মন ভালো নেই আমার

মন ভালো নেই আমার
মিলন-মেলা যে ভেঙ্গে গেল।
তিলে তিলে গড়া ঠাসবুনোটের বাঁধন
আজ নিমেষে গুঁড়িয়ে গেল!

রুদ্ধশ্বাসের ক্রুর নীরবতা
অস্বস্ত ছন্দে বহমান।
বুক ভাঙার তীব্র ব্যথা
ফেনায় মনো-নদীর মোহনায়।
আজ পূর্ণতা পেল অগোচরে জমা
অন্তর্লীন যত অযাচ্য শূন্যতা!

আমি নির্বাক হয়ে শুধু চেয়েই রই।
পাড় ভাঙা নদীর মতো
বিনাশের আদিম উল্লাস,
এতটুকু ছোঁয় না আমায়।
আমি কান পেতে শুনি
ভাঙনের নিগুঢ় ধ্বনি।
আস্তাকুঁড়ে সহসা ফেলে দেয়া
স্মৃতির মালাগুলি কেবলই হাতড়ে ফিরি।

মন ভালো নেই যে আমার।
মেলা শেষের শশ্মান-নৈঃশব্দে
আমি আজ স্তব্ধ।
কেঁদে কেঁদে ডেকে চলে স্মৃতির পাপিয়া
ফিরে পেতে চায়
হারিয়ে ফেলা যত অবুঝ স্বপ্ন।

মন ভালো নেই আমার…

দশটি অনুকবিতা

১. 

মন্দির জ্বলে, মসজিদ ভাঙে

লোভী হায়েনারা হাসে।

বিশ্বাস পুড়ে, শেকড় ছিঁড়ে

কে দেখে মানবতা কাঁদে?

২.

আমি তোমাদের কেউ নই

কেউ নও তোমরা আমার।

তবুও থাকি পাশাপাশি

যেন চিনি জন্ম-জন্মান্তর!

৩.

দিনগুলি গড়াচ্ছে দ্রুত

যেন বল্গাহীন ত্বরণ

নুয়ে যাচ্ছি, ক্ষয়ে যাচ্ছি

বিদ্রুপে অমোঘ মন্দন!

৪.

নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবো

কী ভয়ানক মূঢ়তা!

তুমি যে কিছুই নও

জানো কি পরম সত্যটা?

৫.

ভিড়ের মাঝেও একা আমি

তুমিহীন শূন্যতা

কোলাহলেও নৈশব্দ ছুঁই

বুঝ কি এই যন্ত্রণা?

৬.

ভালোবাসতেই হবে এমনটা নয়;

অনাদরে রেখো না।

আড়ম্বরের চুম্বন নাইবা পেলাম

শুধু অনীহা পুষো না!

৭.

হাসিমুখ তোমাদের বিস্মিত করে

সুখ তোমরা পাও না।

চোখের তারায় নিখাদ দুর্বোধ্যতা

দুখও তোমরা জানো না।

৮.

জীবনের কোনো বিশেষ মানে নেই

এবেলা স্বীকার করে নাও।

যাপনের কোনো দৃঢ় কারণও নেই

অহেতুক মোহপাশে যতি দাও।

৯.

মুখে বলো ভাই ভাই

ভেতরে ঘৃণার সীমা নাই।

মনে নাকি কিছু নাই

অথচ নিনাদে নিকুচিটাই!

১০.

যার যার আমিটাই বড়ো

আর সব ফাঁকা

অহংভারে পিষ্ট থাকো

চক্ষু দুটি বাঁধা।

তুমি আমার

তুমি আমার।
এর থেকে বড়ো কথা আর কখনও লেখা হয়নি!
তুমি আছো এই হৃদয়ের মণিকোঠায়।
এর থেকে সুরম্য আবাস আর কেউ গড়েনি!
তুমি আমার নিঃশ্বাসে পরম বিশ্বাসে।
এর থেকে নির্মল হাওয়া আর বয়নি কখনও।
তুমি আমার চোখের জলরেখা – আনন্দ এবং বিষাদে।
এর থেকে গভীর নদী আর জন্মেনি কোনোকালেও।
তুমি আমার প্রাণ – আমার বেরঙিন জীবনে
একমুঠো রঙের বান।
এর থেকে বড়ো সত্য আর কখনও হয়নি!
তুমি আমার, শুধু আমার।
এর থেকে বড়ো কবিতা আসলেই কেউ লিখেনি!

