গল্পগুলি গাঁজাখুরি!

পিতা : কাপুচিনো

সকালে কাপুচিনো খেয়েছিল মুনিয়া। সে থেকেই তার পেটটা গর্ভবতীদের মতো বড়ো হতে থাকল। সকালে কাপুচিনো ছাড়া আর কিছু খায়নি সে। প্রচন্ড বিবমিষা। বিকেল হতে হতেই সে স্পষ্ট নড়াচড়া টের পেল। কে জানি একটা লাথিও মারল ভেতর থেকে।  মুনিয়ার পার্টনার চুন্নু একরাশ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে। একসঙ্গে থাকার চুক্তিবলে চুন্নুর দ্বিমত করা বারণ। হাল সমাজে এমনই চলছে। চুন্নু মাথা দুলিয়ে বলতে থাকল, অবশ্যই কাপুচিনো খেয়েই তুমি গর্ভবতী হয়ে গেছ। এই সংবাদ সে বাইফাইতে (বায়ো ওয়াইফাই) দিয়ে দিলো। চুন্নু একজন প্রতিষ্ঠিত মূর্খ তার্কিক। তাই অন্য সবাই বলামাত্রই মেনে নিল। এই একবিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে কারও বিশেষ কোনো মাথাব্যথা নেই। বাইজেনরা (বাইফাই এর বিদগ্ধ তালমার* সমাজ) সবাই অতি দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেল যে নিশ্চিত ভাবে কাপুচিনোটাই অনাগত সন্তানের পিতা। ২০০০ : ১০ ভোটে তা সাদরে গৃহীত হলো। বিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ভোটটা দিয়েছেন গন্ডমূর্খ উপাধিধারী প্রফেসর জগলু। বহু বছর আগে মগজের ফ্রন্টাল লোবের ঐতিহাসিক আরোপিত পরিবর্তন প্রমাণ করে তিনি হাসির পাত্র হয়েছেন। সিরামটা তাঁরই তৈরি। পুরো প্রক্রিয়াটাকে নয় ঘন্টার মধ্যে এনে ফেলেছেন। অথচ গর্দভগুলোর সেটা বুঝার ক্ষমতাই নেই। যুক্তি আর সমালোচনা এখন কাউকে করতে দেখা যায় না। তবে এই খেলাটায় তিনি বড্ড আনন্দ পান। এখন যেমন জংগলের মতো গোঁফের তল দিয়ে হাসতে হাসতে বিড়বিড় করে বলছেন – হ্যাঁ, কাপুচিনোটাই তোমার সব্বনাশ করেছে!

*তালমার সম্প্রদায় – যারা তেল মেরেও তালগাছটি আমার তত্ত্বে প্রাণপাত করে বিশ্বাসী।

প্রকৃতির ডাক

বিমানের আসনে বসামাত্রই মবিন মিয়ার পেটটা মুচড়ে উঠল। বিয়ানে সোয়াকেজি উঠানের ধারে আধাপাকা টাট্টিখানায় দিয়ে এসেছিল। এখন তো লাগার কথা না। তারপর ম্যালা কাঠখড় পুড়িয়ে বিমানে উঠেছে। মুসা মিয়া বাপেরে উঠায় দিয়েই চম্পট মেরেছে। মবিন মিয়া প্লেনের বামও বুঝে না, ডানও না! দরদর করে ঘামছে। বায়ুর নিম্নচাপ ছোটোবেলায় দেখা সাইক্লোনের তান্ডবের মতো ঠেকছে। আর পারল না সে। চটের থলে থেকে প্লাস্টিকের লাল বদনাটা বের করল। এদিকওদিক তাকিয়ে নিমেষে প্লেনের দরজাটা খুলে বাইরে গেল মবিন মিয়া প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে। সবাই হায় হায় করে উঠল। এই ডাক যে একবার শোনে সে কি আর উপেক্ষা করতে পারে? খালি ত্যাগের আশায় শুধুই ঘামতে থাকে।

ছাগী

ক্যামডেন মার্কেটে বেশ কয়েকটা পুরোনো জিনিসের দোকান আছে। পার্থ জেনিকে নিয়ে বেড়াতে এসেছে। জেনি নাকি কোনোদিন এখানে আসেনি। মেয়েবন্ধুর আবদার ফেলা দুঃসাধ্য! জেনির সবই ভালো কিন্তু অত্যন্ত ন্যাকামি করে। এত বিরক্ত লাগে মাঝেমধ্যে। এই এখন যেমন ইজিপসিয়ান ধাপ্পাবাজটার হাতে সিল খাচ্ছে। সাধারণ একটা আংটি উচ্চমূল্যে কিনে দিতে হলো। অতঃপর বেশ পুরোনো জিনিসে ঠাসা একটা নিরিবিলি আফ্রিকান দোকানে ঢোকা হলো। বেশি খদ্দের নেই! জেনি স্বভাবসুলভ আহ্লাদি করে এটা ধরে তো ওটা ছাড়ে। পুরো দোকান একেবারে তছনছ করে দেবার জোগাড়। একবার বহুমূল্য একটা শোপিস ফেলেই দিয়েছিল প্রায়। মোটামতো বৃদ্ধা দোকানি একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে যেন এখনই ভস্ম করে দেবে। পার্থ গিয়ে সেই আগুনে লাইন অভ সাইট ভন্ডুল করে দিলো। হাজার হোক তার বান্ধবীকে সেই বুড়ির রোষানলে পড়তে দিতে পারে না।

