তুমি আমার

তুমি আমার।
এর থেকে বড়ো কথা আর কখনও লেখা হয়নি!
তুমি আছো এই হৃদয়ের মণিকোঠায়।
এর থেকে সুরম্য আবাস আর কেউ গড়েনি!
তুমি আমার নিঃশ্বাসে পরম বিশ্বাসে।
এর থেকে নির্মল হাওয়া আর বয়নি কখনও।
তুমি আমার চোখের জলরেখা – আনন্দ এবং বিষাদে।
এর থেকে গভীর নদী আর জন্মেনি কোনোকালেও।
তুমি আমার প্রাণ – আমার বেরঙিন জীবনে
একমুঠো রঙের বান।
এর থেকে বড়ো সত্য আর কখনও হয়নি!
তুমি আমার, শুধু আমার।
এর থেকে বড়ো কবিতা আসলেই কেউ লিখেনি!

কাকে বলি?

কাকে বলি?
কেউ নেই শোনার।
প্রতিদিন যে একটু একটু করে মরে যাচ্ছি!
নিত্যদিন একই নামচা –
কেবলই আসে যায়, আহা!
একঘেয়ে প্রভাত, রোদনভরা আকাশ
এবং রংজ্বলা সায়াহ্নের সন্ন্যাস…
আর এক গুচ্ছ হৃদয়হীনতার
অগভীর ক্লেদাক্ত স্পর্শ!
ভেতরে ভেতরে কী যে ভীষণ ক্ষয়ে যাচ্ছি
কেউ নেই দেখার!
শুধুই কান্তিহীন অমোঘ রাত্র –
মেকি সুখে কী ভীষণ
অভিমানী বিমর্ষ!

ইয়ু আর নট মাই টাইপ!

