তোমাকে চেয়ে এইসব দিনরাত্রি!

আজকাল প্রায়ই থাকি বাকরুদ্ধ। 
চোখেতে টলমল অবাধ্য অশ্রু
ভারী হয়ে থাকে, নামে না।
যেন মনোভারে মেঘ কালো – ভীষণ গাঢ় 
ঝরতে চেয়েও ঝরে না।
আজকাল প্রায়ই ভাবি তার কথা 
আলগোছে শ্বাস ফেলি – হৃদয়-কাটা! 
বুকে শুধু পেয়ে হারানোর ভয়
কেন এলে এই নিঃস্ব জীবনে, 
যদি আবার চলে যেতে হয়?
আজকাল সময় কাটে বড্ড ব্যাকুল
ঘটনার স্রোত বয়ে যায় নিত্য – মাড়িয়ে যায়
অথচ আমি থাকি বেভুল! 
উজানে পেতেছি বুক যদি তাকে পাই
সব আঘাত নেব সয়ে হাসিমুখে
কী করে বলি, তোমাকে কতটা চাই!
আজকাল চোরা নীরবতায় আকণ্ঠ ডুবে থাকি
কেউ জানে না, দেখে না 
বুকের কোথায় কী গভীর ভাংচুর,
কী অসহ বেদনা গাই অপ্রকাশের ধ্রুব ছন্দে! 
চোখেতে টলমল অবাধ্য অশ্রু
নেমে পড়ে আপন খেয়ালে। 
রক্ত ঝরায় না-বলা শত কথায়
সে যে স্থান-কাল কিছুই মানে না!

শূন্যতা

সকালটা এলো মনমরা হয়ে
যেন কোথাও কেউ নেই!
শুনছি একটা নাম না-জানা পাখির ডাক
অথচ বৃক্ষহীন এই চেনা পথে
নেই কোনো পাখির সুখ-নীড়!
অজানা ব্যথায় ভারী হয়ে যাই
কী যেন নেই, আহা কী যেন নেই!
সবারই তাড়া আছে
শুধু আমারই যেন আজ কোথাও যাবার নেই,
কিচ্ছু করার নেই!



আকাঙ্ক্ষিত মৃত্য!

তবু মরে গিয়েও বেঁচে উঠি প্রতিবারই
জেগে থাকি একাকী
অনুজ্জ্বল সব নক্ষত্রের মত।
দীপ্তি নেই তবু বেঁচে থাকা
চোখ ধাঁধানো আলোর মেলায়
নিঃসাড়ে চলাফেরা।
বুকে নিয়ে পাথর-গুমোট অভিমান
মৃত্যু কেন অধরা –
এই শ্রান্তি যে পাহাড় সমান!

বেঁচে থাকি নামহীন তারাদের নিঃস্ব সভায়
আমরা মৌনী – 
কেড়ে নিয়েছি জগতের
প্রায় সবটা একান্ত নীরবতা।
নীরবতা, আহ্‌ আত্মায় প্রোথিত
প্রাচীন বিচ্ছেদ-জ্বালা…
মুক্তির মৃত্যু এসো, তোমায় নেব হাসিমুখে।
মরে গিয়ে আর বেঁচে উঠতে চাই না!
শাশ্বত মিলন,
তুমি কি এতটাই অধরা?

অভিনয়

সময়ের অনঙ্গ দহন 
চেপে রেখে বলি, ভালো আছি! 
সুখের মস্ত অসুখে
নির্বাণ ফস্কে বলি, এই বেশ আছি।
আমি ভালো আছি, আহা বেশ আছি। 
তোমাদের নিটোল ধারাপাতে
এখনও অপাংক্তেয়ই আছি!

চেয়ে চেয়ে দেখি,
মাইলফলকে লিখছে সুখিজন
সুখের যত কাহন
সব পরিপাটি, বিন্যস্ত চুলচেরা
যেন রাজসিক সদন। 
ভালো আছে, সব ভালো আছে
শুধু আমারই বড্ড ছন্দপতন!
ভীষণ অভিমানে রোদি,
সত্তার গহীনে
অনস্তিত্বের পদরেখা আঁকি।
যদি ভুলে যাওয়া যায়, ভুলে যাওয়া যায়
এই মেকি যাপিত জীবন। 

সময়ের অনঙ্গ দহন
মুখোশের নিত্য পুনর্জন্মে ঢেকে রাখি।
আকর্ণ হেসে বলি,
বেশ আছি, এই তো ভালো আছি। 
নিষ্পেষণের ঝড় আমূল ছাপিয়ে বলি, 
বেদনা বলতে আদৌ কিছু আছে কি!