এমন সময় জেনি চেঁচিয়ে উঠল। সে একটা ছাগীর মুখোশ পেয়েছে। সেটা সে পরে দেখতে চায়। মুখোশটার দিকে তাকিয়েই পার্থ নাক-মুখ কুঁচকে হেসে ফেলল। অত্যন্ত জীবন্ত যেন এখনই ম্যাহ করে উঠবে। মুখোশটা ধরামাত্রই বুড়ি তেড়েফুঁড়ে এলো। একগাদা সতর্কবাণীতে যা বুঝা গেল – সব জিনিস সবার জন্য নয়! জেনির এটা পরা যাবে না। সে বারবার একই কথা ভাঙা রেকর্ডের মতো বলতে থাকল।

কুসংস্কার পার্থ মোটেই মানে না। জেনিও না। বিত্তবান ঘরের আদুরী ভাবল দোকানি বিরক্ত হয়েই ভালো জিনিসটা ওকে দিতে চাচ্ছে না। সে যা চেয়েছে, বরাবর তা-ই পেয়ে এসেছে। ঐ ছাগীর মুখোশ তার চাই চাই-ই! পার্থ কিছুক্ষণ বুঝাবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিলো। ম্যালা বাকবিতণ্ডার পর নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও বৃদ্ধা রাজী হলো। ভাবখানা এরকম – মারা খেতে চাইলে খাও গিয়ে। আমার কী!

রাস্তায় একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করল পার্থ। কোন্‌ ফাঁকে জেনি যে মুখোশটা পরে নিয়েছে, খেয়ালই করেনি। মুখোশটা বেশ ভালোভাবে সেঁটে গিয়েছে জেনির মুখে। একটু বেশিই নিঁখুতভাবে। কলকল করে একটানা আগামাথাহীন কথা বলে যাচ্ছে জেনি। তাকে যে একটা আস্ত ছাগীর মতো দেখা যাচ্ছে এটা যেন সে খেয়ালই করছে না। অজানা আশংকায় বুকটা ধ্বক করে উঠল।

ছয়মাস পরের কথা। মানুষের নানান পোষ্য প্রাণির প্রীতির কথা শোনা যায়। কিন্তু একটা অভিজাত অ্যাপার্টমেন্টে কেউ একটা দুগ্ধবতী ছাগী পুষতে পারে, এ নিয়ে পার্থর প্রতিবেশীদের বিরাট কানাঘুষা। ওঃ, জেনি নামের আহ্লাদী মেয়েটাকে আর কোথাও দেখছে না কেউ! পার্থর কোলে থাকা ছাগীটা ম্যাহ্যাহ্যা করে উঠল।

কাকেদের একদিন

ঘন বরষার সন্ধ্যায় পাড়ার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতেই শান্ত একটা কাক হয়ে গেল। কীভাবে এই রুপান্তর হলো, বুঝা গেল না। কেউ দেখতে পেয়েছিল কিনা তাও জানে না। অবশ্য অমন ঝুম বৃষ্টিতে নিমেষে জমে যাওয়া হাঁটু পানিতে একমাত্র শান্তর মতো আধাপাগলই সান্ধ্যভ্রমণে বের হবে। কিন্তু এত পাখি থাকতে কাকই কেন হতে হলো তাকে? কাকপক্ষীটাকে তার খুবই অপছন্দ। কেমন কুতকুতে চোখে তাকিয়ে থাকে। স্পষ্ট অনুভূতি হয় যেন পর্যবেক্ষণ করছে। এই কদিন আগেও গুলতি দিয়ে একটাকে লাশ বানিয়ে দিয়েছিল। যদিও ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু হয়ে গেছে আরকি!

কাক তো হওয়া গেল, কিন্তু এই প্রবল বর্ষণে ভেজা কাক হয়ে থাকা ভালো ঠেকল না ওর। পাখা ঝাপটিয়ে বরই গাছের ডালে গিয়ে বসল। উড়তে বেশ লাগছে কিন্তু এই বৃষ্টিটা অসহ্য হয়ে গেল। একটু উষ্ণতা দরকার। সে তার কাকচক্ষু দিয়ে কোনো একটা পাখির বাসায় আতিথ্য গ্রহণের অভিপ্রায়ে ইতিউতি তাকাতে লাগল। বরইয়ের ঘন পাতা ভেদ করে কাছেই একটা বাসা দেখতে পেল। সেটা যে আরেকটা কাকের বাসা, এ সে কী করে বুঝল, কে জানে?

পুরুষ পাখিটি এগিয়ে এল। সাথে চোয়াড়ে চেহারার আরও দুটি কমবয়সী পাখি। অজানা কারণে ব্যাপারটা ভালো ঠেকল না শান্তর।

আপনাকে স্বাগতম যদিও আমরা আপনাকে চিনতে পেরেছি। কাকেদের নিয়ম অনুসারে আমরা আতিথেয়তায় কোনো ত্রুটি রাখব না। কিন্তু আপনাকে ছাড়বও না। শেষের বাক্যটি চোয়াড়ে চেহারার বাচ্চা কাকগুলি সমস্বরে বলল। শুনে শান্তর কাকের রক্ত হিম হয়ে গেল। মানে কী এর?