ছুটির সকালে ঘুমের মধ্যেই কেতলির শনশন শব্দটা শুনতে পায় রুপন্তী। একরকম অভ্যাস হয়ে গেছে। নভেম্বরের শুরুতে শীত জেঁকে বসছে ধীরে ধীরে। বেলা বয়ে গেলেও ঝিমঝিম আলস্যে লেপটা আবার মুড়ি দেয়। কিন্তু বরাবরের মতো কফির সুঘ্রাণটা তো আসছে না। অনীশ কি এখনও ওঠে নাই? এ হতেই পারে না!
জানালার ভারী পর্দা সরানো হয়েছে আগেই। ঝকঝকে কাচ ভেদ করে সূর্যের নরম রোদ এসে পড়ে রুপন্তীর চোখের পাতায়। উঃ, এই ভোরে-ওঠা অনীশটাকে নিয়ে আর পারা গেল না! ছুটির দিনেও সে নিয়ম ভাঙবে না। তাহলে আর ছুটির দিনের দরকারটা কী?
গজগজ করতে করতে চোখ কচলাতে কচলাতে রুপন্তী দাঁত মাজতে থাকে। আয়নায় দেখতে থাকে নিজেকে। মধ্যবিশের সমস্ত রূপ রুপন্তী নামের সার্থকতা নির্লজ্জ প্রতিবিম্বে প্রকাশ করছে দ্বিধাহীন। ঈষৎ বাদামি এলোমেলো চুলেও কী অদ্ভুত কমনীয়তা প্রকাশ পাচ্ছে! সেদিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে রুপন্তী। নার্সিসাসের মতো নিজের দিকে তাকিয়ে থাকার কোনোই ইচ্ছা তার নেই এখন। পেটে ছুঁচো ডন দিচ্ছে।
তারপর গলাটাকে যথাসম্ভব বাজখাঁই করে, এই অনীশ, কই তুই?
এই অযথা হাঁকডাকের আসলে কোনো মানে নেই। ব্যস্ত নগরীর কেন্দ্রে এই একবেডের ছোট্ট ছিমছাম ফ্লাটে আর কোথায় থাকতে পারে অনীশ নামের ছেলেটা?
রান্নাঘরে উঁকি মেরে দেখে সব টিপটপ অবস্থায় আছে। রুপন্তী যতটা অগোছালো অনীশ ঠিক ততটাই সুসংহত। কাবাডে রাখা চা-চিনি মশলাপাতি সবকিছুর লেবেল আছে। ভাবা যায়?
বার্নারে অবশ্য কেতলিটা আছে। হাত দিয়ে দেখে হালকা গরম। তার মানে অনীশ কফি বানিয়ে খেয়েছে কিন্তু ওকে ডাকেনি! তার পাশে কিচেন কাউন্টারে একটা সুদৃশ্য নিখুঁত পরিষ্কার মাগ রাখা আর একটা রেডিকফির স্যাশে। গতবছর এইদিনে অনীশ ওকে দিয়েছিল।
মাগটা হাতে নেয় রুপন্তী। লাল আর মেটে হলুদে নকশা করে লেখা ইয়ু আর মাইন! সেদিকে তাকিয়ে অজান্তেই বলে ওঠে, সিলি বয়!
মাগটা পেয়েই ভাঙতে ইচ্ছে হয়েছিল। এ যে স্পষ্টত চুক্তির বরখেলাপ। কোনো আবেগকে পাত্তা দেবে না, শুধু চাহিদা মেটানো যেতে পারে। তাছাড়া ইয়োরোপের মহার্ঘ এই শহরে খানিকটা সুবিধাও হয়। পারস্পরিক লাভের ব্যাপার স্রেফ। এমনই ছিল বোঝাপড়া! সেটা জানাতেই হেসে উঠেছিল অনীশ।
আরে এত ক্ষেপে যাচ্ছিস কেন? হঠাৎ দেখে ভালো লেগে গিয়েছে তাই কিনে নিয়ে এসেছি। নিশ্চিত থাক, আর যাই করি তোকে ওকথা বলব না কখনও। ইয়ু আর নট মাই টাইপ!
যদিও মাছি তাড়াবার ভঙ্গীতে অনীশের শ্লেষমাখা বাক্যটা হাত দিয়ে সরিয়ে দিয়েছিল, তবুও ঠিক কোথায় যেন বড্ড বিঁধে গিয়েছিল শব্দগুলি! সেকথা নিজেও হয়তো স্বীকার করেনি কখনও। শুধু চোখ নাচিয়ে বলেছিল – তোর টাইপটা কী?
আর যাই হোক, অবশ্যই তোর মতো অগোছালো উড়নচন্ডী কেউ না!
যা যা, ম্যালা বকেছিস! কফি বানিয়ে আন।
অদ্ভুত ভঙ্গীতে হাসতে থাকে অনীশ। সেটা মোটেও ভালো লাগেনি রুপন্তীর।
মাগটা হাতে নিয়েই এসব অবান্তর জিনিস মনে পড়ে যায় ওর। এসবের চক্করে খেয়ালই করেনি ভিতরে একটা চিরকুট রাখা আছে। এসমস্ত নাটকীয়তা একদমই পছন্দ না। কিছুটা বিরক্ত হয়েই খুলে পড়ে চিরকুটটা। তাতে বড়ো বড়ো করে লেখা –
আমাকে খুঁজিস না!
প্রচণ্ড রাগ হয়ে যায়। এমনিতে বেলা হয়েছে। ক্ষুধাও লেগেছে অনেক। ব্রেকফাস্ট তৈরি করে নাই। তার উপরে এমন নাটকীয়তা! নিকুচি করি তোর নাটকের। আমাকে খুঁজিস না – তোকে কে খুঁজে, বলদ? গোল্লায় যা।
চুলা জ্বালিয়ে কেতলির পানি গরম করতে থাকে। টোস্টারে দুটো ব্রাউন ব্রেড ফেলে দিয়ে কফির স্যাশেটা খুলে মাগে ঢালে। প্যান চাপিয়ে গরম করে একটা ডিম ভেঙে দেয়। একটু নুন একটু গোলমরিচের গুঁড়ো। তিনবছর ধরে এখানে ওঠার পর এই কাজগুলি অনীশই সামলেছে। আজকে বেকুবটার নাটকের জন্য করতে হচ্ছে ভাবতে থাকে।
টোস্টে মাখন মাখিয়ে কামড় দিতে গিয়ে মনে হলো, অনীশ খেয়েছে তো? বুকের ভিতর একটা অদ্ভুত উথালপাথাল। কোনো মানে হয় এর?
খুব ভোরে বরাবরের মতো অনীশের ঘুম ভাঙে কাঁধের কাছে ঘুমানোর হালকা শব্দে। রুপ জড়িয়ে আছে ওকে। ঘুমিয়ে থাকলে মাঝেমাঝে এই কাজটা করে মেয়েটা অথচ এই অন্তরঙ্গতা কখনও দেখায় না এমনকি মিলনের চরম মুহূর্তগুলিতেও নয়। অনীশ ঠিক বুঝেও নাগাল পায় না এই মেয়েটির। কেমন যেন দুর্বোধ্য প্রহেলিকাময়।
কানের কাছে চূর্ণ চুলের গোছা সরিয়ে দিয়ে মুখটাকে যেন আরও গভীর থেকে গভীরে বসিয়ে নেয়। রুপের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে সরিয়ে সেখানে একটা বালিশ রেখে দিলো। লেপটা ঠিকভাবে গুঁজে দেয়। আর যে সময় বেশি নেই। মনস্থির করে ফেলেছে সে।
জানালার পর্দা হালকা সরিয়ে দেয়। বাইরে নভেম্বরের বিমর্ষ প্রভাত। বিষন্নতা নিজের ভিতরেও কম না! ঘুম ভেঙে নিশ্চয়ই চটে যাবে। অনেক খিস্তি দেবে। সে ভেবেই মুচকি হেসে ফেলে অনীশ।
চটপট একটা ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে ফেলে। নেবার অবশ্য তেমন কিছু নেই। এই ফ্লাট মূলত রুপন্তীর। মধ্যবিত্তের সন্তান অনীশের কাছে এমন ঝা চকচকে ফ্লাটে থাকার মতো স্বচ্ছলতা কোনোকালেই ছিল না। কাপড় অনুযায়ী কোট বানাও – এই প্রবাদবাক্য মনে থাকলেও যখন রূপন্তীর মতো বিত্তশালীর প্রগলভ কন্যা একত্রে থাকার প্রস্তাব দেয়, তখন না বলতে পারে নাই কোনো এক অব্যখ্যেয় কারণে।
দুজনেই ভালো ছাত্র। একই ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুবাদে পরিচয় এবং বন্ধুত্ব। রুপন্তী চটপটে, উদার আর অত্যন্ত প্রগতিশীল চিন্তা-ভাবনা ধারণ করে। প্রেম-পরিণয়-পরিবার-সমাজ নিয়ে তার প্রথাবিরোধী কথা চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে ফেলল অনীশকে। মধ্যবিত্তের সহজাত আরামপ্রদ অবস্থানে থাকার প্রবণতা থেকে তারও উত্তরণ ঘটেছে ততদিনে। মধ্যবিত্তের সংকোচ আর টানাপোড়েনকে ভালোচোখে দেখে নাই কোনোকালেই। ভেতরে ভেতরে নর্ম ভাঙার বিদ্রোহ জ্বলছে তখন। আর তখনই ইয়োরোপে পড়তে এসে রুপন্তীর সান্নিধ্য ওকেও প্রথা ভাঙার স্বপ্ন দেখায়। আর কে না জানে থিতু সবকিছু ভাঙতেই তারুণ্যের প্রকৃত আনন্দ!
পুরোনো কথা ভাবতেই ভাবতেই কেতলিতে জল চাপায় অনীশ। কাবাড থেকে নিজের মাগটা নিতে গিয়ে দেখে এককোণে অবহেলায় পড়ে আছে ওরই দেয়া লাল-মেটেহলুদের মাগটা। ওখানে লেখা – ইয়ু আর মাইন! আশ্চর্য, কেইবা কার? কবে ছিল?
