কী করে বলি!

কী করে বলি
তোমায় কতটা ভালোবাসি!
শব্দের নেই যে অত সাধ্য,
বুঝিয়ে বলে তুমি আমার
কতটা আরাধ্য।
কী করে বলি তোমায় কতটা চাই?
কাটে না দিন, কাটে না নিশি
রিক্ত রোদনে যায় যে ভাসি।
কী করে, কোন্‌ মন্ত্রবলে
এইক্ষণে তোমায় কাছে পাই!
কী করে বলি
তুমি শুধু আমার, আমার!
কাব্যের কী সাধ্য
বলতে পারে তোমায় চেয়ে
দিয়েছি কত শত
ব্যথাতুর নৈবেদ্য!
কী করে বলি
তুমিই ফুল, তুমিই বাহার
নিঃস্ব এ জীবনে তুমিই মম
বেঁচে থাকার নীরব অহংকার!

গভীর-গোপন

থাকুক, কিছু কথা গভীর-গোপন থাকুক
কেউ না জানুক, শুধু সে, সে-ই জানুক!
জনান্তিকে একটু অস্ফুটে হাসুক।
বুকে ওঠে অবুঝ প্রেমের ঝড় – ওঠে তো উঠুক।
বিগত রাত্রির বায়না এবং পাওনা
সে যে সয়না, বুকে সয়না!
দাঁতে কাটুক অধরের মধুর চিতকার
সেই না-পাওয়ার তীব্র দহন
তাতে মেটে তো মিটুক, নিঃশেষে মিটুক!

রটুক, কিছু রটনা রটে তো রটুক
করিনা একরত্তি পরোয়া!
ঢিঢি পড়া নিন্দে, বিঁধে লাজুক অলিন্দে
তার গোপন সুখে কাঁপুক,
উতলা বুক থরথর কাঁপুক।
শুধু সে একটু লাজরাঙা হোক,
আনত চোখে নীরবে বাঙ্ময় হোক।
ভালবাসি বলুক, আহ্‌ ভালবাসি বলুক!

থাকুক, কিছু সুখ এমনি অধরাই থাকুক
কিছু পাওয়া না-পাওয়াই থাকুক।
কেউ না বুঝুক, শুধু সে, সে-ই বুঝুক।
ভালবেসে মরেছি কবেই, আফসোস নেই!
শুধু এই বুকেতে, বুকের গোপন কুঠুরিতে
তোমার চোখজোড়া, অনন্য মায়াকাড়া
বিষন্ন-আদরে হলেও পড়ে রউক।

তোমাকে চেয়ে এইসব দিনরাত্রি!

আজকাল প্রায়ই থাকি বাকরুদ্ধ। 
চোখেতে টলমল অবাধ্য অশ্রু
ভারী হয়ে থাকে, নামে না।
যেন মনোভারে মেঘ কালো – ভীষণ গাঢ় 
ঝরতে চেয়েও ঝরে না।
আজকাল প্রায়ই ভাবি তার কথা 
আলগোছে শ্বাস ফেলি – হৃদয়-কাটা! 
বুকে শুধু পেয়ে হারানোর ভয়
কেন এলে এই নিঃস্ব জীবনে, 
যদি আবার চলে যেতে হয়?
আজকাল সময় কাটে বড্ড ব্যাকুল
ঘটনার স্রোত বয়ে যায় নিত্য – মাড়িয়ে যায়
অথচ আমি থাকি বেভুল! 
উজানে পেতেছি বুক যদি তাকে পাই
সব আঘাত নেব সয়ে হাসিমুখে
কী করে বলি, তোমাকে কতটা চাই!
আজকাল চোরা নীরবতায় আকণ্ঠ ডুবে থাকি
কেউ জানে না, দেখে না 
বুকের কোথায় কী গভীর ভাংচুর,
কী অসহ বেদনা গাই অপ্রকাশের ধ্রুব ছন্দে! 
চোখেতে টলমল অবাধ্য অশ্রু
নেমে পড়ে আপন খেয়ালে। 
রক্ত ঝরায় না-বলা শত কথায়
সে যে স্থান-কাল কিছুই মানে না!