গুরুতর জখম হয়ে বরইয়ের ডাল থেকে পড়ে যাওয়াটা শান্ত নিমেষের মধ্যে দেখে ফেলেছিল। কিন্তু শেষ দুঘন্টায় যা চলছে তা অবিশ্বাস্য! শুকনো বরই পাতার আরামদায়ক কুশনে হেলান দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে তাকে। চোয়াড়েদের একটা কোত্থেকে দুটো জোনাক ধরে শান্তর তাকিয়ার সামনে জ্বালিয়ে দিয়েছে। আর তরতাজা কতগুলো কেঁচো খেতে দিয়েছে। কেঁচোটা গিলতে গিলতে শান্ত মনে মনে বলে উঠল, জীবন হয় সুন্দর!

তিনটি কাকই বিন্যাস আর সমাবেশ করে কা কা করে উঠল। যার মানে দাঁড়ায়, আমাদের পুরোপুরি জেন্টস ক্লাব করে ফেললেও আমরা কৃতজ্ঞ! ঘষেটি বেগম আমাদের জীবন জ্বালিয়ে খেয়েছিল। আয়েসে পাখা নড়াতে নড়াতে শান্তর মনে হলো গুলতি দিয়ে মেরে ফেলা কাকটা মহিলা ছিল সম্ভবত।

নিরল বাদলে একলা মনপাখি

এই নিরল ধারাপাত একটানা প্রপাতে
কী আশ্চর্য চাপা মূক!
আলগোছে ভিজে যায় নির্মম এ শহর
আর ভিজে তোমায় চেয়ে কেবল বঞ্চনা চুমে
উদাসীন কোনো এক নিঃসঙ্গ বুক।
এই নিরেট যন্ত্রণা অভিমানের জল পেয়ে
কী অদ্ভুত কাতর আর্দ্র!
যোজন যোজন দূরে, আয়ত চোখের তপ্ত নীড়ে
তাকেও কি ছুঁয়েছে এই অবুঝ বেদনার্ত?
এই রোদনের একলা বাদল,
কেন বাজাও মন কেমনের চাপা মাদল?
বুক ভাঙে, পাঁজর ভাঙে
আর ভাঙে মনপাখি নিষেধের যত আগল!

মন ভালো নেই আমার

মন ভালো নেই আমার
মিলন-মেলা যে ভেঙ্গে গেল।
তিলে তিলে গড়া ঠাসবুনোটের বাঁধন
আজ নিমেষে গুঁড়িয়ে গেল!

রুদ্ধশ্বাসের ক্রুর নীরবতা
অস্বস্ত ছন্দে বহমান।
বুক ভাঙার তীব্র ব্যথা
ফেনায় মনো-নদীর মোহনায়।
আজ পূর্ণতা পেল অগোচরে জমা
অন্তর্লীন যত অযাচ্য শূন্যতা!

আমি নির্বাক হয়ে শুধু চেয়েই রই।
পাড় ভাঙা নদীর মতো
বিনাশের আদিম উল্লাস,
এতটুকু ছোঁয় না আমায়।
আমি কান পেতে শুনি
ভাঙনের নিগুঢ় ধ্বনি।
আস্তাকুঁড়ে সহসা ফেলে দেয়া
স্মৃতির মালাগুলি কেবলই হাতড়ে ফিরি।

মন ভালো নেই যে আমার।
মেলা শেষের শশ্মান-নৈঃশব্দে
আমি আজ স্তব্ধ।
কেঁদে কেঁদে ডেকে চলে স্মৃতির পাপিয়া
ফিরে পেতে চায়
হারিয়ে ফেলা যত অবুঝ স্বপ্ন।

মন ভালো নেই আমার…

দশটি অনুকবিতা

১. 

মন্দির জ্বলে, মসজিদ ভাঙে

লোভী হায়েনারা হাসে।

বিশ্বাস পুড়ে, শেকড় ছিঁড়ে

কে দেখে মানবতা কাঁদে?

২.

আমি তোমাদের কেউ নই

কেউ নও তোমরা আমার।

তবুও থাকি পাশাপাশি

যেন চিনি জন্ম-জন্মান্তর!

৩.

দিনগুলি গড়াচ্ছে দ্রুত

যেন বল্গাহীন ত্বরণ

নুয়ে যাচ্ছি, ক্ষয়ে যাচ্ছি

বিদ্রুপে অমোঘ মন্দন!

৪.

নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবো

কী ভয়ানক মূঢ়তা!

তুমি যে কিছুই নও

জানো কি পরম সত্যটা?

৫.

ভিড়ের মাঝেও একা আমি

তুমিহীন শূন্যতা

কোলাহলেও নৈশব্দ ছুঁই

বুঝ কি এই যন্ত্রণা?

৬.

ভালোবাসতেই হবে এমনটা নয়;

অনাদরে রেখো না।

আড়ম্বরের চুম্বন নাইবা পেলাম

শুধু অনীহা পুষো না!

৭.

হাসিমুখ তোমাদের বিস্মিত করে

সুখ তোমরা পাও না।

চোখের তারায় নিখাদ দুর্বোধ্যতা

দুখও তোমরা জানো না।

৮.

জীবনের কোনো বিশেষ মানে নেই

এবেলা স্বীকার করে নাও।

যাপনের কোনো দৃঢ় কারণও নেই

অহেতুক মোহপাশে যতি দাও।

৯.