একটা চিরকুটে খসখস করে কটা শব্দ লিখে মাগটার ভিতরে গুঁজে দেয়। ভোরের ম্লান আলোয় সবকিছু কেমন বড্ড আপন বলে বিভ্রম হতে থাকে। অথচ সত্যটা তো ও জানে। যার জন্য এইসব ভাবনা, তার কাছে এসব ভাবালুতার বিন্দুমাত্র মূল্য নেই!
ফোল্ডিং বাইকটা বের করে অনীশ।
টোস্টে কামড় দিয়ে এমন বিস্বাদ জীবনে পেয়েছে কিনা ঠাহর করতে পারে না রুপন্তী। ডিমপোজটাও ভালো লাগল না। অল্প একটু মুখে দিয়ে আর খেতে পারল না। ভিতরে ভিতরে অদ্ভুত একটা উৎকণ্ঠা জেঁকে বসছে। খুব গভীরে কেউ ভাবছে, কোথায় গেল ছেলেটা এই সাতসকালে?
কফিটা নিয়ে বেডরুমে এসে অনীশের ওয়ার্ডরোবটা ঝট করে খুলে ফেলল। কী সুন্দর অতিমানবীয় যত্নে সব কিছু সাজানো। কোথাও এতটুকু ওলটপালট নেই! অনীশের এটা যে বাড়াবাড়ি, সেটা বলে বলে ক্লান্ত। নিজেরটার কথা ভেবে হেসে ফেলল রুপ। হঠাৎ অসংগতিটা চোখে পড়াতে হাসিটা মিলিয়ে যেতে সময় লাগল না। শুধু তার অনীশকে দেয়া কাপড়চোপড়ই সুন্দর করে থরে থরে সাজানো। ওর নিজেরগুলি নেই! একটাও নেই।
দৌড়ে চলে আসে পড়ার ডেস্কে যেখানে অনীশই বেশি সময় কাটাত। ডেস্কের লাগোয়া বইয়ের তাকে দ্রুত চোখ বুলিয়ে দেখে যা ভেবেছে তাই-ই। অনীশের বইগুলি নেই। তখন হঠাৎ করে মনে হলো মাসখানেক আগে অনীশকে একটা বড়ো বাক্স প্যাক করতে দেখেছিল। ব্যক্তিস্বাধীনতা চর্চার চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে জানতেও চায়নি কী, কোথায় পাঠাচ্ছে? নাকি প্রচ্ছন্ন অবহেলা দেখিয়ে ফেলেছিল? আজকে আর নিশ্চিত হতে পারে না। কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে সব।
আর সহ্য করতে না পেরে মুঠোফোনটা নিয়ে অনীশের নাম্বারে ডায়াল করে যেটা অনেক আগেই হয়তো করা উচিত ছিল।
সাইকেলের লেন ধরে বাইক চালিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে অনীশ। সকালটা অদ্ভুত নিঃশব্দ জনমানবহীন ঠাসবুনোটের এই শহরে। যদিও মনটা ভারাক্রান্ত তবুও একটু একটু ভালোও লাগতে থাকে। সেটা হয়তো আত্মসম্মান কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধারের স্বস্তিতে। নেমে পড়ে। বাইকটাকে ভাঁজ করে রেখে পায়ে হেঁটে পৌঁছে যায় ঈপ্সিত গন্তব্যে।
ছুটির দিন বলে কোথাও কেউ নেই। একটা ফাঁকা বেঞ্চে বসে পড়ে সে। সামনে টেমস নদীর ছোট্ট একটা শাখা। ম্যারিনা। হালকা বাতাস বইছে। কাছেই কতগুলো ছোটো ছোটো সুদৃশ্য নৌকা বাঁধা আছে। দূরে উড়ে যাচ্ছে কটা নাম না-জানা পাখি। এই শান্ত সমাহিত পরিবেশটা বরাবরই অনীশকে টানে। বিক্ষিপ্ত ভাবনাগুলোর রাশ টেনে ধরতে সে মাঝেমাঝেই চলে আসে এখানে। রুপকে অনেকদিন সেধেছে কিন্তু সে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায়নি! সেটা নাকি যুগলেরা করে। ওরা কি কোনো অর্থেই যুগল নয়? ধুর, কীসব ভাবছে! স্পষ্টতই নয়।
গভীর ভাবনায় ডুবে যায় অনীশ। পুরো ব্যাপারটাকে আবার গোড়া থেকে ভাবতে হবে। রুপের সাথে একসাথে ওঠাটা বোধহয় ঝোঁকের বশে করা হয়েছে। মধ্যবিত্তের কিছু সংস্কার থাকে, সেগুলির শেকড় এত গভীরে থাকে যে উপড়ে ফেলাটা বোধহয় অসম্ভবের নামান্তর। আর এক ধরনের অমোচ্য হীনম্মন্যতা তো আছেই। রুপ কি ওকে করুণা করেছিল? আজ এতদিন পর অস্বস্তিকর এই প্রশ্নটা বড়ো খোঁচাতে থাকে।
ভাবনার শান্ত জলে ঢিল পড়ল একটা অনুপম কিন্নরকন্ঠে।
নীশ, তুমি এখানে? রিনিতা ওরফে রিনের চোখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি।
রিনের পরনে একখানা গোলাপি-সাদা ট্রাকসুট; অসামান্য সুন্দর দেহবল্লরির বাঁক-ভাঁজে এমনভাবে সেঁটে থেকে যৌবনের জয়গান গাইছে যে অনীশ ক্ষণকাল হতবিহ্বল হয়ে যায়। তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নেয়। অযাচিত প্রশংসার এই অভিঘাত রিন ঠিকই বুঝে নেয়। একটা অদ্ভুত মাদকী হাসি ওর ঠোঁটে।
জগিং করতে বেরিয়েছিলাম। কিন্তু তুমি যে আমার জন্য এখানে বসে থাকবে ভাবিনি মোটেও!
আমি মোটেও আপনার জন্য এখানে বসে নেই! মনটা হালকা করতে এসেছি। আপনার কোনো সমস্যা?
অনীশের কন্ঠে বন্ধুত্ব নেই মোটেও, কিন্তু সেটাকে ঠিক আমলে নিলো না রিন এইসময়ে। বছর পাঁচেকের অনুজ এই ছেলেটাকে প্রথম দেখাতেই তাঁর ভীষণ পছন্দ হয়ে যায় রুপের একটা পার্টিতে। একটা অদম্য শরীরী আকাংখা সে থেকেই প্রচ্ছন্নে লালন করে চলছে। অথচ অনীশ বরাবরই সযত্নে এড়িয়ে গেছে। কী নেই তার যা ঐ রুপন্তী মেয়েটার আছে? বিরক্তি চেপে রিন এক গাল হেসে ফেলল।
কাউকে কীভাবে অপমান করতে হয়, কেউ শিখুক তোমার কাছে! রিন ফাঁকা বেঞ্চটায় অনীশের পাশে বসে পড়ে।
আমি কাউকে অপমান করি নাই। আপনিই যেচে অপমান গায়ে মাখছেন।
এভাবে ক্যাটক্যাট করে কথা বলছ কেন? কী হয়েছে?
আপনাকে বলার ইচ্ছে নাই। যেদিকে যাচ্ছিলেন, যান।
বিচিত্র কারণে অপমানটা এবারেও গায়ে মাখল না রিনিতা। বরং ফিক করে হেসে ফেলে বলল, ওঃ বাবা, বড়ো রেগে আছ দেখি! রাগে জ্বর এসেছে বুঝি? বলেই একটা শীতল হাত রাখে অনীশের উরুর ওপর যেন অবস্থাটা মাপতে চায়। কী যেন একটা হবার অপেক্ষায় সময়টা জমাট উৎকন্ঠায় মরছে!
অনীশ সেদিকে তাকিয়ে ভ্রূকুটি করে। কিন্তু রিনিতা মরীয়া! জ্বর দেখার ছলে অনীশের কপালে একটা হাত রাখে এবং তারপর অতর্কিতে এক জোড়া ওষ্ঠাধরের উপুর্যুপুরি আক্রমণ!
একটা কলও নীশের মুঠোফোনে গেল না। বেজে বেজে ভয়েসমেলে চলে যাচ্ছে। দিস ইজ অনীশ, কান্ট টেইক ইয়র কল রাইট নাও … …
ভয়ানক হতাশায় ফোনটাকে মেঝেতে ছুঁড়ে মারে রুপন্তী। ভাগ্যিস একটা পুরু গালিচা বিছানো ছিল নইলে ফোনটাই যেত চুরমার হয়ে।
কোথায় গেল মানুষটা এমন নিঃস্ব করে দিয়ে? কার কাছে গিয়ে খোঁজ নেয়া যায়? হঠাৎ করে খেয়াল হলো কী কমই জানে সে অনীশের সম্পর্কে। কোনোদিন আগ্রহ প্রকাশ করেনি আর অনীশও জানায়নি। আজ মনে হচ্ছে একটু বেশি জানলে কি খুব খারাপ হতো? কোনো বন্ধনে জড়াবে না, শুধু শরীরী প্রয়োজনের পাখি হয়ে থাকবে – এই মন্ত্রে বড়ো বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলেছে কি ওরা?