শূন্যতা

সকালটা এলো মনমরা হয়ে
যেন কোথাও কেউ নেই!
শুনছি একটা নাম না-জানা পাখির ডাক
অথচ বৃক্ষহীন এই চেনা পথে
নেই কোনো পাখির সুখ-নীড়!
অজানা ব্যথায় ভারী হয়ে যাই
কী যেন নেই, আহা কী যেন নেই!
সবারই তাড়া আছে
শুধু আমারই যেন আজ কোথাও যাবার নেই,
কিচ্ছু করার নেই!



আকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু!

তবু মরে গিয়েও বেঁচে উঠি প্রতিবারই
জেগে থাকি একাকী
অনুজ্জ্বল সব নক্ষত্রের মত।
দীপ্তি নেই তবু বেঁচে থাকা
চোখ ধাঁধানো আলোর মেলায়
নিঃসাড়ে চলাফেরা।
বুকে নিয়ে পাথর-গুমোট অভিমান
মৃত্যু কেন অধরা –
এই শ্রান্তি যে পাহাড় সমান!

বেঁচে থাকি নামহীন তারাদের নিঃস্ব সভায়
আমরা মৌনী – 
কেড়ে নিয়েছি জগতের
প্রায় সবটা একান্ত নীরবতা।
নীরবতা, আহ্‌ আত্মায় প্রোথিত
প্রাচীন বিচ্ছেদ-জ্বালা…
মুক্তির মৃত্যু এসো, তোমায় নেব হাসিমুখে।
মরে গিয়ে আর বেঁচে উঠতে চাই না!
শাশ্বত মিলন,
তুমি কি এতটাই অধরা?

অভিনয়

সময়ের অনঙ্গ দহন
চেপে রেখে বলি, ভালো আছি! 
সুখের মস্ত অসুখে
নির্বাণ ফস্কে বলি, এই বেশ আছি।
আমি ভালো আছি, আহা বেশ আছি। 
তোমাদের নিটোল ধারাপাতে
এখনও অপাংক্তেয়ই আছি!

চেয়ে চেয়ে দেখি,
মাইলফলকে লিখছে সুখিজন
সুখের যত কাহন
সব পরিপাটি, বিন্যস্ত চুলচেরা
যেন রাজসিক সদন। 
ভালো আছে, সব ভালো আছে
শুধু আমারই বড্ড ছন্দপতন!
ভীষণ অভিমানে রোদি,
সত্তার গহীনে
অনস্তিত্বের পদরেখা আঁকি।
যদি ভুলে যাওয়া যায়, ভুলে যাওয়া যায়
এই মেকি যাপিত জীবন। 

সময়ের অনঙ্গ দহন
মুখোশের নিত্য পুনর্জন্মে ঢেকে রাখি।
আকর্ণ হেসে বলি,
বেশ আছি, এই তো ভালো আছি। 
নিষ্পেষণের ঝড় আমূল ছাপিয়ে বলি, 
বেদনা বলতে আদৌ কিছু আছে কি!

বরং অচিনই থাকি

বরং অচিনই থাকি, কাছে না আসি
হেঁটে যাই আজন্ম সমান্তরালে
আছো জানি হাত-ছোঁয়া নাগালে
তবুও কী দুর্লঙ্ঘ দূরে!
কিছু কিছু কথা না-বলাই ভালো
চাপা থাক কিছু ব্যথা।
কিছু চাওয়া না পাওয়ায় মিশে থাক
অপ্রাপ্তিতেই পূর্ণতা পাক বিষম জ্বালা।
বরং দূরেই থাকি, নীরবে দেখি
লুকোনোই থাক ভালবাসা।
কিছু বাধা অ-পেরোনোই থাক
তৃষ্ণা হয়ে থাক কান্না-গভীর ঘুমে মাখা।
বরং অচিনই থাকি, আমায় না চিনলে
সেই ভালো, সেই ভালো
জেনেও না জানলে!