মুখে বলো ভাই ভাই

ভেতরে ঘৃণার সীমা নাই।

মনে নাকি কিছু নাই

অথচ নিনাদে নিকুচিটাই!

১০.

যার যার আমিটাই বড়ো

আর সব ফাঁকা

অহংভারে পিষ্ট থাকো

চক্ষু দুটি বাঁধা।

তুমি আমার

তুমি আমার।
এর থেকে বড়ো কথা আর কখনও লেখা হয়নি!
তুমি আছো এই হৃদয়ের মণিকোঠায়।
এর থেকে সুরম্য আবাস আর কেউ গড়েনি!
তুমি আমার নিঃশ্বাসে পরম বিশ্বাসে।
এর থেকে নির্মল হাওয়া আর বয়নি কখনও।
তুমি আমার চোখের জলরেখা – আনন্দ এবং বিষাদে।
এর থেকে গভীর নদী আর জন্মেনি কোনোকালেও।
তুমি আমার প্রাণ – আমার বেরঙিন জীবনে
একমুঠো রঙের বান।
এর থেকে বড়ো সত্য আর কখনও হয়নি!
তুমি আমার, শুধু আমার।
এর থেকে বড়ো কবিতা আসলেই কেউ লিখেনি!

কাকে বলি?

কাকে বলি?
কেউ নেই শোনার।
প্রতিদিন যে একটু একটু করে মরে যাচ্ছি!
নিত্যদিন একই নামচা –
কেবলই আসে যায়, আহা!
একঘেয়ে প্রভাত, রোদনভরা আকাশ
এবং রংজ্বলা সায়াহ্নের সন্ন্যাস…
আর এক গুচ্ছ হৃদয়হীনতার
অগভীর ক্লেদাক্ত স্পর্শ!
ভেতরে ভেতরে কী যে ভীষণ ক্ষয়ে যাচ্ছি
কেউ নেই দেখার!
শুধুই কান্তিহীন অমোঘ রাত্র –
মেকি সুখে কী ভীষণ
অভিমানী বিমর্ষ!

আন্তর্জালিক মিছে অহং!

আজকাল কিছুই বলা বারণ
মুখে মারো তালা!
সকলই সেজেছে আজ বোদ্ধা
অন্তর্জালের তুমুল তুখোড় ভুঁইফোড় যোদ্ধা!
আজ সবাই-ই জ্ঞানী, সবই জানে,
অজানা নেই কিছুই!
ভেতরে যে মজা নদী কিংবা হাঁটু জল
কে রাখে খবর তার? ভাসাভাসা সবই।
আজ মূর্খের দাপট, হাতের ডগায় বিদ্বেষী কপট
কে হয় সাহসী? বলে দেয় তুমিই ভুল
কথায় নেই নূন্যতম যুক্তি-জ্ঞানের বহর!

ইদানীং সবাই বড্ড স্পর্শকাতর
তাই মুখে মারো তালা!
সব কথাতেই দোস্ত বেজার
উচিত কথায় মানীর মান উজাড়।
আজ সবাই একশ একাই
আহা, কমতি যে নেই কিছুই!
বলতে গেলেই ফেঁসে যাবে,
জিভের ডগায় লাগবে যুদ্ধ
আর আঙুলে পারমাণবিক মৃত্যু!

অন্তর্জালে সবাই যে আজ জিম্মি
আপন আপন অহং বৃত্তে।
কেউ বুঝে না এসবই ফাঁপা
মূল্য নেই এতটুকুও,
নিছক নির্বুদ্ধিতায় যে মাপা!
হতে গেলে সরব, নীরবতা শেখো আগে
গভীর হও – তাতেই যে সব অনুপম সৃষ্টি!

~~অনিকেত উদাসীন~~

সব বদলে যায় না!

বদলায় মানুষ, বদলায় জীবন।
বদলে যায় জীবনের বাহারি খোলস।
বদলায় ভালোবাসা, বদলায় বাঁচার টুকরো আশা।
আর বদলায় মানুষের মুখোশ!

এত কিছু বদলের ভীড়ে,
নিজেরে খুঁজি দল বদলের ব্যস্ত তীরে।
শুনি কেবল ব্যর্থতার অদ্ভুত গুঞ্জন!
মন আমার অচিন পাখি,
কেন রাখল পুষে কবেকার প্রাচীন স্মৃতি?
ঠিক বহুকাল আগেও ছিল যেমন!

বদলে যায় পৃথিবী, বদলে যায় সময়।
শুধু আমিই ভুলে যাই কীভাবে বদলে যেতে হয়।
রয়ে যাই অনড়, দাঁড়িয়ে থাকি এক ঠায়
আঃ, আমি ভুলে যাই কীভাবে অমানুষ হতে হয়!