বিষম ভাবনার বুদ্বুদে গতরাতের ডেইটের কথা মনে হয়ে গেল! সন্ধ্যায় সাজতে সাজতে কথা হচ্ছিল অনীশের সাথে। একটা বিশেষ ডিশ রান্না করছিল সে রাতের জন্য। সে জানাতে এসে দেখল বেশ যত্ন নিয়ে সাজছে রুপন্তী। অবাক হয়ে গিয়েছিল অনীশ। কিছু একটা সে আপনাতেই বুঝে যায়।
কোথায় যাস, রুপ? আজকে তুই কোথাও যাবি না বলেছিলি!
বলেছিলাম নাকি? মনে করতে পারছি না!
মনে করতে পারছিস না? চিবিয়ে চিবিয়ে বলে অনীশ।
ডোন্ট বি সিলি, নীশ!
আই অ্যাম নট বিয়িং সিলি! আজকে একটা বিশেষ রাত। আর সুযোগ হয় কিনা! তোর পছন্দের পাম্পকিন স্যুপ রাঁধছিলাম। তুই কথা দিয়েছিলি!
একটা চটুল গান ভাঁজতে থাকে। কথাগুলো ঠিক গুরুত্ব দিয়ে শোনে না রুপ।
প্যানপ্যান করবি না তো কানের কাছে। এসব কে করতে বলেছে তোকে? আমার ফিরতে দেরি হবে। পাম্পকিন স্যুপ তুই আমারটাও খেয়ে নিস!
তুই কি ডেইটে যাচ্ছিস? আচমকা প্রশ্নবাণ অনীশের।
হ্যাঁ, কেন তোর অনুমতি লাগবে নাকি? বাঁ কানে একখানা দুল গলাতে গলাতে সে ঘুরে তাকায় অনীশের দিকে। চোখে যুগপৎ বিরক্তি এবং উষ্মা!
চোখের ভাষা এক অদ্ভুত জিনিস! কখনও কখনও চোখ ক্ষণমাত্র হলেও অনেক অপ্রকাশ্য কথা এক লহমায় বলে ফেলে। মুখে কিছু বলবার দরকারই হয় না। কী একটা ছিল অনীশের সেই চোখে, রুপন্তী স্রেফ স্তব্ধ হয়ে যায়!
সেকেন্ডের ক্ষুদ্র এক ভগ্নাংশের জন্য মাত্র! কিছু একটা ঝিলিক দিয়েই নিভে যায়। নীশ নিজেকে সংবরণ করে ফেলে।
হা হা হেসে ওঠে।
না, আমার অনুমতি লাগবে না। গুড লাক, মাই ডিয়ার ফ্রেন্ড! একটা হাগও দিবি না? অ্যাটলিস্ট আই আর্নড দ্যট!
রুপন্তী অনীশকে জড়িয়ে ধরে।
অনীশ হঠাৎ সমস্ত প্রোটোকল ভেঙে রুপন্তীর এক তাল শর্ট বব চুলে নাক ডুবিয়ে ফেলে। শব্দ করে চুলের মোলায়েম ঘ্রাণটা শ্বাস ভরে নেয়। তারপর দুর্দম বাসনায় রুপন্তীকে যেন পিষে ফেলতে চায় বুকের পরে। পরস্পরের শরীর অজানা নয় কারোরই। তবুও রুপন্তীর মনে হয়, এ সম্পূর্নই আলাদা! একদম ভিন্নতর অনুভূতি! কী নাম এই মনে হওয়াটার?
যেমন অকস্মাৎ টেনে নিয়েছিল তেমনি অকস্মাৎ ছেড়েও দেয়। তারপর নিষ্কম্পচোখে,
ভয় নেই! ইয়ু আর নট মাই টাইপ, রুপ!
বরাবরের মতো শব্দগুলি অজানা সম্ভাবনার হাতছানিতে গিয়ে বিঁধে যায়। বিরক্ত মুখে, তোর টাইপটা কী?
যা যা, যার বাহুলগ্না হতে যাচ্ছিস যা, মাথাটা খাবি না বললাম। অনীশ হাসতে থাকে।
ইটস নট ফানি অ্যাট অল!
ভাবনার জাল ছড়িয়ে রুপন্তী ফিরে আসে বাস্তবে। অনীশ গেল কোথায়? কোথায় যেতে পারে? কোন্‌ জায়গায় ও সবসময় যেতে চায়?
ঘটনার আকস্মিকতায় বিমূঢ় অনীশ। অতি দ্রুত ঘটে গেল সব। নির্জন সেই নদী-তীরে কারও গভীর আশ্লেষের আগ্রাসি চুম্বন থোড়াই কেয়ার করছে গ্রহীতার ইচ্ছে-অনিচ্ছে! একটানে ছাড়িয়ে নিয়ে হাঁফাতে থাকে। তখনই খেয়াল হয় অদূরেই অবিশ্বাসী চোখে তাকিয়ে আছে রুপ। কোনো জোরালো যুক্তি নেই, তবুও অজানা এক অপরাধবোধে রিনকে ভস্ম করে দিতে চায়।
রুপন্তী জায়গাটা ঠিকই চিনত। অনেক শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল একপ্রকার। হঠাৎ মনে হয়েছিল সে হয়তো ওখানেই গিয়ে থাকবে। কী নাম দেবে এই অদ্ভুত এই সংযোগের সে জানে না। দিশেহারা হয়ে খড়কুটো ধরার মতো এসেছিল এখানে। আর এসেই দেখা মিলল এই অন্তরঙ্গ মুহূর্তের। আর সময়টাও কেউ দেখুক! প্রকৃতির মতো ক্রূর রসিকতা কেউ জানে না বোধহয়!
সারারাস্তা কত কী ভেবে এসেছে রুপন্তী। দেখা পেলে কীভাবে গাধাটার কান ছিঁড়ে হাতে নেবে… কত বড়ো দুঃসাহস! ওকে না বলে চলে যাওয়া? এই অধিকারবোধটুকু ঠিক কোথা হতে আসছে, ঠাহর হয় না ওর। শুধু খুব গভীরে একটা দৃপ্ত ঝিমঝিমে উপলব্ধি প্রবল অস্বীকারের সাথে এক্কাদোক্কা খেলছে! এ কী হলো ওর? সংসক্তিহীন সম্পর্কের সদর্প ওকালতি করা রুপের বুকে এ কীসের সংকেত? এই কি ভালোবাসা? কিন্তু নীশ বলেছে সে ওর টাইপ নয়? তাহলে কি নীশই ওর টাইপ একপাক্ষিকভাবে? নাঃ, এ হতে পারে না!
রুপন্তী আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না! সমস্ত বোধবুদ্ধি যুক্তিতর্কের বাইরে গিয়ে চূড়ান্ত বিদ্রোহী বুকটা কী একটা খুইয়ে ফেলার শোকে মূহ্যমান হয়ে যায়। নিজেকে বারবার বুঝাতে থাকে অনীশের ভালোলাগা থাকতেই পারে। সে যেমন গতকাল গিয়েছিল অন্যত্র সংসক্তির একঘেয়ে সুতো ছিঁড়তে, তেমনি অনীশও চাইতেই পারে। এতে কোনো অন্যায় নেই। কিন্তু মনে যে মানছে না; কোথা থেকে একরাশ জলের তোড় ওর ডাগর দুই চোখে বাঁধভাঙা প্লাবনের মতো চলে এল! এই লজ্জা কই রাখে সে?
কাঁধের কাছটায় সাদা টিশার্ট ভিজে যাচ্ছে কাজল মেশানো চোখের জলে। ঘুম ভেঙে যায় অনীশের। অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে রুপ ফুলে ফুলে কাঁদছে! এমন আঁকড়ে ধরা আলিঙ্গন আর দেখেনি সে! গতরাতে সে ফিরেছে মধ্যরাতের কিছু আগেই। এসেই কাপড় না ছেড়েই শুয়ে ঘুম। পাম্পকিন স্যুপের কথা অনীশ আর তোলেনি অভিমানে। এখন এইরকম ফুলে ফুলে কাঁদছে! বড্ড মায়া হয় ওর জন্য। কানের পাশে চুলের গোছা সরিয়ে দেয় একটুখানি।
এই রুপ, কী হয়েছে তোর? কাঁদছিস কেন? আলতো শুধায় অনীশ।
চোখ মেলে আরও শক্ত বাহুডোরে বেঁধে ফেলে। খানিকটা স্বপ্নঘোর এখনও ওর গলায়।
বল্‌, তুই চলে যাবি না? রিনের কাছে যাবি না আমাকে ফেলে!
এখানে রিন আবার আসছে কোথায়? আর গেলামইবা কখন? অনীশের বিস্ময়ের সীমা থাকে না!
রুপ বুঝতে পারে একটা দুঃস্বপ্নই দেখেছে সে। নীশ কোথায় যায়নি! এই তো হাত বাড়ালেই ওকে পাওয়া যাচ্ছে। একটা পরম নির্ভরতায় নীশের বুকে মুখ ঘষে সে। এই ভাবালুতা আগে কখনও দেখা যায়নি! এই মেয়েটা এত দুর্বোধ্য কেন?
ঘুমজড়ানো গলায় সে অনীশকে জিজ্ঞেস করে, আচ্ছা তোর টাইপটা কী?
কীসের টাইপ?
এই যে আমাকে সবসময় বলিস আমি তোর টাইপের নই, অনীশ? রিনিতা কি তোর টাইপের?
অনীশ কিছু বলে না এই ঈর্ষামিশ্রিত প্রশ্নের উত্তরে। শুধু একগাল হেসে বলে, আমার প্রেমে পড়ে গেলি নাকি?
তুই বুঝি পড়িস নাই, ডুবে ডুবে জল খাস, শয়তান!
বাট রুপ, ইয়ু আর নট মাই টাইপ!
কী!!
দুজনেই হাসতে থাকে না-বলা একটা বোঝাপড়ার উপলব্ধিতে।
ছুটির সকালে চুলায় কেতলি চাপিয়েছে অনীশ। কেতলিটা শনশন করে উঠল। সাথে মোবাইলে টুপ করে একটা বার্তা পেল যে ওর পাঠানো বক্সগুলি জায়গামত পৌঁছে গেছে। বড্ড দ্বিধান্বিত দেখাল ওকে। পাখি নীড় ত্যাগের আগে যেভাবে হয়তোবা দ্বিধান্বিত থাকে!
 

