে বাবার গাধা পেটানোর রাগটা প্রায় সময় মমিন ভাইই পিঠ পেতে নিতেন। সবসময় বলতেনঃ চাচা, ছেলেমানুষ – কী বুঝে? মাফ করে দেন। এই আশকারাতে কিনা আমি প্রায় উচ্ছন্নে চলে গেলাম। আজেবাজে বখাটেদের সাথে ভাব হয়ে গেলো বেশ। ওদেরই প্ররোচনায় একদিন দাদুর টাকা মেরে শহরে কিছুদিন ফুর্তি করার একটা আইডিয়া মাথায় আসে। বোকা আমি; ঠিক-বেঠিকের কোনো জ্ঞান ছিলো না। দাদুর যক্ষের ধন অনেকগুলো টাকা খাট-কাম-সিন্দুক হতে মেরে দিয়ে রাতের আঁধারে পালাতে গিয়েছিলাম। কিন্তু গুবলেট করে ফেলি। পালাতে গিয়ে প্রায় ধরা পড়তে গেলে মমিন ভাইকে সামনে পেয়ে যাই। আহ, সেদিনের কথা এখনও ভালো মনে আছে। বেগতিক দেখে গোবেচারা মমিন ভাইকে সব টাকা দিয়ে দ্রুত কেটে পড়ি। মমিন ভাই, আহ বেচারা টাকাগুলো নিয়ে আমার বাঘ বাপের হাতে ধরা পড়ে যায়।

তারপরের ঘটনা মনে করতে চাই না। যে অপমান, হেনস্থা, মারপিট গেলো…মমিন ভাই কিচ্ছু বললেন না। শুধু বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন সবাইকে। কিন্তু কেউ কথা শোনেনি। গরিবের মূল্যই নাই কোনো! শেষে অবশ্য থানা-হাজত হয় না। দাদু মারপিটেই সীমাবদ্ধ রাখতে চান ব্যাপারটা। দড়ি দিয়ে সারারাত বেঁধে রাখা হলো তাকে। সেইরাত আমি ঘুমাতে পারিনি – সারারাত বাচ্চাছেলের মত কাঁদলাম। প্রতিজ্ঞা করলামঃ ভালো হয়ে যাবো। আমার জন্য মমিন ভাইয়ের এই ত্যাগকে সম্মান জানাবো।
শেষরাতে চুপি চুপি দড়ির বাঁধন খুলে দিয়ে তার পা ধরে মাফ চাইলাম। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে রক্তাক্ত ঠোঁটে কষ্টে একটা হাসি দিয়ে বললেন, ‘মানুষ হ! তোর প্রতি আমার কোনো রাগ নাই রে!’

পরদিন তাকে আর খুঁজে পাওয়া গেলো না। সে নিরুদ্দেশ হয়েছে চুরির অভিযোগ মাথায় নিয়ে, দুঃখে, অভিমানে।

সেই মমিন ভাইয়ের স্ত্রীকে নিয়ে কীভাবে সে এরকম ভাবতে পারলাম? নিজের প্রতি একটা ঘেন্না চলে আসে। জানালায় কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম, জানি না। হঠাত সম্বিৎ ফিরে আসে একটা চিকন মধুর কণ্ঠে,
‘এভাবে ভূতের মত দাঁড়ায় আছেন কেন? ঝড় হচ্ছে তো, ভিজে যাচ্ছেন। সরে দাঁড়ান। জানালা বন্ধ করবো’ বলেই মেয়েটা এগিয়ে আসে। ওর ঘাড়ের কাছটা অসাবধানে লেগে যায় আমার বুকে। অল্প একটু ছোঁয়া কিন্তু মনে হলো হাজার ভোল্টের একটা শক খেলাম। অতি সাবধানী হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করলাম,
‘স্যরি’
‘কেন?’ শিরিনের মুখে একটা অদ্ভুত কৌতুক হ্যারিকেনের আলোতে খেলা করছে। আমি কী বলবো, খুঁজে না পেয়ে আমতা আমতা করতে লাগলাম। শিরিনের হাসিটা আরো বিস্তৃত হলো। যেন আমার ভেতরের লোভিটাকে ঠিক চিনে নিয়েছে! কী বিপদে পড়া গেলো? কী চায় কী এই মেয়ে? সর্বনাশ না করে দেখি ছাড়বে না!
‘আসেন, খেতে আসেন। রান্না করেছি’
‘মমিন ভাইয়ের জন্য একটু অপেক্ষা করি?’
‘বললাম না, ওনার আসতে দেরী হবে। তাছাড়া এই ঝড়বাদল…মনেহয় আপনিও যেতে পারবেন না’ দাঁতে ঠোঁট চেপে একটা মাদক হাসি হাসতে থাকে।
‘না, না। সেটা ঠিক হবে না। লোকে কী বলবে? গ্রামদেশ এটা… আমি ঠিকই চলে যেতে পারবো’ আমি একটু জোরের সাথেই বলে ফেলি – কিছুটা উচ্চস্বরে।
‘আরে বাবা, ঠিক আছে। কে আটকাচ্ছে আপনাকে? চলেন, চলেন…খাবার ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে’ আবারও মৃদু হাসি লেগেই থাকে।

এলাহি আয়োজন। হ্যারিকেনের হলদেটে আলোয় খেতে বসেছি। বাইরে ঝড় হলেও একটা বিকট গুমোট ঘরটায়। শিরিন পাখা করছে। সেই রাগি বুড়িকে আবার দেখতে পাওয়া গেলো। কী একটা নামিয়ে রেখে আমার দিকে কটমট করে তাকাতে তাকাতে চলে গেলো। কী, সমস্যা কী এই বুড়ির? মনে মনে ভাবতে লাগলাম। খেতে খেতেই জিজ্ঞেস করলামঃ

‘কিছু মনে করবেন না, আপনাদের দেখা হয়েছিলো কীভাবে?’
‘মানে বলতে চাচ্ছেন ঐ বুড়া জুটলো কীভাবে আমার ভাগ্যে? এই তো?’
‘আরে সেটা কখন বললাম! আপনি তো আচ্ছা পেঁচুক…’
‘হ্যাঁ, ঐটাই ভেবেছেন, কেন খামোখা সাধু সাজছেন? তবে, শোনেনঃ কন্যাদায়গ্রস্থ এক বাবাকে উনি বাঁচিয়েছেন। মমিনের মত মহত লোক কমই আছে এই দুনিয়ায়!’
‘ওটা আমার থেকে কেউ ভালো জানে না’ আমি বলে উঠি।
‘তাই নাকি? আপনারও কাহিনি আছে নাকি? বলেন দেখি, শুনি’
‘আছে, তবে বলবো আর একদিন। আজ নয়’

আমার খাওয়া শেষ হয়ে যায়। এমন পেট ভরে বাড়ীতেও খেয়েছি কিনা, সন্দেহ! মাটির ঐ ঘরে শুধু আমি আর সে। অনেকক্ষণ কোনো কথা হয় না। এক ধরণের অস্থিরতা পায়চারি করতে থাকে। আমার ভিতরের আমিটা ঠিকই জানি এ অস্থিরতার উৎস কোথায়? কিন্তু স্বীকার করতে অনিচ্ছুক! এবার আমি অস্বস্তিটা ভাঙ্গতে চাই। খুচরা কথা পেতে বসি।