বরং অচিনই থাকি

বরং অচিনই থাকি, কাছে না আসি
হেঁটে যাই আজন্ম সমান্তরালে
আছো জানি হাত-ছোঁয়া নাগালে
তবুও কী দুর্লঙ্ঘ দূরে!
কিছু কিছু কথা না-বলাই ভালো
চাপা থাক কিছু ব্যথা।
কিছু চাওয়া না পাওয়ায় মিশে থাক
অপ্রাপ্তিতেই পূর্ণতা পাক বিষম জ্বালা।
বরং দূরেই থাকি, নীরবে দেখি
লুকোনোই থাক ভালবাসা।
কিছু বাধা অ-পেরোনোই থাক
তৃষ্ণা হয়ে থাক কান্না-গভীর ঘুমে মাখা।
বরং অচিনই থাকি, আমায় না চিনলে
সেই ভালো, সেই ভালো
জেনেও না জানলে!

ভাল নেই আমি!

কেউ জানে না এ ব্যথা কোথায় গিয়ে জ্বালায়?
কেউ বোঝে না এ অনাদর কোথায় গিয়ে কাঁদায়?
আমায় যত পার দুঃখ দিয়ে যাও, কিছুই বলব না।
যত পার আঘাতে কর রক্তাক্ত, তবু ক্ষত দেখাব না।
কেউ জানে না চেয়ে চেয়ে কেবলি দেখি শিখরের স্থানচ্যুতি।
কেউ বোঝে না আলগোছে কখন ক্ষয়ে যায় হৃদয়ের মোহন দ্যুতি!
আমায় যত পার উপেক্ষা করে যাও, প্রতিবাদ করব না।
যত পার প্রচ্ছন্নে সরিয়ে দাও বাড়িয়ে দেয়া হাত, অভিযোগ করব না।
কেউ জানে না কোন্‌ গভীর ব্যথায় নীল হয়ে আছি এই আমি…
কেউ বোঝে না কোন্‌ অব্যক্ত অভিমানে কী বড্ড খারাপ আছি!
আমি ভাল নেই, সত্যিই ভাল নেই। তুমি কি বেশ আছ?
আমায় পুড়িয়ে কোন্‌ অনলে স্বস্তির মরীচিকা সারারাত খুঁজেছ?

একদিন তোমার কাছে যাব

একদিন তোমার কাছে যাব।
ভরা নিবিড় একাকী সাঁঝে
তোমায় করজোড়ে মাঙ্গব।
একদিন আকাশের মন ভালো থাকবে
বেদনারা নেবে ছুটি; আনন্দ ভিজে থাকবে।
সেদিন হৃদয়ের দ্বারে থাকবে না কোন আগল
দুঃসাহসী হবে তুমি। আর আমিও।
একদিন প্রতিরোধ সব ভেসে যাবে,
সেদিন দেখে নিও, দেখে নিও।
রইবে কেবল বিধুর লগন – লুপ্ত মগ্ন পাগল।
একদিন তোমার কাছেই ফিরব।
হাঁটু গেড়ে মেনে নিব আমার যত পরাজয়।
একদিন আত্মাভিমানে দিব যতি,
বলব – নিয়ে নাও, বুঝে নাও
এই দলিত মনের যাবতীয় বিষয়-আশয়।

সেই দিন দূরে নয় – জেনে রেখ
তোমার কাছেই যাব।
ভিখিরির মত হলেও একটা চুম্বন,
কালের বুকে জেগে আছে নিয়ে
অযুত দাগের বকেয়া…
ধর বাঁচার শেষ অবলম্বন –
তোমায় কাছে হাত পাতব।
একদিন তোমায় নিরাভরণ চাইব
পারস্পরিক বাঘবন্দী খেলা পিছে ফেলে
নিতান্ত সরলে গা ভাসাব।

একদিন তোমার কাছে যাব
ভরা নিবিড় জমাটি ক্ষণে
কেবল তোমায়, তোমাতে নিলীন হব।