আকাঙ্ক্ষিত মৃত্য!

তবু মরে গিয়েও বেঁচে উঠি প্রতিবারই
জেগে থাকি একাকী অনুজ্জ্বল সব নক্ষত্রের মত।
দীপ্তি নেই তবু বেঁচে থাকা
চোখ ধাঁধানো আলোর মেলায় নিঃসাড়ে চলাফেরা।
বুকে নিয়ে পাথর-গুমোট অভিমান
মৃত্যু কেন অধরা – এই শ্রান্তি যে পাহাড় সমান!

বেঁচে থাকি নামহীন তারাদের নিঃস্ব সভায়
আমরা মৌনী – 
কেড়ে নিয়েছি জগতের প্রায় সবটা একান্ত নীরবতা।
নীরবতা, আহ্‌ আত্মায় প্রোথিত প্রাচীন বিচ্ছেদ-জ্বালা…
মুক্তির মৃত্যু এসো, তোমায় নেব হাসিমুখে।
মরে গিয়ে আর বেঁচে উঠতে চাই না!
শাশ্বত মিলন, তুমি কি এতটাই অধরা?

Advertisements

অভিনয়

সময়ের অনঙ্গ দহন চেপে রেখে বলি, ভালো আছি! 
সুখের মস্ত অসুখে নির্বাণ ফস্কে বলি, এই বেশ আছি।
আমি ভালো আছি, আহা বেশ আছি। 
তোমাদের নিটোল ধারাপাতে এখনও অপাংক্তেয়ই আছি!

চেয়ে চেয়ে দেখি, মাইলফলকে লিখছে সুখিজন সুখের যত কাহন
সব পরিপাটি, বিন্যস্ত চুলচেরা যেন রাজসিক সদন। 
ভালো আছে, সব ভালো আছে শুধু আমারই বড্ড ছন্দপতন!
ভীষণ অভিমানে রোদি, সত্তার গহীনে অনস্তিত্বের পদরেখা আঁকি।
যদি ভুলে যাওয়া যায়, ভুলে যাওয়া যায় এই মেকি যাপিত জীবন। 

সময়ের অনঙ্গ দহন মুখোশের নিত্য পুনর্জন্মে ঢেকে রাখি
আকর্ণ হেসে বলি, বেশ আছি, এই তো ভালো আছি। 
নিষ্পেষণের ঝড় আমূল ছাপিয়ে বলি, 
বেদনা বলতে আদৌ কিছু আছে কি!

বরং অচিনই থাকি

বরং অচিনই থাকি, কাছে না আসি
হেঁটে যাই আজন্ম সমান্তরালে
আছো জানি হাত-ছোঁয়া নাগালে
তবুও কী দুর্লঙ্ঘ দূরে!
কিছু কিছু কথা না-বলাই ভালো
চাপা থাক কিছু ব্যথা।
কিছু চাওয়া না পাওয়ায় মিশে থাক
অপ্রাপ্তিতেই পূর্ণতা পাক বিষম জ্বালা।
বরং দূরেই থাকি, নীরবে দেখি
লুকোনোই থাক ভালবাসা।
কিছু বাধা অ-পেরোনোই থাক
তৃষ্ণা হয়ে থাক কান্না-গভীর ঘুমে মাখা।
বরং অচিনই থাকি, আমায় না চিনলে
সেই ভালো, সেই ভালো
জেনেও না জানলে!

ভাল নেই আমি!

কেউ জানে না এ ব্যথা কোথায় গিয়ে জ্বালায়?
কেউ বোঝে না এ অনাদর কোথায় গিয়ে কাঁদায়?
আমায় যত পার দুঃখ দিয়ে যাও, কিছুই বলব না।
যত পার আঘাতে কর রক্তাক্ত, তবু ক্ষত দেখাব না।
কেউ জানে না চেয়ে চেয়ে কেবলি দেখি শিখরের স্থানচ্যুতি।
কেউ বোঝে না আলগোছে কখন ক্ষয়ে যায় হৃদয়ের মোহন দ্যুতি!
আমায় যত পার উপেক্ষা করে যাও, প্রতিবাদ করব না।
যত পার প্রচ্ছন্নে সরিয়ে দাও বাড়িয়ে দেয়া হাত, অভিযোগ করব না।
কেউ জানে না কোন্‌ গভীর ব্যথায় নীল হয়ে আছি এই আমি…
কেউ বোঝে না কোন্‌ অব্যক্ত অভিমানে কী বড্ড খারাপ আছি!
আমি ভাল নেই, সত্যিই ভাল নেই। তুমি কি বেশ আছ?
আমায় পুড়িয়ে কোন্‌ অনলে স্বস্তির মরীচিকা সারারাত খুঁজেছ?