‘আপনাকে কিন্তু গ্রামের মেয়ে মনে হয় না একদম। অথচ ভালোই কাজ করলেন। ঝটপট মাছ কেটে লাকড়ির চুলায় রান্না করে ফেললেন?’
‘আমি শহরে মানুষ। এখানে সব শিখে নিয়েছি। আচ্ছা এসব দেখলেন কখন? কেমন ঝিম মেরে জানালায় দাঁড়ায় ছিলেন!’
‘দেখেছি তো, সব দেখেছি – যাকে দেখার, প্রাণভরে দেখেছি’ বলেই একটা সূক্ষ অপরাধ বোধ করতে থাকি।

খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে শিরিন।

‘আপনি কিন্তু বেশ দুষ্টু আছেন… বন্ধুর স্ত্রীকে এভাবে দেখাতো ঠিক নয়!’
‘বোঝেন তাহলে? বুঝলে আমার পাও…না…টা?’ শিরিন আমাকে কথাটা শেষ করতে দেয় না। ঝট করে জিজ্ঞেস করে,
‘আপনি বিয়ে করেছেন?’
‘না’
‘কেন?’

আমার মাথা এলোমেলো হয়ে যায়। শ্বাস দ্রুতলয়ে চলতে থাকে। চিৎকার করে উঠিঃ

‘তোমার মত কাউকে পাইনি বলে। খুশী? কেমন এমন করছো? কেন আমাকে নিয়ে খেলছো? প্লিস, এই অন্যায় আমাকে দিয়ে করিও না। মমিন ভাইয়ের কাছে আমি আজীবন ঋণী। তার বিশ্বাস ভঙ্গ করতে পারবো না!’

হঠাত একটা দমকা হাওয়ায় হ্যারিকেনটা নিভে যায়। নিশ্ছিদ্র আঁধার। কে কোথায় আছে, কিছুই দেখতে পাওয়া যায় না। পাপি মন কিছু একটা চাপা আশায় উন্মুখ হয়ে থাকে। মন থেকে আপ্রাণ ঝেড়ে ফেলতে চেষ্টা করি সবকিছু… কিন্তু আমার প্রতিরোধ সব গুড়িয়ে যায়… উষ্ণ একটা অপ্রতিরোধ্য আবেগ অধরের দুর্বিনীত স্বেচ্ছাচারীতায় গলে যেতে থাকে। স্থান-কাল-পাত্র সবকিছু আবার সেই সর্বনাশি আকাঙ্ক্ষার গর্ভে হারিয়ে যেতে থাকে। আমি সাহসী হয়ে উঠতে থাকি – দুঃসাহসি, অদূরদর্শি। কামনার উদ্বেল উপত্যকায় অসহায় বন্দী! চষে বেড়াতে থাকি দেহজ আনন্দের খনি।

তবে, আমি নিশ্চয় একটু হলেও ঔচিত্যবোধ ধরে রাখতে পেরেছিলাম। পতনের দ্বারপ্রান্তে ফিরে দেখি বিবেকের মিটমিটে আলো। প্রাণপণে ঐ আলোটুকু ধরতে ধরতে ফিরে আসি কঠিন বাস্তবে। নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ছুটে বেরিয়ে যাই।  যাবার আগে কী মনে করে পিছু ফিরে তাকিয়ে ফেলি। শিরিন দুয়ারে দাঁড়িয়ে…আলুথালু বেশ… বিদ্যুৎচমকের আলোয় যে মুখখানি দেখলাম, তাতে অনেকগুলো আবেগ একইসাথে আঁকিবুঁকি কেটেই চলেছে। কী নাই সেই মুখে? আহত অভিমান, বঞ্চনা, ক্ষুধা, ক্রোধ…সর্বোপরি…ভালোবাসা? ভালোবাসা! নাহ, এ সত্যি নয়। এ কখনো হওয়ার নয়!

ঝড় মাথায় নিয়ে আমি পথ পাড়ি দিতে থাকলাম। বাড়ি ফিরে যাওয়া দরকার।

চারদিন পরের ঘটনা।

ভাঙ্গামোড় বাজারে আবার মমিন ভাইয়ের সাথে দেখা। আমি একটু সামলে উঠেছি। তবুও মমিন ভাইকে দেখে অপরাধবোধটা চিনচিন করে উঠলো।
‘কী রে, এত করে ডাকলাম, গেলিই তো না!’
‘মানে?’
‘শুক্রবারে ডাকলাম… আসলি না তো! চল, এখুনি চল। বেড়াতে আসছিস, ভালো করে বেড়া’

আমার কোনো আপত্তি ধোপে টিকলো না! তাছাড়া কোনো এক অজানা কারণে বলতে পারলাম না যে চারদিন আগেই গেছি তোমাদের বাড়ি। শিরিন তাহলে কিছুই জানায় নি! যাক তবে, ভালোই হয়েছে। যা ঘটে ভালোর জন্যই ঘটে!

পথে যেতে যেতে নানান কথা হতে থাকে। কিন্তু সেদিকে আমার মন একেবারে নাই। খালি হ্যাঁ, হুঁ করে যাচ্ছি। মনে মনে একটা অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছে। শিরিনের সাথে আবার দেখা হবে…অবচেতন এই আনন্দ কোনোভাবেই চেপে রাখতে পারছে না! কোনো মানে হয়? থেকে থেকে বুকের রক্ত ছলাত করে উঠছে। এরই নাম কি প্রেম? দুনিয়াতে এত মেয়ে থাকতে শেষে কিনা মমিন ভাইয়ের বউই পেলাম? মনে যুগপৎ আনন্দ আর বিষাদ নিয়ে পৌঁছে যাই অবশেষে।

মাটির আধাপাকা সেই ঠাণ্ডা ঘরটিতে আবার বসে আছি। সারপ্রাইজ দিবেন বলে ভিতরে গেছেন মমিন। আমি মনে মনে হাসছি – তোমার সারপ্রাইজ তো জানি।

খানিক বাদে পর্দা উঠিয়ে মমিনুর রহমান ঢুকলেন। পিছনে পিছনে একটা আড়ষ্ঠ মেয়ে গুটি গুটি পায়ে আসছে। আমিও অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছি।

‘সদু, এবার ফেরার সময় একটা কাজ করে ফেলছি। হাসিস না ভাই। আমি একটা বিয়ে করে ফেলেছি। বিশ্বাস কর, এই বয়সে… কিন্তু ওরা এত করে ধরলো…ফেলতে পারলাম না… এই শিরিন, সামনে আসো তো। এ তোমার ভাইয়ের মত – লজ্জা কিসের?’