আন্তর্জালিক মিছে অহং!

আজকাল কিছুই বলা বারণ

মুখে মারো তালা!
সকলই সেজেছে আজ বোদ্ধা
অন্তর্জালের তুমুল তুখোড় ভুঁইফোড় যোদ্ধা!
আজ সবাই-ই জ্ঞানী, সবই জানে,
অজানা নেই কিছুই!
ভেতরে যে মজা নদী কিংবা হাঁটু জল
কে রাখে খবর তার? ভাসাভাসা সবই।
আজ মূর্খের দাপট, হাতের ডগায় বিদ্বেষী কপট
কে হয় সাহসী? বলে দেয় তুমিই ভুল
কথায় নেই নূন্যতম যুক্তি-জ্ঞানের বহর!

ইদানীং সবাই বড্ড স্পর্শকাতর
তাই মুখে মারো তালা!
সব কথাতেই দোস্ত বেজার
উচিত কথায় মানীর মান উজাড়।
আজ সবাই একশ একাই
আহা, কমতি যে নেই কিছুই!
বলতে গেলেই ফেঁসে যাবে,
জিভের ডগায় লাগবে যুদ্ধ
আর আঙুলে পারমাণবিক মৃত্যু!

অন্তর্জালে সবাই যে আজ জিম্মি
আপন আপন অহং বৃত্তে।
কেউ বুঝে না এসবই ফাঁপা
মূল্য নেই এতটুকুও,
নিছক নির্বুদ্ধিতায় যে মাপা!
হতে গেলে সরব, নীরবতা শেখো আগে
গভীর হও – তাতেই যে সব অনুপম সৃষ্টি!

~~অনিকেত উদাসীন~~

সব বদলে যায় না!

বদলায় মানুষ, বদলায় জীবন।
বদলে যায় জীবনের বাহারি খোলস।
বদলায় ভালোবাসা, বদলায় বাঁচার টুকরো আশা।
আর বদলায় মানুষের মুখোশ!

এত কিছু বদলের ভীড়ে,
নিজেরে খুঁজি দল বদলের ব্যস্ত তীরে।
শুনি কেবল ব্যর্থতার অদ্ভুত গুঞ্জন!
মন আমার অচিন পাখি,
কেন রাখল পুষে কবেকার প্রাচীন স্মৃতি?
ঠিক বহুকাল আগেও ছিল যেমন!

বদলে যায় পৃথিবী, বদলে যায় সময়।
শুধু আমিই ভুলে যাই কীভাবে বদলে যেতে হয়।
রয়ে যাই অনড়, দাঁড়িয়ে থাকি এক ঠায়
আঃ, আমি ভুলে যাই কীভাবে অমানুষ হতে হয়!

প্রথম প্রকাশঃ ২০০৬

রাত একটা বেজে একত্রিশ মিনিট

রাস্তায় পা দিতেই আকাশের এমাথা-ওমাথা ফালা ফালা করে বিদ্যুৎ চমকে গেল।

নিশুতি এই রাতে লোকজন বেশি থাকার কথা না। অভ্যাসমতো জয়নুল কব্জি ঘুরিয়ে ঘড়ির রেডিয়াম ডায়ালে ছোটো কাঁটাটা কোথায় আছে দেখার চেষ্টা করল। ভারী কাচের চশমাটা একটু আগুপিছু করে দেখে বুঝল ঘড়িটা বন্ধ হয়ে আছে। কীভাবে বন্ধ হলো? সেদিনই না সাতমসজিদ রোডের মাথায় টাইম সিরিজ ঘড়ির দোকানে ঘড়িটা সারিয়ে আনল সাড়ে বারশ টাকা দিয়ে? মেকানিক ছেলেটা খুব দাঁত কেলিয়ে বললো, স্যার নিয়া যান, এক্কেরে নতুনের লাহান কইরা দিসি। এই তার নমুনা! ছেলেটা তাঁরই ছাত্র, ভাবতে কষ্ট হচ্ছে। দুনিয়া জোচ্চোরে ভরে গেছে একেবারে।

রাত দেড়টা দেখাচ্ছে। রাত দেড়টা? কীভাবে? একটু আগেই না বের হলেন? বিপত্নীক জয়নুল আহসান নিজের অসামাজিক খোলস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন বন্ধু নিয়াজের নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। আসলে নিমন্ত্রণ নয়, বন্ধুপত্নীর আত্নীয়াকে দেখানোই উদ্দেশ্য। বড়ো বিরক্ত হয়েছিল জয়নুল। কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারে নাই। রিমির অকালমৃত্যুর পর একরকম নিজেই দুটো চাল-ডাল ফুটিয়ে খান হাত পুড়িয়ে। ভালো-মন্দ তেমন খাওয়া হয় না। তাই ভিতরে ভিতরে চটে গেলেও ওরকম এলাহি আয়োজনে হাসি-হাসি মুখেই বসেছিলেন। ওদের হাত থেকে ছাড়া পেতে পেতে রাত একটা বেজে গেছিল। সাতমসজিদ রোড ধরে মাত্র পাঁচ মিনিট হেঁটেছেন। তাহলে দেড়টা হবে কেন? ঘড়িটা কি আগে থেকেই বন্ধ ছিল?

হঠাৎ ভীষণ ধন্দে পড়ে গেলেন। পিছনের ঘটনাগুলি মনে করতে গিয়ে সব যেন জট পাকিয়ে যাচ্ছে। কিছুতেই মনে করতে পারছেন না। অথচ ছোটোখাটো ব্যাপারগুলি উনি খুবই মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করে থাকেন। নোটও লিখে রাখেন। মনে পড়ছে বিয়ের কিছুদিন পর রিমির সাথে তাঁর বিরাট মনোমালিন্য এই নোট নিয়ে। বাসর রাতের পর নোটে লিখে রেখেছিলেন, ঈষৎ নাসিকাগর্জন সমস্যার কারণ হতে পারে যদিও নাকটা বাঁশির মতো আর পর্বতযুগলে সিমেট্রি নাই তেমন ইত্যাদি!

অনেক বছর আগের কথা মনে করে হেসে ফেলেও গম্ভীর হয়ে গেলেন। কিছু স্মৃতি বোধহয় কোনো দিনই ফিকে হয়ে যাবে না। রিমিকে ভোলা অসম্ভব প্রায়! ঠিক তখনই খেয়াল করলেন ধূলির এক প্রকারের ঝড় উঠেছে। বড়ো বড়ো ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ভাগ্যিস ছাতাটা সঙ্গে করে দিয়েছে ভাবি। এই তো ছাতার কথাটা দিব্যি মনে করতে পারছেন। ঘড়িটা কেন মনে করতে পারছেন না?