প্রথম প্রকাশঃ ২০০৬

রাত একটা বেজে একত্রিশ মিনিট

রাস্তায় পা দিতেই আকাশের এমাথা-ওমাথা ফালা ফালা করে বিদ্যুৎ চমকে গেল।

নিশুতি এই রাতে লোকজন বেশি থাকার কথা না। অভ্যাসমতো জয়নুল কব্জি ঘুরিয়ে ঘড়ির রেডিয়াম ডায়ালে ছোটো কাঁটাটা কোথায় আছে দেখার চেষ্টা করল। ভারী কাচের চশমাটা একটু আগুপিছু করে দেখে বুঝল ঘড়িটা বন্ধ হয়ে আছে। কীভাবে বন্ধ হলো? সেদিনই না সাতমসজিদ রোডের মাথায় টাইম সিরিজ ঘড়ির দোকানে ঘড়িটা সারিয়ে আনল সাড়ে বারশ টাকা দিয়ে? মেকানিক ছেলেটা খুব দাঁত কেলিয়ে বললো, স্যার নিয়া যান, এক্কেরে নতুনের লাহান কইরা দিসি। এই তার নমুনা! ছেলেটা তাঁরই ছাত্র, ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। দুনিয়া জোচ্চোরে ভরে গেছে একেবারে।

রাত দেড়টা দেখাচ্ছে। রাত দেড়টা? কীভাবে? একটু আগেই না বের হলেন? বিপত্নীক জয়নুল আহসান নিজের অসামাজিক খোলস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন বন্ধু নিয়াজের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। আসলে নিমন্ত্রণ নয়, বন্ধুপত্নীর আত্নীয়াকে দেখানোই উদ্দেশ্য। বড়ো বিরক্ত হয়েছিল জয়নুল। কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারে নাই। রিমির অকালমৃত্যুর পর একরকম নিজেই দুটো চাল-ডাল ফুটিয়ে খান হাত পুড়িয়ে। ভালো-মন্দ তেমন খাওয়া হয় না। তাই ভিতরে ভিতরে চটে গেলেও ওরকম এলাহি আয়োজনে হাসি-হাসি মুখেই বসেছিলেন। ওদের হাত থেকে ছাড়া পেতে পেতে রাত একটা বেজে গেছিল। সাতমসজিদ রোড ধরে মাত্র পাঁচ মিনিট হেঁটেছেন। তাহলে দেড়টা হবে কেন? ঘড়িটা কি আগে থেকেই বন্ধ ছিল?

হঠাৎ ভীষণ ধন্দে পড়ে গেলেন। পিছনের ঘটনাগুলি মনে করতে গিয়ে সব যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছে। কিছুতেই মনে করতে পারছেন না। অথচ ছোটোখাটো ব্যাপারগুলি উনি খুবই মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করে থাকেন। নোটও লিখে রাখেন। মনে পড়ছে বিয়ের কিছুদিন পর রিমির সাথে তাঁর বিরাট মনোমালিন্য এই নোট নিয়ে। বাসর রাতের পর নোটে লিখে রেখেছিলেন, ঈষৎ নাসিকাগর্জন সমস্যার কারণ হতে পারে যদিও নাকটা বাঁশির মতো আর পর্বতযুগলে সিমেট্রি নাই তেমন ইত্যাদি!

অনেক বছর আগের কথা মনে করে হেসে ফেলেও গম্ভীর হয়ে গেলেন। কিছু স্মৃতি বোধহয় কোনো দিনই ফিকে হয়ে যাবে না। রিমিকে ভোলা অসম্ভব প্রায়! ঠিক তখনই খেয়াল করলেন ধূলির এক প্রকারের ঝড় উঠেছে। বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ভাগ্যিস ছাতাটা সঙ্গে করে দিয়েছে ভাবি। এই তো ছাতার কথাটা দিব্যি মনে করতে পারছেন। ঘড়িটা কেন মনে করতে পারছেন না?

প্রবল বেগে বৃষ্টি শুরু হলো। বাংলা কী মাস এটা? আশ্বিন নাকি ভাদ্র? আবার দ্বন্দ্ব লেগে গেল। যেটাই হোক, এরকম ঘোর বর্ষা তো হওয়ার কথা না। ছাতাটা পুরোনোই বটে। ছাতার ফ্যাঁকাসে মেটে রঙের জীর্ণ কাপড়ের মধ্য দিয়ে চুইয়ে পড়া বৃষ্টির কণা চশমার কাচে দিব্যি জমে যাচ্ছে। বাইরে মোটামুটি তাণ্ডব শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রবল ঝড়ে গাছের মাথাগুলি যেন আছড়ে আছড়ে পড়ছে। বিপজ্জনকভাবে দুলছে। ও কী, ভেঙে পড়বে নাকি? ছাতার বাঁট শক্ত করে ধরে রাখতে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, যেকোনো সময়ে ছাতাটা উড়েই যাবে।

রিমি মারা যাবার পর ইশ্বরে আর বিশ্বাস নেই জয়নুলের। বহুদিন প্রাকটিস করেন না। অথচ নিতান্ত অভ্যস্ততায় দোয়া ইউনুস বিড়বিড় করে পড়তে শুরু করলেন। চূড়ান্ত অন্যমনস্ক বলে বিপরীত দিক থেকে আসা অটোটা ঠিক খেয়াল করলেন না।

ঘ্যাচাং করে থেমে গেল অটোটা। সাথে একটা অশ্রাব্য খিস্তি। আর একটু হলে মাড়িয়ে দিচ্ছিল আর কি!