ভাইয়ের মত আমি? শিরিনের কাছে আমি ভাইয়ের মত? অজান্তে একটা হাসি চলে এলো মুখে। মেয়েটি সামনে এলো।

কিন্তু এ কী? এ তো শিরিন নয়! এ অন্য মেয়ে। মাথায় এখন একটা বাজ পড়লেও এত অবাক হতাম না! আমার হাসিটা অকস্মাত মিলিয়ে গেলো। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে থাকলাম। বিষম ভাবনায় পড়ে গেলাম। মাথাটা কি দুলে উঠলো? এ কথা কাকে বলি? তবে, আমি কাকে দেখলাম এই চারদিন আগে? একটু ভয় ভয় করতে লাগলো। অবশেষে মেয়েটি মুখ খুললোঃ

‘আপনি নিশ্চয়ই সাদমান ভাই? আমি শিরিন’

সেই একই কিন্নর কণ্ঠ! তবে, চেহারাটা একেবারেই ভিন্ন। এ শিরিন আমার সেই শিরিন নয়… আমার সবকিছু গুলিয়ে যেতে লাগলো! এ আমি কাকে দেখেছিলাম ঐ ঝড়জলের রাত্রে?

জগতে কত অদ্ভুত ঘটনাই ঘটে! আমি আজও সেই ঘটনা ভুলতে পারি নাই। আমি এখনও অবিবাহিতই আছি। এখনও কোনো কোনো ঘোরলাগা আঁধারে সেই অধরার তপ্ত অধর ছুঁয়ে ফেলি। তাকে পাবার জন্য অবুঝ মন গুমরে গুমরে কেঁদে ওঠে। আমি যে সত্যিই প্রথম দেখায় শিরিনকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম!

☼সমাপ্ত☼

অভিমান

ঘড়িতে এগারোটা বেজে পঁচিশ মিনিট।

লীনার উদ্বেগ বাড়তেই থাকে। ছেলেমানুষি উদ্বেগ। কিন্তু অস্বীকারের উপায়ও নেই! আরমান বিছানায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আজকে যেন একটু বেশিই আগে ঘুমাতে গেছে। ও নিশ্চয়ই ভুলে গেছে। চোখ ফেটে কান্না আসে লীনার।

চার রুমের ছিমছাম গোছানো ফ্লাটটিতে বড্ড নিঃসঙ্গ বোধ করতে থাকে লীনা। বাইরের বিনিদ্র ট্রাফিকের একটানা চাপা শব্দ ছাড়া আর কোনো সাড়া নেই। পায়ে পায়ে বারান্দায় এসে পৌঁছায়। চমৎকার জ্যোৎস্না ফুটেছে আজ। অন্ধকার বারান্দায় চাঁদের রুপালি আলো গলে গলে পড়ছে। মায়াময় সেই আলোতে কেন জানি আরো বিষন্ন হয়ে যায় লীনা।

বেতের চেয়ারে এলিয়ে পড়ে লীনা। বড় ক্লান্ত বোধ করে। এই ক্লান্তিটা দেহের নাকি মনের – ঠিক ঠাহর হয় না। সারাদিন অফিস করে ক্লান্ত হয়ে পড়াই স্বাভাবিক। কিন্তু সে তো রোজই করে এবং এক ধরণের অভ্যাসও হয়ে গেছে। তবে কি মনে ক্লান্তি?

লীনার বুকে অভিমানের ঝড় উঠতে থাকে। গলায় কী একটা দলার মত আটকে থাকে। গতবার আরমান কিন্তু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো কোনোভাবেই ভুলে যাবে না। আর এমন একটা দিন মানুষ ভোলে কীভাবে? পাঁচটা বছর কি যথেষ্ট নয় একটা বিশেষ দিন মনে রাখবার জন্য?

লীনার এখনো ভালো মনে আছে সেই দিনটির কথা। বাবা কোত্থেকে একটা সরল চেহারার ছেলের সন্ধান এনে হাজির করলেন। লীনার মতই ভালো চাকুরে। লীনার ক্ষনস্থায়ি সব প্রেমই তখন অতীত। না না করেও এবং প্রথমে দেখে গোপনে নাক কুঁচকালেও কেন জানি রাজী হয়ে যায়! চেহারা খানিকটা বোকাটে হলেও চোখগুলো অদ্ভুতভাবে উজ্জ্বল! আর কেমন মায়া মায়া…যেন ডেকে বলছেঃ ‘আমার কেউ নেই, একটু জায়গা দেবে?’

তো জায়গার বন্দোবস্ত খুব শীঘ্রই হয়ে গেলো। তারিখটা ফেব্রুয়ারির একটা বিশেষ দিনে! বন্ধুবান্ধবেরা পঁচিয়ে মারল। তাদের দৃঢ় ধারণা – আগে থেকেই এই পরিচয় – ডুবে ডুবে গভীর দরিয়ার জল পান করেছে ওরা। ওদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। লীনার ব্যাপারটাই যে ওরকম – বড্ড চাপা স্বভাবের।

বিয়ের রাতেই বুঝলো বোকাটে চেহারার ছেলেটি বোকা তো নয়ই, বরং পাজীর চূড়ান্ত! সেদিনও এমন চাঁদনি ছিলো। ছাদের আলাদা করে বানানো দু’টো ঘরে ওদের থাকতে দেয়া হয়েছিলো। তারপর এমন কিছু ঘটেছিলো… সেই মধু মেশানো পাগলামির ক্ষণগুলো স্মরণ করে লীনার এই এখনকার কান্নাভেজা গালও লাল হয়ে উঠলো! অজান্তে বলে উঠলোঃ ‘পাজী কোথাকার!’

আরমানকে ঠিক বুঝে উঠে না লীনা। মাঝে মাঝে মনে হয় এর থেকে অসাধারণ আর কাউকে সে খুঁজে পেত না। আবার কখনো মনে হয় সে কি ভুল করেছে? সব থেকে বিরক্তিকর হলো আরমানের ভুলোমন। তারিখ আর উপলক্ষ্য সে কিছুতেই মনে রাখতে পারে না। প্রথম প্রথম এসব সহ্য হলেও কয়েকটা বছর পর এসব অসহ্য লাগতে থাকে! সব কিছুই তো পরিবর্তন হয়। তবে, এটা কেন বদলাবে না? বিয়ের তারিখ ভুলে যাওয়াটা কি অন্যায় নয়?

তবে কি অন্য কারণ আছে? হয়তো ওর জীবনে অন্য কেউ ছিলো – বিশেষ কেউ যার কথা সে বেমালুম চেপে গেছে। বাস্তবে এমন অনেক কিছুই করতে হয়, যেটা একেবারেই বুকের গভীরের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন করে না! সেরকম কিছু কি তবে? এই জন্যই এত উদাসীনতা? বুকটা আরো বাষ্পোরুদ্ধ হয়ে যায়।

গেল বার এ নিয়ে বিরাট হাঙ্গামা করেছে লীনা। তুমুল ঝগড়া করে আশেপাশের ক’টা শো-পিস ভেঙ্গে বাসা মাথায় তুলেছে। আরমানের প্রায় নতুন ফতুয়াটা এখনও সেই ঝঞ্ঝার সাক্ষ্য বয়ে চলেছে। তবে জয় বরাবরের মত লীনারই হয়েছিলো। আরমান প্রতিবারই নিঃশর্ত আত্মসমর্পন করেছে। না করে উপায় আছে? নাকে খঁত দিয়ে বলতে হয়েছিলো আগামিবার মনে রাখবেই রাখবে। সেই মুহুর্তে সেই মায়া মায়া চাহনি দেখে পিত্তি জ্বলে গেছিলো লীনার! তবে, ভালোও কি লাগে নি? লোকটা কি জাদু জানে নাকি?