প্রবল বেগে বৃষ্টি শুরু হলো। বাংলা কী মাস এটা? আশ্বিন নাকি ভাদ্র? আবার দ্বন্দ্ব লেগে গেল। যেটাই হোক, এরকম ঘোর বর্ষা তো হওয়ার কথা না। ছাতাটা পুরোনোই বটে। ছাতার ফ্যাঁকাসে মেটে রঙের জীর্ণ কাপড়ের মধ্য দিয়ে চুইয়ে পড়া বৃষ্টির কণা চশমার কাচে দিব্যি জমে যাচ্ছে। বাইরে মোটামুটি তাণ্ডব শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রবল ঝড়ে গাছের মাথাগুলি যেন আছড়ে আছড়ে পড়ছে। বিপজ্জনকভাবে দুলছে। ও কী, ভেঙে পড়বে নাকি? ছাতার বাঁট শক্ত করে ধরে রাখতে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, যেকোনো সময়ে ছাতাটা উড়েই যাবে।

রিমি মারা যাবার পর ইশ্বরে আর বিশ্বাস নেই জয়নুলের। বহুদিন প্রাকটিস করেন না। অথচ নিতান্ত অভ্যস্ততায় দোয়া ইউনুস বিড়বিড় করে পড়তে শুরু করলেন। চূড়ান্ত অন্যমনস্ক বলে বিপরীত দিক থেকে আসা অটোটা ঠিক খেয়াল করলেন না।

ঘ্যাচাং করে থেমে গেল অটোটা। সাথে একটা অশ্রাব্য খিস্তি। আর একটু হলে মাড়িয়ে দিচ্ছিল আর কি!

কৌতূহলে ছাতাটা কাত করে দেখলেন অমাবস্যার মতো কালো বদখত একটা লোক মাথাটা বাড়িয়ে গালির তুবড়ি ছুটিয়েছে। দোষটা তাঁরই। কোন্‌ বদ খেয়ালে রাস্তার মাঝ দিয়ে হাঁটছিলেন, কে জানে? জয়নুল কিছু বলেন না। শুধু মাথাটা নাড়িয়ে পাশের ফুটপাথে উঠে গেলেন। তখনই দেখতে পেলেন নেমে যাওয়া যাত্রীকে।

মিস রোজি। এক ঝলক দেখেই হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলেন। এইসব সঙ্গ যথাসম্ভব পরিত্যাজ্য। কথাও বলতে চান না তিনি।

ফুটপাথের জায়গায় জায়গায় পানি জমে গেছে। ঝড়জলের রাতে ভিজে চুপসে যাওয়া হাজার পঞ্চাশ টাকা পঁচাত্তর পয়সার বাটা ছপ ছপ ছপ ছপ একটানা শব্দ তুলেছে। বামে মোড় নিলেন জয়নুল। রাস্তাটায় গাঢ় অন্ধকার এমনিতেই থাকে। রাতের বাতিগুলো অধিকাংশই নষ্ট। ঝড়ে অনিবার্য লোডশেডিং -এ আরও নিকষকালো হয়েছে আঁধার। হঠাৎ শুনতে পেলেন আরও একজোড়া পায়ের শব্দ দ্রুত তাঁর দিকে ধাবমান। কেউ কি দৌড়ে আসছে তাঁর দিকে? এ কী বিপদ?

কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা খিলখিল হাসি ছাতার নিচে চলে এলো।

স্যার, আমারে দেইখা পলাইলেন ক্যান? আমি কি বাঘ না ভালুক যে আপনারে খায়া ফালামু?

দামী সিল্কের শাড়ি, উগ্র প্রসাধন এবং সুগন্ধি আর দুর্বিনীত যৌবন… জয়নুলের এ মেয়েটিকে চেনারই কথা। তিনি যে পাঁচতলা বাড়িতে ভাড়া থাকেন, সেটার সবচে উপরের তলায় থাকে মেয়েটি। মিস রোজি এর নাম নয়; এই মেয়েটাকে তিনি ভালোই চেনেন কিন্তু বিচিত্র কারণে আসল নামটা মনে করতে পারছেন না।

বেশ খানিকটা উষ্মার সাথেই বললেন, মিস রোজি, তুমি আমার ছাতার নিচে এলে কেন? বেরিয়ে যাও এখনি।

মিস রোজির তাতে কোনো ভাবান্তর হলো না। বরং দ্বিগুণ হাসিতে ফেটে পড়ল। ভীষণ অস্বস্তিতে পড়লেন জয়নুল।

মিস রোজি! কী কইয়া ডাকলেন আমারে? স্যার কি আমার নাম ভুইলা গেছেন?

মধুর জলতরঙ্গ ঝড়জলের শব্দ ছাপিয়ে জয়নুলের কানে মধু ঢালতে লাগল। এ অন্যায়! নিজেকে মৃদু তিরস্কার করেন জয়নুল।

মিস রোজিই তো তোমার নাম ইদানীংকালে। ভুল বলি নাই। আর এরকম ভাষায় কথা বলবে না আমার সাথে।

কী ভাষায় কইতাছি? ওরে আমার বিশিষ্ট নাগর! (খিলখিল হাসি)

এই প্রকারের তারল্যে খুবই রুষ্ট হলেন জয়নুল।

তুমি এখনই বের হয়ে যাবে আমার ছাতার নিচে থেকে স্বেচ্ছায় নইলে…

নাহলে কী? ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবেন? দেন দেখি?

হাঁটা থামিয়ে একদৃষ্টে চেয়ে থাকলেন মেয়েটির দিকে। ঠিক তখনই আকাশ চিড়ে আলোর ঝলকানিতে একটা বাজ পড়ল। সেই আলোতে অনন্যসুন্দর মুখখানি দেখেই চকিতে নামটা মনে পড়ে গেল। রুনু – হ্যাঁ রুনুই তো নাম!

রুনু! কেন এরকম করছ? এত রাতে কোথায় গিয়েছিলে?

বহুদিনের অশ্রুত এ ডাকে মিস রোজি রূপোপজীবিনী ক্ষণকালের জন্য বিহ্বল হয়ে পড়ে। অতঃপর দ্রুত সামলে নেয় নিজেকে।

এত রাতে কোথায় গিয়েছিলাম? জানেন না কোথায় গিয়েছিলাম? আপনি বোকার মতো প্রশ্ন করছেন, স্যার।

ওহ সরি! তোমাকে ও প্রশ্নটা করা ঠিক হয় নাই। যাহোক, চলো এগুনো যাক। তাড়া আছে আমার। সময় নাই, পৌঁছাতে হবে খুব তাড়াতাড়ি।

মিস রোজি ওরফে রুনু যে প্রগলভতা নিয়ে ছাতার নিচে এসেছিল, তা নেই হয়ে গেল আলগোছে। এখন কেমন জড়সড় হয়ে হাঁটছে। দামী সিল্কের আঁচল প্রবল বর্ষণে বেশ ভিজে যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে প্রায় এক দশক আগের অনুপম ফুল রুনুর ছবিটা হঠাৎ ভেসে উঠল। কীভাবে যে সব তছনছ হয়ে গেল!

তুমি আরেকটু ভিতরে আসতে পার। ভিজে যাচ্ছ তো?