কৌতূহলে ছাতাটা কাত করে দেখলেন অমাবস্যার মতো কালো বদখত একটা লোক মাথাটা বাড়িয়ে গালির তুবড়ি ছুটিয়েছে। দোষটা তাঁরই। কোন্‌ বদ খেয়ালে রাস্তার মাঝ দিয়ে হাঁটছিলেন, কে জানে? জয়নুল কিছু বলেন না। শুধু মাথাটা নাড়িয়ে পাশের ফুটপাথে উঠে গেলেন। তখনই দেখতে পেলেন নেমে যাওয়া যাত্রীকে।

মিস রোজি। এক ঝলক দেখেই হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলেন। এইসব সঙ্গ যথাসম্ভব পরিত্যাজ্য। কথাও বলতে চান না তিনি।

ফুটপাথের জায়গায় জায়গায় পানি জমে গেছে। ঝড়জলের রাতে ভিজে চুপসে যাওয়া হাজার পঞ্চাশ টাকা পঁচাত্তর পয়সার বাটা ছপ ছপ ছপ ছপ একটানা শব্দ তুলেছে। বামে মোড় নিলেন জয়নুল। রাস্তাটায় গাঢ় অন্ধকার এমনিতেই থাকে। রাতের বাতিগুলো অধিকাংশই নষ্ট। ঝড়ে অনিবার্য লোডশেডিং -এ আরও নিকষকালো হয়েছে আঁধার। হঠাৎ শুনতে পেলেন আরও একজোড়া পায়ের শব্দ দ্রুত তাঁর দিকে ধাবমান। কেউ কি দৌড়ে আসছে তাঁর দিকে? এ কী বিপদ?

কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা খিলখিল হাসি ছাতার নিচে চলে এলো।

স্যার, আমারে দেইখা পলাইলেন ক্যান? আমি কি বাঘ না ভালুক যে আপনারে খায়া ফালামু?

দামী সিল্কের শাড়ি, উগ্র প্রসাধন এবং সুগন্ধি আর দুর্বিনীত যৌবন… জয়নুলের এ মেয়েটিকে চেনারই কথা। তিনি যে পাঁচতলা বাড়িতে ভাড়া থাকেন, সেটার সবচে উপরের তলায় থাকে মেয়েটি। মিস রোজি এর নাম নয়; এই মেয়েটাকে তিনি ভালোই চেনেন কিন্তু বিচিত্র কারণে আসল নামটা মনে করতে পারছেন না।

বেশ খানিকটা উষ্মার সাথেই বললেন, মিস রোজি, তুমি আমার ছাতার নিচে এলে কেন? বেরিয়ে যাও এখনি।

মিস রোজির তাতে কোনো ভাবান্তর হলো না। বরং দ্বিগুণ হাসিতে ফেটে পড়ল। ভীষণ অস্বস্তিতে পড়লেন জয়নুল।

মিস রোজি! কী কইয়া ডাকলেন আমারে? স্যার কি আমার নাম ভুইলা গেছেন?

মধুর জলতরঙ্গ ঝড়জলের শব্দ ছাপিয়ে জয়নুলের কানে মধু ঢালতে লাগল। এ অন্যায়! নিজেকে মৃদু তিরস্কার করেন জয়নুল।

মিস রোজিই তো তোমার নাম ইদানীংকালে। ভুল বলি নাই। আর এরকম ভাষায় কথা বলবে না আমার সাথে।

কী ভাষায় কইতাছি? ওরে আমার বিশিষ্ট নাগর! (খিলখিল হাসি)

এই প্রকারের তারল্যে খুবই রুষ্ট হলেন জয়নুল।

তুমি এখনই বের হয়ে যাবে আমার ছাতার নিচে থেকে স্বেচ্ছায় নইলে…

নাহলে কী? ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবেন? দেন দেখি?

হাঁটা থামিয়ে একদৃষ্টে চেয়ে থাকলেন মেয়েটির দিকে। ঠিক তখনই আকাশ চিড়ে আলোর ঝলকানিতে একটা বাজ পড়ল। সেই আলোতে অনন্যসুন্দর মুখখানি দেখেই চকিতে নামটা মনে পড়ে গেল। রুনু – হ্যাঁ রুনুই তো নাম!

রুনু! কেন এরকম করছ? এত রাতে কোথায় গিয়েছিলে?

বহুদিনের অশ্রুত এ ডাকে মিস রোজি রূপোপজীবিনী ক্ষণকালের জন্য বিহ্বল হয়ে পড়ে। অতঃপর দ্রুত সামলে নেয় নিজেকে।

এত রাতে কোথায় গিয়েছিলাম? জানেন না কোথায় গিয়েছিলাম? আপনি বোকার মতো প্রশ্ন করছেন, স্যার।

ওহ সরি! তোমাকে ও প্রশ্নটা করা ঠিক হয় নাই। যাহোক, চলো এগুনো যাক। তাড়া আছে আমার। সময় নাই, পৌঁছাতে হবে খুব তাড়াতাড়ি।

মিস রোজি ওরফে রুনু যে প্রগলভতা নিয়ে ছাতার নিচে এসেছিল, তা নেই হয়ে গেল আলগোছে। এখন কেমন জড়সড় হয়ে হাঁটছে। দামী সিল্কের আঁচল প্রবল বর্ষণে বেশ ভিজে যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে প্রায় এক দশক আগের অনুপম ফুল রুনুর ছবিটা হঠাৎ ভেসে উঠল। কীভাবে যে সব তছনছ হয়ে গেল!

তুমি আরেকটু ভিতরে আসতে পার। ভিজে যাচ্ছ তো?