তবে, এই ক্ষণে লীনার চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে আসে – মিথ্যুক কোথাকার! কেমন মরার মত ঘুমাচ্ছে! এবারেও সব ভুলে খেয়ে আছে… উফফ, এ সহ্য করার নয়…

মনে রাখতে চাইলেই মনে রাখা যায়। একটা মোবাইল কোম্পানির এড আছে না… ভুলোমন সঙ্গীটিকে জানিয়ে দেবে বিশেষ বিশেষ দিনের কথা। সেরকম যদি করত! কিংবা ডায়রির পাতায়, ক্যালেণ্ডারে? হ্যাঁ, অনেক উপায় আছে…শুধু ওরই কোনো মাথাব্যথা নাই!

সুন্দর করে সেজেছিলো লীনা। বেশি কিছু করতে হয় নি। সে এমনিতেই সুন্দর। একটা ময়ূরকন্ঠী নীল শাড়ি যে অনন্য যৌবনবতী কবিতা আওড়ে যাচ্ছে, অসামান্য তার আবেদন! আফসোস, যার জন্য এ আয়োজন তাঁরই কোনো বিকার নেই! চোখের কাজল ভারী অশ্রুধারায় গড়াতে থাকে…এই অভিমানের মূল্য কে দেয়?

লীনা উঠে পড়ে। আর কতক্ষণ বসে থাকবে? অনেক রাত হয়েছে নিশ্চয়ই। হ্যাপি নিঃসঙ্গ ভ্যালেন্টাইন এণ্ড আ মিজরেবল এনিভারস্যরি! টলতে টলতে এগুতে থাকে।

হঠাত একটা প্রবল আকর্ষন অনুভব করে লীনা। একজোড়া সবল হাত লীনার সরু কোমরে জগদ্দলের মত চেপে যায়। লীনার পাখি দেহটা একটা ভালুকের ডেরায় অস্বীকারি এক আনন্দে মোচড়াতে থাকে। মায়া চোখের ভালুকটা লীনারই কেনা একটা পাঞ্জাবি গায়ে চাপিয়ে আছে। তাঁর সাহস দ্রুত বাড়ছে! সে লীনার অভিমানী চোখের জলটুকু শুষে নেয় হাজার রাতের পিয়াসী চাতকের মত। আর তারপর? অশ্রুধারা যে ভরাট ঠোঁটের সঙ্গমে মিশছিলো, বাড়ন্ত সাহসটুকু সেখানে গিয়ে তার নির্লজ্জতা সগৌরবে ঘোষণা করতে থাকে। পাখিটির কোনো আপত্তি ধোপে টেকে না! অবশ্য সে আপত্তির শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছিলো।

ঘুমাও নি তাহলে? মনে রেখেছো? শয়তান কোথাকার!

অ, তাহলে ঘুমাই গিয়ে আবার? কী ভাবো বলতো? লুকিয়ে লুকিয়ে বাচ্চা মেয়েদের মত কাঁদছিলে? পাগলী কোথাকার! ভালোবাসি কি বলতে হবে? বোঝো না? হ্যাপি এনিভারস্যরি! আর ইয়ে…ঐ যে কী যেন বলে…ধুত তেরি… ভালোবাসাবাসি দিবস… এসো ভালোবাসি… এখন আমার পাওনাটা মিটিয়ে দাও তো!

কীসের পাওনা? বলেই এক ছিটকে বেরিয়ে যায় লীনা – ছুটতে থাকে। পেছনে ভালুকটা ক্ষেপে ওঠে। সারা ফ্লাটে সে দাপিয়ে বেড়ায়…লীনার চাপা হাসি তাকে আরো মরিয়া করে তোলে… অসাধারণ একটা দৃশ্য!

নিচের বাড়িওয়ালা দম্পতি প্রবল শব্দে ঘুম ভেঙ্গে রাগতে গিয়েও হেসে ফেলে!

 

প্রথম প্রকাশঃ প্রজন্ম ফোরাম (ফেব্রুয়ারি ২০১৩)

অণুগল্পঃ একটি ফাঁদ এবং মধুর বিড়ম্বনা

ভারী পর্দার ফাঁক গলে সরু নলের মত একটা আলো এসে যাঈদের চোখে-মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বিগত রজনীর সুখাবেশ তখনও যাঈদের কপালে আনমনে এক্কাদোক্কা খেলছিলো। সেখানে এ কী বিড়ম্বনা! বিরক্তির ঢেউ শতভাঁজে কুঞ্চিত চামড়ায় আলোড়ন তুলছে। কিন্তু চোখ যে খুলছে না। না খুলুক। কী আসে যায় তাতে? উপুড় হয়ে বালিশে মুখ গুঁজে কী একটা মনে করে হালকা হাসির রেখাগুলি ঠোঁটের কোণে আকুলি-বিকুলি করে উঠে। ডানহাতটা অভ্যেস মত বাড়িয়ে দিয়েই কাকে যেন জাপটে ধরতে চাইলো। কিন্তু কেউ নেই –  শূন্য জায়গাটাতে একটা মেয়েলি সুগন্ধ! নাক টেনে শ্বাস নিতে নিতে ঘুম-জড়ানো গলায়, ‘বীথি, এই বীথি। বীথি ডা-র-লি-ন’, কোথায় গেলে?’

বীথি নিত্য দিনের মত সদ্য গোসল সেরে চুলায় পানি চাপিয়েছে। যাঈদের বেড-টিটা না হলে চলেই না। শনশন শব্দে পানি ফুটছে। রোজ রোজ বাসিমুখে ঐ জিনিস গিলে কী যে সুখ, সেটা বীথির মাথায় ঢুকে না। কিন্তু আজ একটা দুষ্টবুদ্ধি খেলে গেলো। কাল রাতে বড্ড জ্বালিয়েছে! সেটা মনে করাতে ঈষৎ রাঙা হয়ে গেলেও যাঈদকে জব্দ করার একটা রাস্তা খুঁজতে থাকে। যত্ন সহকারে চিনি বিহীন লিকারে ইচ্ছেমতো লাল মরিচ আর এক চিমটি হলুদ মিশিয়ে দিলো। একটু চেখে দেখতে জিহ্বা ছোয়াতেই – ও বাবা, ব্রহ্মতালু জ্বলে উঠলো যেন! তবে মনে মনে বেশ একটা তৃপ্তির ভাব জাগল – একদম পারফেক্ট হয়েছে! হাসি আর থামতে চাইছে না – উপচে উপচে পড়ছে যেন।

চায়ের গন্ধে অলস ঘুমটা পালিয়ে গেলো। তবে একটু ঝাঁঝাঁলো গন্ধ কি? দূর, কী সব ভাবছে? খপ করে বীথির হাতটা ধরে নিজের দিকে টানতেই বীথি হা হা করে উঠলো! সাধের বেড-টি পড়ে যাবে যে! পড়ে গেলে খাবে কী?