কাকে বলি?

কাকে বলি?
কেউ নেই শোনার।
প্রতিদিন যে একটু একটু করে মরে যাচ্ছি!
নিত্যদিন একই নামচা –
কেবলই আসে যায়, আহা!
একঘেয়ে প্রভাত, রোদনভরা আকাশ
এবং রংজ্বলা সায়াহ্নের সন্ন্যাস…
আর এক গুচ্ছ হৃদয়হীনতার
অগভীর ক্লেদাক্ত স্পর্শ!
ভেতরে ভেতরে কী যে ভীষণ ক্ষয়ে যাচ্ছি
কেউ নেই দেখার!
শুধুই কান্তিহীন অমোঘ রাত্র –
মেকি সুখে কী ভীষণ
অভিমানী বিমর্ষ!

আন্তর্জালিক মিছে অহং!

আজকাল কিছুই বলা বারণ

মুখে মারো তালা!
সকলই সেজেছে আজ বোদ্ধা
অন্তর্জালের তুমুল তুখোড় ভুঁইফোড় যোদ্ধা!
আজ সবাই-ই জ্ঞানী, সবই জানে,
অজানা নেই কিছুই!
ভেতরে যে মজা নদী কিংবা হাঁটু জল
কে রাখে খবর তার? ভাসাভাসা সবই।
আজ মূর্খের দাপট, হাতের ডগায় বিদ্বেষী কপট
কে হয় সাহসী? বলে দেয় তুমিই ভুল
কথায় নেই নূন্যতম যুক্তি-জ্ঞানের বহর!

ইদানীং সবাই বড্ড স্পর্শকাতর
তাই মুখে মারো তালা!
সব কথাতেই দোস্ত বেজার
উচিত কথায় মানীর মান উজাড়।
আজ সবাই একশ একাই
আহা, কমতি যে নেই কিছুই!
বলতে গেলেই ফেঁসে যাবে,
জিভের ডগায় লাগবে যুদ্ধ
আর আঙুলে পারমাণবিক মৃত্যু!

অন্তর্জালে সবাই যে আজ জিম্মি
আপন আপন অহং বৃত্তে।
কেউ বুঝে না এসবই ফাঁপা
মূল্য নেই এতটুকুও,
নিছক নির্বুদ্ধিতায় যে মাপা!
হতে গেলে সরব, নীরবতা শেখো আগে
গভীর হও – তাতেই যে সব অনুপম সৃষ্টি!

~~অনিকেত উদাসীন~~

সব বদলে যায় না!

বদলায় মানুষ, বদলায় জীবন।
বদলে যায় জীবনের বাহারি খোলস।
বদলায় ভালোবাসা, বদলায় বাঁচার টুকরো আশা।
আর বদলায় মানুষের মুখোশ!

এত কিছু বদলের ভীড়ে,
নিজেরে খুঁজি দল বদলের ব্যস্ত তীরে।
শুনি কেবল ব্যর্থতার অদ্ভুত গুঞ্জন!
মন আমার অচিন পাখি,
কেন রাখল পুষে কবেকার প্রাচীন স্মৃতি?
ঠিক বহুকাল আগেও ছিল যেমন!

বদলে যায় পৃথিবী, বদলে যায় সময়।
শুধু আমিই ভুলে যাই কীভাবে বদলে যেতে হয়।
রয়ে যাই অনড়, দাঁড়িয়ে থাকি এক ঠায়
আঃ, আমি ভুলে যাই কীভাবে অমানুষ হতে হয়!

প্রথম প্রকাশঃ ২০০৬

তোমাকে চাই!

আমি যাহারে চাই কাছে খুব কাছে
পাই না তাহারে, সে যে রয় দূরে বহুদূরে।
এই নিরল বিরল নিঝুম বরিষণে
আহা, কোথায় পাই তাহারে?
আহারে, সুখহীন নিশিদিন এই হৃদমাঝারে
তাহারে চাই, কেমনে পাই?
এ মন যে হায় আর মানে না রে!
আহারে, চাই তাহারে এই বুকের পরে
চেয়ে থাক সেই দুটি চোখ পরম নিষ্পলক,
নিশ্চুপ অলক মেঘভার উচ্ছ্বাসে।
আহারে, এই ব্যাকুল ঝরা রোদনে
কে আসে, অধর রাখে চাতকের ব্যথিত বেদনে?


The wanting of you!