আসব? আপনার বিশিষ্টতায় দাগ পড়বে না তো? বাজারি মেয়ে হয়ে গেছি আমি! অকস্মাৎ খুব করুণ শোনাল কন্ঠটা।

জয়নুল মরমে বিদ্ধ হয়ে গেল যেন বাজারি হওয়ার পেছনে সেও দায়ী। অথচ তা তো নয়। গল্প শোনার মানুষ নয় জয়নুল। কাটখোট্টা ধরনের। তবুও একটা ইচ্ছে যেন অস্থির আঁকিবুঁকি কাটছে। অথচ অদ্ভুত একটা ভাব হচ্ছে, মনে হচ্ছে সময় বেশি নেই। গল্পটা শোনা হবে কিনা বুঝতে পারছে না।

রুনু, কীভাবে এসব হলো?

মানে জানতে চাচ্ছেন কীভাবে রুনু চৌধুরি মিস রোজি হলো? কী লাভ এসব জেনে?

লাভ হয়তো নাই, কিন্তু বিশ্বাস কর দুই বছর আগে যখন তোমাকে প্রথম আবিষ্কার করলাম মিস রোজি হিসেবে, আমার উচিত ছিল সবটুকু জানাটা। এটুকু সৌজন্য তোমার প্রাপ্য ছিল। আমি সেটুকুও দিতে পারি নাই। কী এক প্রচণ্ড অভিমানে তোমার সঙ্গ এড়িয়ে চলেছি। তোমার কাছে যে আমার ঋণের শেষ নাই!

ছি ছি জয়নুল ভাই, এসব কী বলছেন! আমি আপনাকে কোনো দয়া করি নাই। আমি যে আপনাকে চেয়েছিলাম!

রুনু!!

কী, এই এত বছর পরেও আমাকে বকবেন? যেমন বকেছিলেন প্রথম ধরা পড়ার পর।

জয়নুল অস্বস্তিতে পড়ে যায়।

স্যার, দোষ আমারই ছিল। আপনি পড়াতে এলে আমি শুধু আপনাকেই দেখতাম। কী ভীষণ মেধাবী একটা ছেলে ফিজিক্সের মতো চরম ফালতু একটা সাবজেক্ট পানির মতো বুঝিয়ে দিত! আপনার বুদ্ধিদীপ্ত স্বপ্নীল চোখ আর ক্যাবলাকান্ত হাসি… হায়, আঠারো বছরের একটা মেয়ের জন্য যে কী হতে পারে, সে বুঝার মতো মনই আপনার ছিল না।

এক্সকিউজ মি! ক্যাবলাকান্ত হাসি আবার কী? রেগে ওঠে জয়নুল।

বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই! গলিতে হাঁটুসমান পানি জমে গেছে। শো শো শব্দে আরও জোরে বাতাস ফুঁসছে। মুহুর্মুহু বাজ পড়ছে আশেপাশে কোথাও। সেরকম একটা শব্দে আরও ঘন সন্নিবেশিত হয়ে যায় রুনু জয়নুলের। রুনুর গুরুভার বক্ষের স্পর্শে চমকে ওঠে জয়নুল! বহুদিনের অনাস্বাদিত রক্তমাংসের স্বাদ বিস্মৃতির অতল গহ্বর থেকে যেন সহসাই উঠে আসে। কিন্তু জয়নুল কোনো অন্যায় সুযোগ নিতে চায় না। হোক সে হাইক্লাস রূপোপজীবিনী। প্রবল নিয়ন্ত্রণে চকিতে সরে আসে।

ও কী, ভয় পেলেন নাকি স্যার? খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে রুনু। অভাবে দেহ বেচি ঠিকই, তবে আপনাকে ফাঁদে ফেলার কোনোই অভিরুচি নাই আমার।

না, না ভুল বুঝবে না।

না, আমি ভুল বুঝি নাই। চিরকালের আদর্শবাদী! আপনাকে একটা সময় খুব ঘৃণা করতাম জানেন?

এখন করো না?

নাঃ, সে মনই তো আর নাই। সব মরে গেছে। বাবা মরে যাবার পর আমাদের অনেক সম্পত্তি বাবার ব্যবসার ঋণ চুকাতে খরচ হয়ে যায়। বাকীটা আমাদের পারিবারিক শত্রুতার জেরে সব হারিয়ে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাই। আমার পড়া আর এগোয় না। পড়াশোনায় ভালোও ছিলাম না জানেনই তো। মা আর তিন ভাইবোন নিয়ে আমরা ছোটো একটা ভাড়া বাড়িতে উঠে যাই অন্য শহরে। সামান্য সঞ্চয় ফুরিয়ে আসে দ্রুত। অতঃপর একদিন মা-ও…

আমাকে জানাও নাই কেন?

অভিমানে জানাই নাই! কী ছেলেমানুষ ছিলাম, তাই না? আপনি আমাকে প্রত্যাখান করেছিলেন। মনে আছে সে কথা? বয়সের ফারাকের দোহাই দিয়ে যা-তা বুঝিয়ে… আপনি একটা যাচ্ছেতাই। আপনি এত পাষাণ কেন?