কেন, তোমাকে খাবো। চোখ পাকিয়ে তাকায় যাঈদ।

এহ, অসভ্য কোথাকার! এখন বসে বসে ঐ বিশ্রী জিনিসটা গেলো।

নাহ, বিশ্রী হবে কেন? তোমার হাতের স্পর্শ যেখানে, সেখানে তো খালি মধু আর মধু। হা হা হা।

(…বাছাধন, বুঝবে একটু পরে। মধুই তো…ঝাল মধু…) মনে মনে হাসতে থাকে বীথি।

কিন্তু অবাক কাণ্ড ঘটছে। প্রায় উদাসীন ভঙ্গীতে চায়ে চুমুক দিয়ে চলেছে যাঈদ। অবাক হয়ে গেলো বীথি। ভুল দেখছে না তো! এত ঝাল লোকটা নিচ্ছে কী করে? গুনে গুনে তিন চামচ শুকনা মরিচের গুড়া দিয়েছে… এই ফলাফল তো কাঙ্খিত না! হঠাত অন্যমনস্ক হওয়াতে খেয়ালই করে নি কখন যাঈদ হাত বাড়িয়ে টান দিয়েছে।

হুড়মুড় করে পড়ে গিয়ে বীথির আশ্রয় ঘটলো যাঈদের বুকে। বীথির ভেজা চুলে শ্যাম্পুর চনমনে গন্ধ! ক’টা চুল যাঈদের মুখে গিয়েও পড়ে। চাঞ্চল্যকর ঘটনা বটে! তবে, যাঈদ কিন্তু অন্য কাজে ব্যস্ত – চায়ের কাপটা হতে লাল আস্তরণটা তুলে নিয়ে আয়েসে মাখাতে থাকে নিজের ঠোঁটে। তারপর সারপ্রাইজ এন্ড এটাক – এই কৌশলে শত্রুপক্ষ বধ করতে নেমে যায়। হাতিয়ার – একজোড়া আবেগী দস্যু!

আক্রমণ শেষে শত্রুর লম্ফ-ঝম্ফ শুরু হয়ে গেলো। সারা ঘরময় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বীথি। মুখে যা আসছে তাই বলে চলেছে। টার্গেট – যাঈদ। নিজের ঝাল মধুতে বীথি নিজেই কুপোকাত হয়ে গেলো। অনবরত পানি ঝরছে।

শরবতটা এক চুমুকে শেষ করে তখনও হাফাচ্ছে বীথি। ঝাল এখনও কাটে নাই। পাশে যাঈদ মিটিমিটি হাসছে।

ব্যাডবয়কে বেড-টি না দিয়ে ব্যাড-টি দিতে গেছো! এখন তো ব্যাড-স্কয়ারড হয়ে গেছি। চাপা হাসি হাসতে থাকে যাঈদ। এবার  আর তোমার নিস্তার নাই! এই এলাম বলে…

এই খবর্দার! দূরে থাকো বলছি!

ব্যাডবয়রা কাছে কাছে থাকে আর গুডিরা দূরে দূরে ……

শয়তান, বিচ্ছু!

আত্মসমর্পনের প্রাক্কালে শুধু এই দু’টি শব্দই বের করতে পেরেছিলো বীথি। বাকী সময়ের শব্দগুলি গাঢ়তর আবেগে দ্বৈতকন্ঠের গান হয়ে গেছিলো।

কী, বিশ্বাস হলো না? তাহলে আপনি নিশ্চিত একটা শতভাগ ‘কেঠো’। হা হা হা।

 

সমাপ্ত

প্রথম প্রকাশঃ প্রজন্ম ফোরাম

 

একবার বনভোজনে…

১.

আরে ভাই, একটু জোরে চালান না!
আর কত জোরে চালামু, আপা? আমি তো পঙ্খিরাজের ড্রাইভার না।
সে আমি কী জানি। বেশি কথা না বলে একটু তাড়াতাড়ি করেন না!

উদ্বিগ্ন মুখে দীপিন্তি ঘড়িটা দেখে। ইস, বড় দেরী হয়ে গেলো! ৯ টায় ছাড়বে বলেছিলো। এখন ন’টা বেজে ৩৬ মিনিট। পিকনিকের বাসটা কি ওকে ছেড়ে চলেই গেলো নাকি! কত আশা করে কত কী করবে ভেবেছিলো, সব ভেস্তে যেতে বসেছে! বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে থাকে ওর মসৃণ কপালে, চিবুকে। বুকটা হাপরের মত ওঠানামা করতে থাকে।

সবই ঠিক ছিলো। ঘড়িতে এলার্মও দেয়া ছিলো। সকাল ৬টায় উঠে তৈরি হবে। কিন্তু সকালে সে কিছুতেই উঠতে পারে না। এলার্ম শুনেও ঘুমের ঘোরে টেবল ঘড়িটার টুটি চেপে ধরেছিলো। ফলাফলঃ ৮ টায় উঠে দৌঁড়-ঝাঁপ। কিন্তু শেষ রক্ষা হবে কিনা, কে জানে?
এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে রিক্সাটা ডিপার্টমেন্টের ফটক ধরে গলতে থাকে। ভয়ে ভয়ে ইতি-উতি একটা বাস খুঁজতে থাকে। বাসের মুখে একটা ব্যানার ঝুলবে। ও নিজেই লিখেছে। কত কাজ করেছে এই পিকনিকের জন্য। অথচ তারই যাওয়াটা ভণ্ডুল হয়ে যায় নাকি? মোবাইলটাও এই সময়ে চার্জ খুইয়ে বসে আছে। জয়িতা দিদিকে শুধু বলতে পেরেছিলো ওকে ছেড়ে যেন না যায়…অপেক্ষা করে। সে কি সবাইকে এতক্ষণ ধরে রাখতে পারবে?

ভাড়াটা মিটিয়ে এদিক-ওদিক খুঁজেও কোনো বাস দেখতে পেলো না। দুঃখে কান্না আসি আসি করছে। নিজের নির্বুদ্ধিতার জন্য হাত কামড়াতে ইচ্ছে হচ্ছে। কী করবে ভেবে পাচ্ছে না। কাউকে কি জিজ্ঞেস করবে? এমন সময় মেইন বিল্ডিং-এর পেছন থেকে কারা যেন হেঁকে উঠলো, ‘এই যে লেইট লতিফা বেগম, এই দিকে আয়…কানা নাকি? চোখে দেখিস না!’

দীপিন্তির বুকে রক্ত ছলকে উঠে। বকা খেয়েও হাসতে হাসতে দৌঁড়াতে থাকে। তাহলে ওরা ওকে ছেড়ে যায় নি!

বাসের দরজায় জয়িতা দাঁড়ানো। দুই ইয়ার সিনিয়ার। অগ্নিশর্মা মূর্তি!
তোকে ধরে চাবকানো উচিৎ! কী করছিলি এতক্ষণ? বাস কি তোর জন্য পুরা দিনটা বসে থাকবে? কেলাস কোথাকার!
রাগ করো না, জয়িদি। আমি জানতাম তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না। আমার লক্ষ্মি আপু!
ন্যাকামো রাখ। এখন সীটে বসে আমাকে উদ্ধার কর। ক’বে যে পাংচুয়ালিটি শিখবি!

বসবার জন্য জয়িতা সামনে তাকিয়ে দেখেঃ সবার মুখে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ঝুলছে। কারো মুখে রাগ, কারো মুখে বিরক্তি, কেউ কেউবা বেশ উদ্বিগ্ন। কিন্তু সব ছাড়িয়ে সবার মাঝে একটা সূক্ষ্ণ কৌতুক কি খেলা করছে? ওর ভুলও হতে পারে। কিন্তু কেন?