Whom I want very close to mine,
Don’t get her, she is so far away.
Oh, where do I find her
In this quiet rare lonely rain?
Alas, these joyless days and nights
Keep crushing on me saddened with longing
I want her so deep in me, how to get her?
This heart can’t bear anymore!
Ah, I need her so badly to quench my loneliness.
Wish those eyes keep gazing in love,
Oozing with innocence.
Yet silent in the breath of lusty cloudlets.
Ah, under this disturbing sky full of cry,
Who comes, touch me
on the lips of a love-hurt shy!

এমনি ভালোবেসো!

বুকেতে এই ভালোবাসা এমনি রাখো জমিয়ে
আমায় চেয়ে যত চাওয়া এমনি ঢালো বিরহে।
তোমায় আমি পোড়াই সখি নিত্য দুখের অনলে
পারি না যে, কী ভীষণ জ্বালা সে, একটুও জুড়োতে।
আমায় তবে শাস্তি দিয়ো, আঘাতে আঘাতে করো বিদ্ধ
এই পাঁজরে সব সয়ে যাব, তবু প্রেম হোক অনিরুদ্ধ!
বুকেতে এই চাওয়া, পাগলা হাওয়া, এমনি ঝড়ে টেনে নিয়ো,
এই আদরে নীরব অভিমানে একটা অবুঝ আঙ্গুল রাখতে দিয়ো!

পাওয়া না-পাওয়া

শুনছ, কিছু অপ্রাপ্তি থাকে তো থাক
সব পাওয়ার জাদুকরি এ যুগে
কিছু না-পাওয়া অহরহ জমে যাক।
সবটা দেখা না হোক, থাকুক কিছু কল্পনা
নিত্য রচুক অদেখার জ্বালা-জানালা
দাঁড়িয়ে থেক একাকী – প্রতীক্ষায়,
এঁকো নিবিড় রঙিন আলপনা।

শত কথামালার অযাচ্য ভিড়
মুখ লুকায় খুব চাওয়ার সেই শব্দনীড়।
তবু জেনো, কিছু কথা না-বলাই থাক
অনুক্ত থাক হৃদয়ের গভীরতম ভাবনা।
বোবা ভাষায় বুঝে নিও সেসব
বুকে নিও কাছে না পাবার সব যাতনা।

কিছু রহস্য থাকে তো থাক যেন জমাট নিশুতির গল্প
সবটা জানতে চাই না, তুমিও চেয়ো না
কে না জানে সব জানায় উচ্ছ্বাস চিরন্তনী অল্প!
শুনছ, সব মিছের এই যুগে একটাই ধ্রুব সত্য
ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি
তুমি আমার, রবে যুগে যুগে
বুকে রেখ এই নিত্যতার আদিগন্ত।

ভালোবাসি প্রিয়!

আমার ভালোও তো লাগে
এই দুকুল ভাসা হৃদ-পিঞ্জরে।
নিরেট এই ভালোবাসাহীনতায়
কেউ তো আমার জন্য ভাবে।
হায়, জীবনটাই যে গেছিল খরচে
বড্ড অনাদরে, ভালোবাসার অনটনে।

এই মনই কেবল জানে কখনও চাইনি কিছু
মুখ ফুটে বলিনি কভু – ভালোবাসি প্রিয়!
শুধুই মনোমেঘে নিরল বরিষণ
কেন কেউ বুঝেনি, বুঝতে চায়নি
আমার মগন গহন নীরব আবেদন!
বুঝতে দিইনি, কোথায় রেখেছি
যত অবুঝ আদুরে চাওয়ার ব্যথা।
অতঃপর সে এলো, ভালোবাসল, রাঙালো
বর্ণহীন আমার জীবনগাথা।
বলল, রাখবে এ বুকে
তোমার সর্বহারা নিঃস্ব অভিমানী মাথাটা?

আমার ভালো যে লাগে
এই স্বেচ্ছাবন্দীত্ব,
এই দখলপ্রবণ আদুরে উপনিবেশ
কেউ তো আমায় বুকে তুলে নিয়েছে!
যত্নে শুধিয়েছে দুটো মামুলি কথা,
আর গভীর-ক্ষরা প্রেম ঠোঁটে মেখেছে।

হায়, জীবনটাই গেছিল খরচে
ভালোবাসার অনটনে
তুমি এলে, ভালোবাসলে
ছলছল এ চোখে এখন শুধু
তারই অনির্বাণ রেশ।
কবিতাঃ ভালোবাসি প্রিয়!