আজ এত বছর পর এই প্রশ্নের কী উত্তর দিবে জয়নুল? চুপ হয়ে থাকে। পথ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। ভিতরে ভিতরে অদ্ভুত চঞ্চল হয়ে ওঠে জয়নুল। কীসের যেন একটা তাড়া! অভ্যাসমতো কব্জি উলটে দেখে ঘড়িটা। এখনও থেমে আছে সময়।

রাস্তায় খানাখন্দ আগেই ছিল। এই আকস্মিক প্লাবনে সেগুলির ঠাহর করা মুশকিলই বটে! তারই একটাতে এই ঝড়জলের দুর্যোগে পড়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু না। হলোও তাই। কিন্তু সিনেমার মতো মেয়েটা পড়ল না। পড়ল জয়নুল।

ছাতাটা উলটে ভেসে গেল। কোনোমতে জয়নুলকে ধরে রেখে পানিতে পড়ে যাবার হাত থেকে বাঁচালো রুনু।

এবার কোমরটা ছাড়লে ভালো হয়। খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে রুনু।

অপ্রস্তুত জয়নুল তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিতে যায়। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে আরও জোরে চেপে ধরে।

অঝোর ধারায় ঝরে যাচ্ছে বাদল। রুনুর সিল্ক ভিজে একশা। লেপ্টে রয়েছে শরীরে। জয়নুলের চোখে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। অদ্ভুত পরিবেশ – অদ্ভুত সময় – অদ্ভুত যোগাযোগ! দুটি ঠোঁট কখন যে কী আজন্মের উত্তর খুঁজতে থাকে, কেউ জানে না। বুঝতে পারে না। দুর্যোগের ঘনঘটা ভিতরে এবং বাইরে। জয়নুলের সব প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে গেল।

ধাতস্থ হলে দুজন ছিটকে যায় দুদিকে। কিন্তু পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। এ কি ক্ষণকালের মোহ নাকি বহুকাল আগের অবহেলিত অস্বীকারী দুর্নিবার আকাংখা? দুটি হাত কেমন চিরচেনা আশ্বাসে গভীর আশ্লেষে পরস্পর ডুবে থাকে।

গন্তব্য কাছে আসতে থাকলে জয়নুলকে বেশ আন্দোলিত দেখায়। পাঁচতলা দালানের সামনে এসে থেমে পড়ে। কড়াৎ শব্দে একটা বাজ কাছে কোথাও পড়ে। ঝটিতি হাত ছেড়ে দেয় জয়নুল।

প্রবল দুঃখভরে রুনু বলে, ওঃ, বুঝতে পেরেছি। ভুলেই গিয়েছিলাম আমার সীমানা!

জয়নুলের বুকটা হাহাকার করে ওঠে। তাড়াতাড়ি রুনুর হাত দুটো নিজের বুকে চেপে ধরে। রুনু, ভুল বুঝো না! আমি তোমার উপরে অন্যায় করেছিলাম। সব বুঝেও তোমাকে প্রত্যাখান করেছিলাম অথচ তুমি তোমার সর্বস্ব দিয়ে আমাকে চেয়েছিলে। সব সঞ্চয় দিয়ে আমার পড়ার খরচও যুগিয়েছিলে। কেন করেছিলে? কেন, কেন? শোনো রুনু, সময় আর বেশি নাই। সত্যটা বলে যাই। আমি তোমাকে… রুনু জয়নুলের মুখে হাত রাখে।

বলতে হবে না, আমি জানি এবং বরাবরই জেনে এসেছি।

হঠাৎ জয়নুলকে বেশ শান্ত দেখায়। যত অস্বস্তি এবং দ্বন্দ্ব ছিল সব মিলিয়ে গেল কর্পূরের মতো। সব পরিষ্কার লাগছে এখন।

গেটের কাছে মাথা ঢুকিয়ে রুনু জয়নুলকেও ডাকে ভিতরে। কিন্তু জয়নুল নড়েন না।

তুমি যাও, রুনু। আর হয়তো দেখা হবে না! বিড়বিড় করে বলেন জয়নুল।

শেষ কথাগুলো শুনতে পায় না রুনু। যদি শুনতে পেত তাহলে দেখতে পেত যুগপৎ আনন্দ এবং বিষাদ নিয়ে কী অপার্থিব ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছেন জয়নুল!

অভ্যাসবশত কব্জি উলটে দেখে রেডিয়াম ডায়ালে মিনিটের কাঁটাটা এক মিনিট এগিয়েছে। একটা বেজে একত্রিশ মিনিট। জয়নুলের মুখে পরিতৃপ্তির হাসি।

একতলায় জটলা দেখে সামনে গিয়ে চিৎকার করে ওঠে মিস রোজি। সিভিয়ার হার্টএটাকে এইমাত্র মারা গেছেন অধ্যাপক জয়নুল আহসান। দেয়াল ঘড়িতে একটা বেজে একত্রিশ মিনিট।

☼ সমাপ্ত ☼

তোমাকে চাই!

আমি যাহারে চাই কাছে খুব কাছে
পাই না তাহারে, সে যে রয় দূরে বহুদূরে।
এই নিরল বিরল নিঝুম বরিষণে
আহা, কোথায় পাই তাহারে?
আহারে, সুখহীন নিশিদিন এই হৃদমাঝারে
তাহারে চাই, কেমনে পাই?
এ মন যে হায় আর মানে না রে!
আহারে, চাই তাহারে এই বুকের পরে
চেয়ে থাক সেই দুটি চোখ পরম নিষ্পলক,
নিশ্চুপ অলক মেঘভার উচ্ছ্বাসে।
আহারে, এই ব্যাকুল ঝরা রোদনে
কে আসে, অধর রাখে চাতকের ব্যথিত বেদনে?