কারণটা খুব দ্রুতই বুঝতে পারলোঃ বাসে কোনো আসনই আর ফাঁকা নেই! সবাই সবার পছন্দের মানুষের সাথে বসে গেছে। জয়িদির জন্যও অসীমদা অপেক্ষা করছেন। শুধু একটা আসনই বাকী। কিন্তু যার পাশে বসতে হবে, সেটা দেখে রাগে গা জ্বলে গেলো! আজকের দিনটাই কুফা!

জয়িদি, আমি মরে গেলেও ঐটার পাশে বসবো না! চাপাস্বরে দীপিন্তি ফুঁসে ওঠে।
ছিঃ, এভাবে বলে না দীপি! সিন ক্রিয়েট করিস না। এমনিতে অনেক দেরী হয়ে গেছে। নে, বসে পড়তো। মাত্র দু’ঘন্টার পথ। দেখতে দেখতে চলে যাবে। তাছাড়া শৈবালকে যা ভাবিস, ও মোটেও তেমনটা নয়!

এই মুহুর্তে দীপিন্তির সহযাত্রি নিজের নামটা শুনে একটা বেজায় ঘোর থেকে যেন উঠে আসে। কী ভাবছিলো, কে জানে? মাথায় ঝাঁকড়া চুল। পরনে একটা খদ্দেরের পাঞ্জাবি আর ব্লাক জিন্স। চৌকো মুখে একটা তিরিক্ষি রাগ খেলে গেলেও চোখজোড়া কেমন যেন অদ্ভুত স্বপ্নালু! পুরো ডিপার্টমেন্টে দীপিন্তির একমাত্র বিখ্যাত শত্রু – শৈবাল অরিত্র!

আমি বাঘও না, ভাল্লুকও না। আমার পাশে বসলে কারো মান যাবে না। আর যদি যায়ই তো…জয়ি, আয় তুই বস আমার পাশে।
গমগমে কন্ঠে বলে ওঠে শৈবাল।

অ্যাঁ, তাহলে অসীম বসবে কার সাথে? জয়িতা খাবি খায়।
ওদিকে অসীমের মুখ ছাই হয়ে গেলো। নিজের প্রেমিকার সাথে কে-ইবা না যেতে চায়? দীপিন্তি সব দেখেশুনে অগত্যা রাজী হয়ে যায়। গজগজ করতে করতে ধপাস করে বসে পড়ে শৈবালের পাশটিতে।

এখন খুশি তো! যাও গিয়ে বসো। তোমরা সবাই ষড়যন্ত্র করে এই ব্যবস্থা করেছো। বুঝি, আমি সবই বুঝি। আ বাঞ্চ অব ক্রিমিনাল মাইন্ডস!

জয়িতা হাসি হাসি মুখে চলে যায়। রাগে পিত্তি জ্বলে গেলেও কিছুই করার থাকে না দীপিন্তির।

সরে বসেন। এত ঘেঁষে বসেছেন কেন?
কোথায় ঘেঁষে বসলাম? আজব তো! খামোখা বাজে কথা না বললেই কি নয়!
আমি জানালার পাশে বসবো। জানালার পাশে ছাড়া আমি বসতে পারি না।
আমারও জানালার পাশে ছাড়া ভালোলাগে না। শৈবাল ঘোষণার ভঙ্গিতে বলে।
ম্যানারলেস, রুড! কীভাবে মেয়েদের সাথে কথা বলতে হয়, তা-ই জানে না।
জানার দরকারও নেই! ঐ লেসন মরিচমুখি কারো কাছে থেকে আমার শিখতে হবে না।
কী! ঠিক আছে, দরকার নেই আমার জানালার পাশে বসে। আপনিই বসেন। গুম হয়ে থাকে দীপিন্তি।

বাসটা চলতে থাকে। বাইরে চৈত্রের সূর্যটা তার ভেল্কি দেখাতে শুরু করেছে। চড়চড় করে তাপ বাড়ছে। পথের দু’ধারে আম আর কলা গাছের সারি একমনে দেখছিলো শৈবাল। একটা হালকা মিঠে গন্ধ আসছে। কোথায় যেন আমের বোল ফুটেছে। সাথে পাশে বসে থাকা মেয়েটির ব্যবহার করা একটা হালকা পারফিউমের গন্ধ। ঠিক কোনটা যে ওর ভালো লাগছে, সেটি ঠিক ঠাহর করতে পারছে না! হঠাত সে দাঁড়িয়ে পড়ে।

বসো, জানালার পাশে গিয়ে বসো।

অবাক হয়ে গেলেও দীপন্তি সরল মনে জানালার পাশে গিয়ে বসে। রোদ বেশ কড়কড়ে হয়ে উঠেছে। একেকটা আগুনের গোলা যেন দীপিন্তির ফর্সা মুখে আছড়ে আছড়ে পড়তে থাকলো। শৈবালের মুখটা কি একটু হাসি হাসি? যে রাম গরুড়ের ছানা…এর মুখে তো হাসি থাকার কথা না!

চালটা বুঝে যায় দীপিন্তি। গরমে পুড়িয়ে মারার ধান্দা। কিন্তু এখন কিছুতেই সে সেটা স্বীকার করবে না। শত্রুকে আনন্দের উপলক্ষ্য এনে দেবার কোনো ইচ্ছেই আপাতত নেই। কিছুটা সময় সে গ্যাঁট হয়ে বসে বসে পুড়তে থাকে। শেষটায় না পেরে জানালার পর্দাটা ধরে টানাটানি করতে থাকে। পর্দাটাও এমন…ঠিক সময়ে এমন গিট্টু নিয়ে ঝুলছে যে দীপি কিছুতেই কায়দা করে উঠতে পারলো না। ধ্যাত! দিনটাই খারাপ আজকে।

আড়চোখে সবই দেখছিলো শৈবাল। নীল-সাদা একটা চমৎকার শাড়ি পরেছে দীপিন্তি। সেটার আঁচলটা জানালার হাওয়ায় উড়ে এসে শৈবালের চোখে আছড়ে পড়ছে। এবার যেন একটু মায়া হয়ে যায় দাঁড়িয়ে যুঝতে থাকা মেয়েটির জন্য। হাত বাড়িয়ে দীপির নীল রেশমি চুড়ি ছুঁয়ে নামিয়ে আনে আসনে। তারপর জানালার পর্দাটা ঠিক করে দেয়। অপ্রস্তুত হয়ে যায় দীপিন্তি। ভেতরের কোলাহল কি ক্ষণের জন্য থেমে যায়? তারপর একটা চাপা হাসি… সব ষড়যন্ত্র…দীপি দুঃখে চোখ বন্ধ করে ফেলে।

২.

