অনিকেত

আমি তোমাদেরই একজন। মিশে থাকি তোমাদের
হাসি-কান্না, দুঃখ-অভিমানে, এবং শোরগোলে।
কিংবা হয়তো আমি তোমাদের কেউ নই; ছিলামই না কখনো!
থাকিনি কখনো তোমাদের আটপৌরে জীবনে – স্বাভাবিক ডামাডোলে।
আমি অদৃশ্য, অস্পৃশ্য – ধরাছোঁয়ার বাইরে। কখনো আসিনি
তোমাদের অমলিন স্পন্দিত লাইম-লাইটে! কী আর হবে এসে?
কিংবা হয়তো মিশে গেছি তোমাদের আত্মায়, বোধের নিগূঢ় মূলে
তোমাদের অজানিতে, বন্ধুতার নিরুচ্চার আপন পাকচক্রে।
আমি আসলেই জানি না আমি কে? কে আমি? অথবা, কে তোমরা?
কুহক এ জীবন, বন্ধনের লুব্ধক স্বপ্নে আমূল বিভোর
অথচ জানে না কোথায় পথের শুরু –
কোথায় জমেছিলো অযাচ্য পথশ্রমের নিদারুণ হঠকারি ধুলো!
আমি তোমাদের হয়েও কেউ নই – নেই আমার কোনো ঠিকানা!
যাপিত জীবন চলছে এক মিছে সংসক্তির ছন্দে – হয়তো এটাই দস্তুর।
আমি উদাসীন, আমার নেই কোনো বাঁধনের জানা সীমানা।
আমি বেভুল পথিক। জানি না তবু কেন পথের জনারণ্যে
সুচিসম ভালোবাসাগুলো নেই কুড়িয়ে – আপ্লুত আবেগে!
আমি দ্বিধান্বিত ব্যাকুল, তোমাদের ভালোবাসায় কেন
বারে বারে, কারণে অকারণে ভাসে বুকের দীর্ঘশ্বাসি দু’কুল?
আমি উদাসীন, আমি তো কারুর নই, এ ভালোবাসা নিতান্ত অনভিপ্রেত!
জেনেও কেন ভুলে যাইঃ আমি উদাসীন – যাবজ্জীবনের অনিকেত!

তুমি আসবে বলে..

তুমি আসবে বলে
ভালোবাসাহীনতায় অনাথ পাখিরা
আবার বুঝি মেলেছে ডানা
বঞ্চনার পিঙ্গল আকাশে।
তুমি আসবে বলে
সুর-বিস্মৃত পাথর এ হৃদয়ে
আবার জমেছে গুঞ্জন;
অজানিতে বুঝি গুনগুনায়
ছন্দ-হীনতায় মগ্ন ব্যাকুল এ মন।
আমার এ জগদ্দল মৌনতা
তুমি ভাংবে বলে অনুভবি,
ভাবনার অতলে ঠিকানা হারালো
উদাসীনতার ক্লেশকর প্রত্যয়!
তুমি আবার ফিরবে বলে
নিদাঘের রং বুঝি বদলে যায়!
বুকের তপ্ত হাহাকারে মেশে
ছায়া সুশীতল, বারিময় অর্চনা।
তুমি আবার আসবে বলে
প্রতীক্ষায় ক্লিষ্ট আমার এই আমি
হৃদয়ের শব্দহীন ক্রুর জোছনায়
প্রেমময় মেঘের আড়াল খুঁজে যায়।

আক্ষেপ – এক রূপোপজীবিনীর জন্য!

সুন্দরীতমা, তোমায় দেখলে আমার বড়ো আক্ষেপ হয়।
অস্ফুটে বলিঃ সুন্দরের কী নিদারুণ অপচয়!
তোমার নিঁখুত কাটা চিবুকের খাঁজে যখন খেলে যায়
জমকালো বাণিজ্যের বেলাজ দ্যুতি,
কাতর হৃদয়ে ভাবিঃ স্বর্গীয় চারুকলার কী ভয়ানক বিচ্যুতি!
তোমার হাসিতে মুক্তা ঝরে,
সূচ্যগ্র নাকের চূড়ায় নিত্য খেলে স্রষ্টার অহমিকা!
অথচ তুমি জানোই না,
ভোমরার লাম্পট্যে সদা নিবেদিতা…
আকর্ষণেই মত্ত স্থূল দেহ-পঞ্জিকা!

সুন্দরীতমা, তোমায় তবু নিষিদ্ধ আবেগে ছুঁয়ে ফেলি।
পঙ্কিল জেনেও চরণ ডুবাই।
পাপ-পূন্যের একাকারি জলে বেভুল আমি খেই হারাই!
তোমার ক্রীড়নক চোখে হারাতে হারাতে ভাবিঃ
কী সহজে অলির মৃত্যু লিখো অনর্গল…
যদি সত্যিকারের মরণ দিতে পারতে?
পারতে যদি হৃদয় খুড়তে…
ধরতে যদি অধরে উষ্ণতম অকপট আকুলি
বুঝতে যদি প্রেমের সরলতম মিঠে বুলি!

তোমায় ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে নিজের কাছেই নিত্য ভাংচুর হই।
অক্ষম রাগে ভেসে যাই –
আহা, সুন্দরের কী নিদারুণ অপমান!

পারতাম যদি ছুঁতে অতলান্তের পরম নিষ্পাপ মনটিকে,
যেটি কোনো কোনো ব্যাকুল সাঁঝে কি
একটিবারও কেঁদে ওঠে না!
নারীত্বের প্রবল অপমান কি কাঁপিয়ে দেয় না
বিকিকিনির লাল-নীল আদিম সামিয়ানা?

সুন্দরীতমা, তোমায় যখনি দেখি অভিশাপ দেই নিজেকে,
অভিশাপ দেই স্বীয়-ভীরুতায়, যুগান্তরের নির্জলা কাপুরুষত্বে।
জানি, কখনই বলা হবে না, বাড়িয়ে দেবো না হাত।
বলব নাঃ রূপোপজীবিনী, এসো তোমায় আলো দেখাই!
জগতের অন্যতম নিকৃষ্ট পাপে বড়ো আক্ষেপে বলিঃ
মনুষ্যত্বের কী নিদারুণ অপচয়!!

তুমি বিনা

তুমি বিনা লাগে না কিছুতে মন
তুমিহীনা সব তামাদি
শুধু নির্জলা বিকর্ষণ!
যখন আমি পাই না কোথাও তোমায়,
গেঁথে চলো মৌনি-মালা, তখন
কিছুই হায়, এ মন না ভোলায়!
তুমি বিনা রঙ ফোটেনা আকাশে
তুমিহীনা গোলমাল পাখি-ঠোঁটে
তুমি বিনা উদোম বিতৃষ্ণা হৃদ-সকাশে!
তখনো আমি খুঁজি তারে বারে বারে
কেবলি চাই উৎকন্ঠা ভরে
যদি আসো মিছে অভিমান ভুলে?
তুমি বিনা ভালো লাগে না জীবন
তুমিহীনা সব বিবাগী
শুধু নির্মায়িক জ্বালাতন!