আসব? আপনার বিশিষ্টতায় দাগ পড়বে না তো? বাজারি মেয়ে হয়ে গেছি আমি! অকস্মাৎ খুব করুণ শোনাল কন্ঠটা।

জয়নুল মরমে বিদ্ধ হয়ে গেল যেন বাজারি হওয়ার পেছনে সেও দায়ী। অথচ তা তো নয়। গল্প শোনার মানুষ নয় জয়নুল। কাটখোট্টা ধরনের। তবুও একটা ইচ্ছে যেন অস্থির আঁকিবুঁকি কাটছে। অথচ অদ্ভুত একটা ভাব হচ্ছে, মনে হচ্ছে সময় বেশি নেই। গল্পটা শোনা হবে কিনা বুঝতে পারছে না।

রুনু, কীভাবে এসব হলো?

মানে জানতে চাচ্ছেন কীভাবে রুনু চৌধুরি মিস রোজি হলো? কী লাভ এসব জেনে?

লাভ হয়তো নাই, কিন্তু বিশ্বাস কর দুই বছর আগে যখন তোমাকে প্রথম আবিষ্কার করলাম মিস রোজি হিসেবে, আমার উচিত ছিল সবটুকু জানাটা। এটুকু সৌজন্য তোমার প্রাপ্য ছিল। আমি সেটুকুও দিতে পারি নাই। কী এক প্রচণ্ড অভিমানে তোমার সঙ্গ এড়িয়ে চলেছি। তোমার কাছে যে আমার ঋণের শেষ নাই!

ছি ছি জয়নুল ভাই, এসব কী বলছেন! আমি আপনাকে কোনো দয়া করি নাই। আমি যে আপনাকে চেয়েছিলাম!

রুনু!!

কী, এই এত বছর পরেও আমাকে বকবেন? যেমন বকেছিলেন প্রথম ধরা পড়ার পর।

জয়নুল অস্বস্তিতে পড়ে যায়।

স্যার, দোষ আমারই ছিল। আপনি পড়াতে এলে আমি শুধু আপনাকেই দেখতাম। কী ভীষণ মেধাবী একটা ছেলে ফিজিক্সের মতো চরম ফালতু একটা সাবজেক্ট পানির মতো বুঝিয়ে দিত! আপনার বুদ্ধিদীপ্ত স্বপ্নীল চোখ আর ক্যাবলাকান্ত হাসি… হায়, আঠারো বছরের একটা মেয়ের জন্য যে কী হতে পারে, সে বুঝার মতো মনই আপনার ছিল না।

এক্সকিউজ মি! ক্যাবলাকান্ত হাসি আবার কী? রেগে ওঠে জয়নুল।

বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণ নেই! গলিতে হাঁটুসমান পানি জমে গেছে। শো শো শব্দে আরও জোরে বাতাস ফুঁসছে। মুহুর্মুহু বাজ পড়ছে আশেপাশে কোথাও। সেরকম একটা শব্দে আরও ঘন সন্নিবেশিত হয়ে যায় রুনু জয়নুলের। রুনুর গুরুভার বক্ষের স্পর্শে চমকে ওঠে জয়নুল! বহুদিনের অনাস্বাদিত রক্তমাংসের স্বাদ বিস্মৃতির অতল গহ্বর থেকে যেন সহসাই উঠে আসে। কিন্তু জয়নুল কোনো অন্যায় সুযোগ নিতে চায় না। হোক সে হাইক্লাস রূপোপজীবিনী। প্রবল নিয়ন্ত্রণে চকিতে সরে আসে।

ও কী, ভয় পেলেন নাকি স্যার? খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে রুনু। অভাবে দেহ বেচি ঠিকই, তবে আপনাকে ফাঁদে ফেলার কোনোই অভিরুচি নাই আমার।

না, না ভুল বুঝবে না।

না, আমি ভুল বুঝি নাই। চিরকালের আদর্শবাদী! আপনাকে একটা সময় খুব ঘৃণা করতাম জানেন?

এখন করো না?

নাঃ, সে মনই তো আর নাই। সব মরে গেছে। বাবা মরে যাবার পর আমাদের অনেক সম্পত্তি বাবার ব্যবসার ঋণ চুকাতে খরচ হয়ে যায়। বাকীটা আমাদের পারিবারিক শত্রুতার জেরে সব হারিয়ে আমরা নিঃস্ব হয়ে যাই। আমার পড়া আর এগোয় না। পড়াশোনায় ভালোও ছিলাম না জানেনই তো। মা আর তিন ভাইবোন নিয়ে আমরা ছোটো একটা ভাড়া বাড়িতে উঠে যাই অন্য শহরে। সামান্য সঞ্চয় ফুরিয়ে আসে দ্রুত। অতঃপর একদিন মা-ও…

আমাকে জানাও নাই কেন?

অভিমানে জানাই নাই! কী ছেলেমানুষ ছিলাম, তাই না? আপনি আমাকে প্রত্যাখান করেছিলেন। মনে আছে সে কথা? বয়সের ফারাকের দোহাই দিয়ে যা-তা বুঝিয়ে… আপনি একটা যাচ্ছেতাই। আপনি এত পাষাণ কেন?

আজ এত বছর পর এই প্রশ্নের কী উত্তর দিবে জয়নুল? চুপ হয়ে থাকে। পথ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। ভিতরে ভিতরে অদ্ভুত চঞ্চল হয়ে ওঠে জয়নুল। কীসের যেন একটা তাড়া! অভ্যাসমতো কব্জি উলটে দেখে ঘড়িটা। এখনও থেমে আছে সময়।

রাস্তায় খানাখন্দ আগেই ছিল। এই আকস্মিক প্লাবনে সেগুলির ঠাহর করা মুশকিলই বটে! তারই একটাতে এই ঝড়জলের দুর্যোগে পড়ে যাওয়া বিচিত্র কিছু না। হলোও তাই। কিন্তু সিনেমার মতো মেয়েটা পড়ল না। পড়ল জয়নুল।

ছাতাটা উলটে ভেসে গেল। কোনোমতে জয়নুলকে ধরে রেখে পানিতে পড়ে যাবার হাত থেকে বাঁচালো রুনু।

এবার কোমরটা ছাড়লে ভালো হয়। খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে রুনু।

অপ্রস্তুত জয়নুল তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিতে যায়। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে আরও জোরে চেপে ধরে।

অঝোর ধারায় ঝরে যাচ্ছে বাদল। রুনুর সিল্ক ভিজে একশা। লেপ্টে রয়েছে শরীরে। জয়নুলের চোখে উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। অদ্ভুত পরিবেশ – অদ্ভুত সময় – অদ্ভুত যোগাযোগ! দুটি ঠোঁট কখন যে কী আজন্মের উত্তর খুঁজতে থাকে, কেউ জানে না। বুঝতে পারে না। দুর্যোগের ঘনঘটা ভিতরে এবং বাইরে। জয়নুলের সব প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে গেল।

ধাতস্থ হলে দুজন ছিটকে যায় দুদিকে। কিন্তু পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। এ কি ক্ষণকালের মোহ নাকি বহুকাল আগের অবহেলিত অস্বীকারী দুর্নিবার আকাংখা? দুটি হাত কেমন চিরচেনা আশ্বাসে গভীর আশ্লেষে পরস্পর ডুবে থাকে।

গন্তব্য কাছে আসতে থাকলে জয়নুলকে বেশ আন্দোলিত দেখায়। পাঁচতলা দালানের সামনে এসে থেমে পড়ে। কড়াৎ শব্দে একটা বাজ কাছে কোথাও পড়ে। ঝটিতি হাত ছেড়ে দেয় জয়নুল।

প্রবল দুঃখভরে রুনু বলে, ওঃ, বুঝতে পেরেছি। ভুলেই গিয়েছিলাম আমার সীমানা!