গাড়িটা এখন গন্তব্যের মধ্য পথে। একদফা চা-নাস্তা হয়ে গেছে। কেউ কেউ হেঁড়ে গলায় গান ধরেছে। পিছনে কেউ একজন গীটারে সুর তুলেছে। তুমুল হাসাহাসি চলছে। এক কথায় চমৎকার পরিবেশ। কিন্তু ওদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই শৈবালের। সে একটা নোটবুক বের করে গুটি গুটি কী যেন লিখছে। দীপিন্তি সেদিকে তাকিয়ে সন্তর্পনে একটা ভেংচি কেটে ওঠে। ভাবেঃ যে না বাজে আচার-ব্যবহার, তার আবার কবিতা লেখা!  জানে সে কবি, কিন্তু কখনো তার কবিতা পড়া হয়ে ওঠে নি। বিশেষ করে সেই দিনের পর আর রুচি হয় নি! সেই দিনটা সে ভুলে যেতে চায়।

দেখতে দেখতেই ঘন্টা দুই কেটে গেলো। সবাই হৈ হৈ করতে করতে নেমে পড়ে। অত্যুৎসাহিদের ফটোসেশান দ্বিগুণ গতিতে বেড়ে যায়। জায়গাটা একটা প্রসিদ্ধ পিকনিক স্পট। যে যার কাজে নেমে পড়ে। রান্নার জন্য বাবুর্চি ভাড়া করা হয়েছিলো। ওরা হাঁকডাক করে হাঁড়িকুড়ি নামাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শৈবাল এই কাজটা তদারক করে। কোথায় চুলা পাতা হবে, কী কী রান্না হবে ইত্যাদি ঝামেলা শেষ করে সে ছায়া দেখে একটা গাছের নীচে এসে বসে। ফস করে দেশলাই জ্বালিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে আনমনে ধোঁয়ার কুণ্ডলি পাকিয়ে চলে। দৃষ্টিটা খানিক দূরে ঐ নীল-সাদার উপরে গিয়ে নিবদ্ধ হয়ে রয়েছে।

আচ্ছা, দীপিন্তি ওকে এতটা কষ্ট দেয় কেন? কেন এতটা ঘৃণা করে? সে কি ঘৃণা পাবার মত কেউ? হতে পারে সে একটা ভুল করে ফেলেছে। তাই বলে এমন শত্রু হতে হবে? সেই দিনটা এখনও ভালো মনে আছে।

ফার্স্ট ইয়ারে একটা অসামান্য সুন্দরী মেয়ে এসেছে। সুন্দরীদের আগমনের বার্তা সুপার সনিক বেগে ধায়। শৈবালও না চাইলেও পেয়ে যায়। প্রথম যেদিন দেখেছিলো, বুকের কোথাও যেন একটা অসহ্য ব্যথার গোঙ্গানি শুনতে পেয়েছিলো! পেতে চেয়ে যে অনন্য ব্যথা যুগ যুগ মানুষকে কাঁদিয়ে যায়, সেই ব্যথায় ডুবে গিয়ে শৈবাল অরিত্রের কলম যেন রজস্বলা কুমারির মত অজানা উচ্ছ্বাসে কবিতার ফুল ফুটিয়ে চলল।

শৈবাল অকপট চরিত্রের। চিরদিন ওর যা ভালো লেগেছে, সেটা বলতে কখনোই দ্বিধা করে নি! দীপিন্তির সব থেকে ভালো লেগেছিলো ওর ঠোঁটজোড়া! যখনই দেখা পেতো, কিংবা দূর হতে দেখতো…সে কেবল সেটাই দেখতো। কেমন অদ্ভুত ছন্দে স্পন্দিত হয়! যখন কথা বলে, হাসে, রেগে যায় কিংবা ঠোঁট কামড়ে তন্ময় হয়ে লেকচার শোনে… শৈবাল পাগল হয়ে যায়। ভেতরে ভেতরে একটা উত্তাল কামনা অন্ধ আবেগে উদ্ধত হয়ে উঠতে থাকে।

একদিন সুযোগ বুঝে বলেই ফেলে। সোজাসাপ্টা চাওয়ার কথা। হতচকিত দীপিন্তি সেসবের জন্য তখনও প্রস্তুত ছিলো না। পড়াশোনা ছাড়া মাথায় আর কিছুকেই প্রাধান্য দিতে চায় নি। প্রত্যাখানের আঘাতে বিহ্বল হয়ে পড়ে শৈবাল। শেষে সেই ভুলটা করে ফেলে। ভালোবাসা না পাক, অন্তত সেই ঠোঁট জোড়ার স্পর্শ পেতে চায় সে। হয়তো সেটি নিয়ে কাটিয়ে দিতো যুগ যুগান্তর! কবির সেই আবেগের সরলত্ব সেদিন বুঝতে পারে নি দীপিন্তি। মনের ঘরে জবরদস্তি চলে না। প্রচণ্ড রাগে, ঘৃণায় একটা চড় কষিয়ে দেয় শৈবালের গালে। তারপর তো শুধুই রেষারেষির ইতিহাস! সে কথা মনে পড়তেই মুখটা তেতো হয়ে গেলো।

ভাবনার জাল কেটে গেলেও সেই অপমানের রেশে গালে হাত বুলাতে থাকে শৈবাল। সিগারেটটা কখন নিভে গেছে! চমক ভাঙ্গে যুবিনের ডাকে।
কী রে, এরকম হা মেলে আছিস কেন? খাবার রেডি হয়ে গেছে। আয়, অনেক কাজ বাকী। পরিবেশনটা করতে হবে তো!
হ্যাঁ, কী বললি? ওঃ, চল, চল। স্যরি দোস্ত!

খাবার পরিবেশন করছে জয়িতা আর শৈবাল। সবাই একে একে এসে পছন্দমত খাবার নিয়ে যাচ্ছে। দীপিন্তির নেবার সময় শৈবাল থালাটা অনিচ্ছাকৃতভাবে একটু বেশি সময়ই ধরে রাখে। অনেকদিন বাদে পুরোনো ক্ষতটা কেন যেন পোড়াচ্ছে! সে দীপির চোখে চেয়েই নামিয়ে ফেলে…জয়িতা ব্যাপারটা বুঝে কেমন যেন হাসতে থাকে…

কী রে শৈবাল, থালাটা ছাড়। মেয়েটাকে আর কত আটকে রাখবি?
শৈবাল লজ্জা পেয়ে যায়। কিন্তু দীপিন্তির চোখ রাগে জ্বলতে থাকে – সব জায়গায় অসভ্যতা!

খাওয়া দাওয়া শেষ হয়েছে অনেক আগে। মেয়েরা সবাই একটু ঘুরতে বেরিয়েছে। এ কথা সে কথায় দীপিন্তি সেই প্রসঙ্গে জয়িতাকে ধরে ফেলে।
জয়িদি, এটা কিন্তু তোমার করা একেবারেই ঠিক হয় নাই?
কী ঠিক হয় নাই?
ন্যাকামি করবে না। তখন ঐ শৈবালকে নিয়ে কেন ওরকম করেছো? জবাব দাও।
আরেব্বাহ! তোমরা ডুবে ডুবে জল খাবে, আর আমরা একটু বললেই যত দোষ! আমাদের কি অন্ধ পেয়েছিস নাকি? আমরা কিছুই জানি না, না?
কী জানো?
জানি শৈবাল তোকে কতটা চায়। সে ঐ গরুটার চোখ দেখলেই বোঝা যায় রে! আহাম্মকটা এত স্পষ্টবাদি হয়েও কেন সে কথা এতদিন তোকে বলে নি! কী আশ্চর্য! আর তোদের ঝামেলাটা ঠিক কী, বুঝি না। কেন এরকম দা-কুমড়া সম্পর্ক?
সে বুঝে তোমার কাজ নাই।
তবে তুইও চুপ করে থাক। আমার তো মনে হয়… তুইও…
খবরদার জয়িদি। বাজে কথা বলবে না।
ওরে বাবা! তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলি দেখি! কিন্তু শৈবাল কিন্তু আসলেই তোকে ভালোবাসে…
মানে?