একদিন তোমার কাছে যাব

একদিন তোমার কাছে যাব।
ভরা নিবিড় একাকী সাঁঝে
তোমায় করজোড়ে মাঙ্গব।
একদিন আকাশের মন ভালো থাকবে
বেদনারা নেবে ছুটি; আনন্দ ভিজে থাকবে।
সেদিন হৃদয়ের দ্বারে থাকবে না কোন আগল
দুঃসাহসী হবে তুমি। আর আমিও।
একদিন প্রতিরোধ সব ভেসে যাবে,
সেদিন দেখে নিও, দেখে নিও।
রইবে কেবল বিধুর লগন – লুপ্ত মগ্ন পাগল।
একদিন তোমার কাছেই ফিরব।
হাঁটু গেড়ে মেনে নিব আমার যত পরাজয়।
একদিন আত্মাভিমানে দিব যতি,
বলব – নিয়ে নাও, বুঝে নাও
এই দলিত মনের যাবতীয় বিষয়-আশয়।

সেই দিন দূরে নয় – জেনে রেখ
তোমার কাছেই যাব।
ভিখিরির মত হলেও একটা চুম্বন,
কালের বুকে জেগে আছে নিয়ে
অযুত দাগের বকেয়া…
ধর বাঁচার শেষ অবলম্বন –
তোমায় কাছে হাত পাতব।
একদিন তোমায় নিরাভরণ চাইব
পারস্পরিক বাঘবন্দী খেলা পিছে ফেলে
নিতান্ত সরলে গা ভাসাব।

একদিন তোমার কাছে যাব
ভরা নিবিড় জমাটি ক্ষণে
কেবল তোমায়, তোমাতে নিলীন হব।

প্রার্থনা!

একটা ভাল কিছু দাও, প্রভু
একটা অদ্ভুত কিছু দাও।
নিয়েছ সব কেড়ে – কিছুই বলি নি।
দিয়েছ দুখের উষর ভূমি – রা কাড়ি নি।
আর কত ভোগালে একটু তাকাবে?
নিন্দা করবে যে মন্দেরাও…
অন্তত একটা মন্দের ভাল দাও!
 
থেকেই যদি থাক তুমি, মৌনতা ঝেড়ে ফেল।
একটা অভূতপূর্ব কিছু বল।
মুক্তি দাও প্রভু, আমায় মুক্তি দাও।
একটা স্বস্তি মেশান হাসি দাও।
নিয়ে নাও এই জটিল জীবন, কুটিল মারপ্যাঁচ
এই বিদগ্ধ জ্ঞানের অকেজো মুখোশ –
নৈরাশ্যের ক্লেশকর দিন-মাস!
একটা নিছক সাদাসিধে জীবন দাও –
প্রত্যাশা বিহীন…
আমায় একটা ভাবনাহীন প্রহর দাও
যার কবোষ্ণ আলোয় দেখব গহীনের আমিকে।
যতই থাকুক অপূর্ণতা কিংবা পতনের হাহাকার,
ভালবাসব তাকে। যত দীন হোক না সে
তুলে নেব এই দু’হাতের অতল-ছোঁয়া স্পর্শে!
একটা নির্বোধের জীবনই দাও তবে!
ডুবে থাকি দিন-আনি-দিন-খাই সুখের
কন্টকহীন প্রস্রবণে!
 

একটা ভাল কিছু দাও প্রভু,
একটু দয়া দেখাও।
কারুকাজের জটিলতা আর চাই না – ফিরিয়ে নাও।
আমায় আনমনে একটা সহজিয়া সুর ভাজতে দাও!

 

প্রচ্ছন্ন রূঢ়তা

কোনো কোনো কথা জন্মান্তরের দাগের মত লেগে যায়
কোনো কোনো গরল অমৃতের মুখোশে হত্যার সনদ পায়!
জানা কথা – যাবতীয় তির বোঝেই না লক্ষ্যের চাপা ক্ষত
কী আসে যায় যদিবা অপ্রস্তুতে হয় আহত কিংবা নিহত!

কেউ কেউ অহেতুক রূঢ়তায় খুঁজে আত্মপ্রসাদ
আঘাতে আঘাতে ব্যথিত বুক – নিষণ্ণ নাভিশ্বাস।
কারো কারো দেখার চোখ থেকেও নেই –
শুধুই ব্যবচ্ছিন্ন আঁধার – অসংবেদি রাশি রাশি।

কারো ক্রুর হাসি সাদা চোখে তাচ্ছিল্যেরও কিছু বেশি
কারো বুকে স্রেফ বিঁধে যায় অফেরতা কথামালা
বোঝে না হায়, কারো স্বভিমান পায় নির্দয় ফাঁসি!

কোনো কোনো কথার ছাপ নির্মোচ্য পদচিহ্ণ রেখে যায়।
থেকে থেকে জাগে ক্ষরণকাল – আঘাতে দুর্মর!
কোনো কোনো বিষাদ নিশাতি উল্লাসে
ফিরে ফিরেই ভাঙ্গে বুকের পাঁজর।

—————————————
শব্দার্থঃ
নিষণ্ণঃ অবস্থিত
ব্যবচ্ছিন্নঃ কাটা-ছেঁড়া করা হয়েছে এমন।
অসংবেদিঃ সংবেদনশীল নয় এমন।
নির্মোচ্যঃ মোছার অযোগ্য।
দুর্মরঃ কিছুতেই মত বদলায় না এমন।
নিশাতঃ ধারালো, তীক্ষ্ণ অর্থে।