জয়নুলের বুকটা হাহাকার করে ওঠে। তাড়াতাড়ি রুনুর হাত দুটো নিজের বুকে চেপে ধরে। রুনু, ভুল বুঝো না! আমি তোমার উপরে অন্যায় করেছিলাম। সব বুঝেও তোমাকে প্রত্যাখান করেছিলাম অথচ তুমি তোমার সর্বস্ব দিয়ে আমাকে চেয়েছিলে। সব সঞ্চয় দিয়ে আমার পড়ার খরচও যুগিয়েছিলে। কেন করেছিলে? কেন, কেন? শোনো রুনু, সময় আর বেশি নাই। সত্যটা বলে যাই। আমি তোমাকে… রুনু জয়নুলের মুখে হাত রাখে।

বলতে হবে না, আমি জানি এবং বরাবরই জেনে এসেছি।

হঠাৎ জয়নুলকে বেশ শান্ত দেখায়। যত অস্বস্তি এবং দ্বন্দ্ব ছিল সব মিলিয়ে গেল কর্পূরের মতো। সব পরিষ্কার লাগছে এখন।

গেটের কাছে মাথা ঢুকিয়ে রুনু জয়নুলকেও ডাকে ভিতরে। কিন্তু জয়নুল নড়েন না।

তুমি যাও, রুনু। আর হয়তো দেখা হবে না! বিড়বিড় করে বলেন জয়নুল।

শেষ কথাগুলো শুনতে পায় না রুনু। যদি শুনতে পেত তাহলে দেখতে পেত যুগপৎ আনন্দ এবং বিষাদ নিয়ে কী অপার্থিব ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে আছেন জয়নুল!

অভ্যাসবশত কব্জি উলটে দেখে রেডিয়াম ডায়ালে মিনিটের কাঁটাটা এক মিনিট এগিয়েছে। একটা বেজে একত্রিশ মিনিট। জয়নুলের মুখে পরিতৃপ্তির হাসি।

একতলায় জটলা দেখে সামনে গিয়ে চিৎকার করে ওঠে মিস রোজি। সিভিয়ার হার্টএটাকে এইমাত্র মারা গেছেন অধ্যাপক জয়নুল আহসান। দেয়াল ঘড়িতে একটা বেজে একত্রিশ মিনিট।

☼ সমাপ্ত ☼

তোমাকে চাই!

আমি যাহারে চাই কাছে খুব কাছে
পাই না তাহারে, সে যে রয় দূরে বহুদূরে।
এই নিরল বিরল নিঝুম বরিষণে
আহা, কোথায় পাই তাহারে?
আহারে, সুখহীন নিশিদিন এই হৃদমাঝারে
তাহারে চাই, কেমনে পাই?
এ মন যে হায় আর মানে না রে!
আহারে, চাই তাহারে এই বুকের পরে
চেয়ে থাক সেই দুটি চোখ পরম নিষ্পলক,
নিশ্চুপ অলক মেঘভার উচ্ছ্বাসে।
আহারে, এই ব্যাকুল ঝরা রোদনে
কে আসে, অধর রাখে চাতকের ব্যথিত বেদনে?


The wanting of you!

Whom I want very close to mine,
Don’t get her, she is so far away.
Oh, where do I find her
In this quiet rare lonely rain?
Alas, these joyless days and nights
Keep crushing on me saddened with longing
I want her so deep in me, how to get her?
This heart can’t bear anymore!
Ah, I need her so badly to quench my loneliness.
Wish those eyes keep gazing in love,
Oozing with innocence.
Yet silent in the breath of lusty cloudlets.
Ah, under this disturbing sky full of cry,
Who comes, touch me
on the lips of a love-hurt shy!

এমনি ভালোবেসো!

বুকেতে এই ভালোবাসা এমনি রাখো জমিয়ে
আমায় চেয়ে যত চাওয়া এমনি ঢালো বিরহে।
তোমায় আমি পোড়াই সখি নিত্য দুখের অনলে
পারি না যে, কী ভীষণ জ্বালা সে, একটুও জুড়োতে।
আমায় তবে শাস্তি দিয়ো, আঘাতে আঘাতে করো বিদ্ধ
এই পাঁজরে সব সয়ে যাব, তবু প্রেম হোক অনিরুদ্ধ!
বুকেতে এই চাওয়া, পাগলা হাওয়া, এমনি ঝড়ে টেনে নিয়ো,
এই আদরে নীরব অভিমানে একটা অবুঝ আঙ্গুল রাখতে দিয়ো!

পাওয়া না-পাওয়া

শুনছ, কিছু অপ্রাপ্তি থাকে তো থাক
সব পাওয়ার জাদুকরি এ যুগে
কিছু না-পাওয়া অহরহ জমে যাক।
সবটা দেখা না হোক, থাকুক কিছু কল্পনা
নিত্য রচুক অদেখার জ্বালা-জানালা
দাঁড়িয়ে থেক একাকী – প্রতীক্ষায়,
এঁকো নিবিড় রঙিন আলপনা।

শত কথামালার অযাচ্য ভিড়
মুখ লুকায় খুব চাওয়ার সেই শব্দনীড়।
তবু জেনো, কিছু কথা না-বলাই থাক
অনুক্ত থাক হৃদয়ের গভীরতম ভাবনা।
বোবা ভাষায় বুঝে নিও সেসব
বুকে নিও কাছে না পাবার সব যাতনা।

কিছু রহস্য থাকে তো থাক যেন জমাট নিশুতির গল্প
সবটা জানতে চাই না, তুমিও চেয়ো না
কে না জানে সব জানায় উচ্ছ্বাস চিরন্তনী অল্প!
শুনছ, সব মিছের এই যুগে একটাই ধ্রুব সত্য
ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি
তুমি আমার, রবে যুগে যুগে
বুকে রেখ এই নিত্যতার আদিগন্ত।

ভালোবাসি প্রিয়!

আমার ভালোও তো লাগে

এই দুকুল ভাসা হৃদ-পিঞ্জরে।

নিরেট এই ভালোবাসাহীনতায়

কেউ তো আমার জন্য ভাবে।

হায়, জীবনটাই যে খরচে গেছিল

বড্ড অনাদরে, ভালোবাসার অনটনে।



এই মনই কেবল জানে কখনও চাইনি কিছু

মুখ ফুটে বলিনি কভু কাউকে – ভালোবাসি প্রিয়!

শুধুই মনোমেঘে নিরল বরিষণ

কেন কেউ বুঝেনি, বুঝতে চায়নি

আমার মগণ গহন নীরব আবেদন!

কখনও বুঝতে দিইনি, কোথায় রেখেছি

আদুরে স্বপ্নমালা আর অবুঝ চাওয়ার ব্যথা।

অতঃপর সে এলো, ভালবাসলো, রাঙালো

বর্নহীন আমার জীবনগাথা।

বললো, রাখবে এ বুকে

তোমার সর্বহারা নিঃস্ব অভিমানী মাথাটা?

আমার ভালো যে লাগে

এই স্বেচ্ছাবন্দীত্ব, এই দখলপ্রবণ আদুরে উপনিবেশ

কেউ তো আমায় বুকে তুলে নিয়েছে!

যত্নে শুধিয়েছে দুটো মামুলি কথা,

গভীর-ক্ষরা প্রেম ঠোঁটে মেখেছে।

হায়, জীবনটাই গেছিল খরচে

ভালোবাসার অনটনে

তুমি এলে, ভালোবাসলে

ছলছল এ চোখে এখন শুধু তারই অনির্বাণ রেশ!