সে কথার জবাব জয়িতা দেয় না। কিছু একটা নিয়ে সে মেয়েদের সাথে নিচুস্বরে কথা বলে যায়। দীপিন্তি অনবরত মাথা নাড়তে থাকে।

এদিকে ছেলেরা তাস খেলছিলো। কেউবা ধোঁয়ার সাথে নিবিড় সখ্যতায় মত্ত ছিলো। মেয়েদের দলটাকে ঐ জংলা দিকটায় যেতে দেখেছে। যাক ঘুরে বেড়াক যেদিকে খুশি। যদিও অসীমের তাতে খুব একটা সায় ছিলো না। জয়িকে নিয়ে আর আদিখ্যেতার সীমা নেই। কিছুটা ওভার প্রটেক্টিভও। যাই হোক, হঠাত একটা চাপা চিতকারে অসীমের পিলে চমকে যায়। এ যে জয়ির কণ্ঠ! অসীম খেলা ফেলে জংগল অভিমুখে দৌঁড় লাগালো। দেখাদেখি সবাই উঠে ছুটে চলল।

মেয়েদের জটলার ভেতরে দীপিন্তি শুয়ে আছে। কেমন একটা নিস্তেজ ভাব। সবাই উদ্বিগ্নমুখে ঝুঁকে দেখছে। জয়িতা বিলাপ করে চলেছে। দীপিন্তিকে নাকি সাপে কেটেছে!!

শৈবাল আর সবার মত উৎসুক হয়ে ঘটনা শুনছিলো। দীপিন্তি শব্দটা কানে যেতেই যেন শরীরটা অবশ হয়ে এলো। জংলা জায়গায় কী না কী সাপে কাটলো! দুর্ভাবনায় পায়ের নীচে মাটি যেন সরে গেলো। কিন্তু ওকে শক্ত হতে হবে। বিলাপের সময় এখন নয়। বাঁচাতে হবে মেয়েটাকে। জায়গাটা চেনা। স্থানীয় হাসপাতাল খুব বেশি দূরে নয়।

ঘোরের মাথায় শৈবালের কাণ্ডজ্ঞান লোপ পায়। সে সবাইকে সরিয়ে দিয়ে একটানে দীপিন্তিকে কোলে তুলে নিয়ে বাসের দিকে ছুটতে থাকে। পিছে পিছে সবাই। শৈবাল যেন অন্য জগতের মানুষ হয়ে গেছে।

বাসে গিয়ে দেখেঃ স্টিয়ারিং –এ অসীম বসে আছে।

অসীম, ড্রাইভারকে ডাক তাড়াতাড়ি। দীপিন্তিকে বাঁচাতে হবে রে!
কেন মামা, আমি চালালে হবে না? আমি চালায় নিয়ে যাই?
শৈবালের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে।
ফাজলামি করিস আমার সাথে। জীবনে গাড়ি চালিয়েছিস কখনো? একটা সাইকেলও তো চালাতে দেখলাম না কোনোদিন!
আরে বলদ, রাগ করিস কেন? শিখায় দে, এখন শিখে চালায় নিয়ে যাবো…
রাগে কাঁপতে থাকে শৈবাল। দীপিন্তি কোলে না থাকলে এই মুহুর্তে যেন ঝাঁপিয়ে পড়তো এইরকম চোখে তাকিয়ে থাকে। ততক্ষণে সবাই জড়ো হয়েছে চারপাশে। দৃশ্য জমে উঠেছে। পিনপতন নিরবতা।

হঠাত খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে দীপিন্তি। অনেকক্ষণ চেপেছিল, আর পারলো না!  তারপর জয়িতা, অসীম এবং একে একে সবাই!
আক্কেল গুড়ুম হয়ে যায় শৈবালের। হঠাত সব পরিষ্কার হয়ে ওঠে। এ সবই অভিনয়। দীপিন্তিরা যে ওদের ডিপার্টমেন্টের নাটকের দলে আছে। সবাই ওকে কীরকম বোকা বানালো? লাজুক বোকা বোকা হাসতে থাকে। আর একটা চাপা রাগও চোয়ালে কিড়মিড় করতে থাকে!

‘এখনও কোলে নিয়ে আছিস দীপিকে? ওরে নামিয়ে রাখ রে!’ জয়িতা সরব হয়।

ধপাস করে একটা শব্দ হয়। দীপিন্তি মাটিতে পড়ে কাতরাতে থাকে। আরো একবার হাসির রোল ওঠে। এবারে দীপিন্তি লজ্জা পেয়ে যায়।

দিনের আলো নিভে আসছে। সবাই গোছগাছ করছে। ফেরার সময় হয়ে এসেছে। শৈবাল গম্ভীর মুখে সিগারেট টানছিলো। হঠাত কাঁধে একটা কোমল হাতের স্পর্শ এসে লাগে। মুখ ঘুরিয়ে দেখে দীপিন্তি এসে দাঁড়িয়েছে।

রাগ করেছেন? আমি আসলে ক্ষমা চাইতে এসেছি।
আমাকে এভাবে বোকা না বানালে কি চলতো না, দীপি?
আমি মানে… জয়িদির চাপে পড়ে…প্লিজ কিছু মনে করবেন না।
কী, বাজী হয়েছিলো ভালোবাসি কিনা? কেন তুমি বোঝো না?

দীপিন্তি কিছু বলে না। চোখ নামিয়ে মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে। শৈবাল পিছু ফিরে দীপিন্তির মুখোমুখি দাঁড়ায়। বেলা শেষের রাঙা আলো পড়েছে দীপিন্তির মুখের একপাশে। একতাল টানটান চুল মৃদু হাওয়ায় উড়ছে। শৈবাল আলতো করে চিবুক ধরে নত মুখ তুলে আনে।

তাকাও আমার দিকে। কেন এত ঘৃণা করো আমাকে? আমি কি এতটাই তুচ্ছ? একটা ভুলের জন্য কেন এত শাস্তি দিচ্ছো?
দীপিন্তি কিছু বলে না। শুধু ওর ভরাট ঠোঁট লুকানো আবেগে তিরতির কাঁপতে থাকে। শৈবাল সেখানটায় আঙ্গুল রেখে নিজের ঠোঁটে ছুঁয়ে ফেলে।

সবাই একে একে বাসে উঠছে। শুধু দীপিন্তি আর শৈবালকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। জয়িতা যথারীতি রাগে গড়গড় করছে – আক্কেল হলো না মানুষের! নো পাংচুয়ালিটি এটঅল!

এ মা! কী বিচ্ছিরি সিগারেটের গন্ধ…ছাড়ো বলছি। জংলি কোথাকার! অবশ্য দীপিন্তির অভিযোগে জংলি কেউ পাত্তা দিলে তো! দিনের আলো নিভে এলেও বনভোজনটা এবার যেন মিলনের রঙ্গে সত্যিকারের রাঙা হয়ে উঠলো!

সমাপ্ত