অবশেষে!

ক্রিং ক্রিং ক্রিং… তারস্বরে মোবাইল এলার্মটা বেজে উঠল। রাত আড়াইটা।

প্রবল ঘুম-জড়ানো চোখে চয়ন সেটাকে স্নুজ করতে গিয়ে সম্বিৎ ফিরে পেল যেন! এ নিয়ে দুইবার করেছে বোধহয়। কী সর্বনাশ! তাকে যে ফ্লাইট ধরতে হবে। সে বিমান বন্দরও কাছেকূলে নয়। নৈশ বাস, হাঁটা ইত্যাদি করে মেলা পথ পাড়ি দিতে হবে। তড়াক করে লাফিয়ে উঠে কোনমতে গুছিয়ে নিয়ে, পিঠে একটা রুকস্যাক চাপিয়ে বের হয়ে গেল। সাড়ে তিনটার নৈশ বাস ফস্কে গেলে অনেক দুর্ভোগ আছে কপালে!

জমাট শীত তার থাবা বিস্তার করতে শুরু করেছে। একটা ঝুম হয়ে থাকা ঠাণ্ডা জাঁকিয়ে বসতে চাচ্ছে যেন। পথঘাট প্রায় ফাঁকাই। শুধু সদাজাগ্রত ট্রাফিকের শব্দই রাতের নিরবতাকে খানখান করে দিচ্ছে। সেদিকে তাকাবার সময় নেই চয়নের। দীর্ঘদেহি চয়ন বড় বড় পা ফেলে মুহূর্তেই পৌঁছে গেল বাসস্টপে।

এবং যারপরনাই বিস্মিত হয়ে গেল। কেউ নেই শুধু অনিন্দ্যসুন্দর এক তরুণী ছাড়া। সাথে ঢাউস একটা লাগেজ। আর আরো বিস্ময়ের সে পরে আছে একটা ময়ূরকণ্ঠী নীল জামদানি! এই শীতেও তাঁর পরনে কোন শীতের পোশাক নেই। চয়নের মনে হল, ওতে ভালই হয়েছে নইলে এমন চমৎকার দেহ-বল্লরী কি দেখতে পেত! সে বোধহয় হাঁ হয়ে গিয়েছিল! চমক ভাঙ্গল অপ্রিয়কর এক জল-তরঙ্গ কণ্ঠে।

কী মেয়েমানুষ দেখস নাই জীবনে? খবিস জানি কুনহানকার! হাঁ কইরা গিলতাছে…

আ…আমাকে বললেন? বিস্ময়ে তোতলাতে থাকে চয়ন।

হ, তুই ছাড়া আর কে আছে এইহানে?

চয়ন সামলে নেয়। আপনি অভদ্রতা করছেন কিন্তু! তুই-তোকারি কেন করছেন? কীসব আজেবাজে কথা বলছেন!

ঠিক এই সময়ে বাসটা হেলতে দুলতে চলে আসে। চয়ন ভদ্রতা করে মেয়েটাকে আগে ওঠার জন্য হাত দিয়ে ইঙ্গিত করে। মেয়েটা উঠে পড়ে এবং পেছন ফিরে চয়নকে উদ্দেশ্য করে,

সং -এর মত দাঁড়ায় আছস ক্যান? এই ভারী লাগেজ আমি টাইন্যা তুলব তুই থাকতে?

ভারী রাগ হয়ে গেল চয়নের। সে আমি কী জানি? নিজের লাগেজ নিজেই টেনে নিন।

মেয়েটা কেমন অদ্ভুত চোখে তাকাল। হঠাত চয়নের বড় পছন্দ হয়ে গেল এই মুখরা মেয়েটাকে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠিয়ে দিল। আর দেমাগি মেয়েটা গটগট করে একটা ফাঁকা আসনে গিয়ে বসে পড়ল। একটা ধন্যবাদ তো তার পাওনা ছিল নাকি?

আপনার পাশে বসতে পারি?

না, পারেন না। অসভ্য লোকদের আমি দু’চোক্ষে দেখতে পারি না।

বারে! আমি অসভ্য?

একশো বার। কিন্তু চয়নের রোখ চেপে গেল। সে ওর পাশে গিয়েই বসে পড়ল।

এ কী? বসতে মানা করলাম, তা-ও বসে পড়লেন? বেশরমও দেখি!

আরে, এখন দেখি সুন্দর ভাষায় কথা বলছেন! আমি ভাবলাম…

কী ভেবেছিলেন? ভ্রুকুটি করে তরুণী।

কী মুখে কী ভাষা! হা হা হেসে ফেলে চয়ন।

ঠিক তখনই মেয়েটাও হেসে ফেলে। হাসলে গালে একটা টোল পড়ছে। নাকের ফুলটা বাসের মৃদু আলোতেও চমকে ওঠে।

আমি মিথি মানে মিথিলা। আপনি তো চয়ন, তাই না? আপনাকে অনেক কটু কথা বলে ভড়কে দিয়েছি। প্লিজ কিছু মনে করবেন না। সেলফ ডিফেন্স আর কী! আসেন সন্ধি করি – চাঁপাকলি আংগুলে হাত বাড়িয়ে দেয় মিথিলা।

চয়নের প্রকাণ্ড কর্কশ হাতে এই পেলব হাতটুকু যেন একটু অন্যরকম পরশ বুলিয়ে দেয়। সে নিজেকে সংযত করার একটা প্রবল চেষ্টা করতে থাকে।

ও বাবা, সেলফ ডিফেন্স! তা আমার নাম জানলেন কী করে? যতদূর জানি আমি তো কেউকেটা কেউ নই! ফিল্মেও কাজ করি না। যদিও দেখতে মন্দ নই, কী বলেন?

ঠোঁট উলটে ফেলে মিথিলা। বাব্বাহ, নিজের চেহারা নিয়ে এত দেমাগ? আপনার নাম ইংরেজি বাংলা দুটোতেই লেখা আছে ঐ রুকস্যাকের ট্যাগে।

বাহ্‌, দারুণ চোখ তো আপনার! তা আপনার নিজেরও কি দেমাগ নেই?

কেন, বলেন তো? অবাক হয়ে যায় মিথি।

ন্যাকামো হচ্ছে? জানেন না বুঝি? মেয়েরা তো জানতাম খুব আয়না দেখে। এখন অবশ্য মোবাইলের সেলফি ক্যামেরাতেও দেখে।

কচু জানেন। লজ্জা পেয়ে যায় মিথি। আপনি কিন্তু ফ্লার্ট করছেন।

অ্যাঁ, করছি নাকি? ফ্লার্টিং -এর আর দোষ কী? আপনি বস্তুটাই ওরকম।

কী!! আমি বস্তু?

না মানে সবাই তো বস্তু, পদার্থ আর কী! হাসতে থাকে চয়ন।

যান, আপনার সাথে আর কথাই নাই! মেয়েদের সম্মান করতে জানতে হয়, বুঝলেন মিস্টার?

জ্বি, সে খুব ভাল জানি, মিস মিথিলা।

কে বললো আমি মিস? মিসেসও তো হতে পারি।

আপনি মিসেস?!

এতে আশ্চর্য হওয়ার কী আছে? হলে কি ফ্লার্ট করতেন না? এখন কি অন্য আসনে গিয়ে বসবেন? খুট করে হেসে ফেলে মিথি।

আপনি বড় অন্যরকম মিথিলা। বেশ সহজ। আর পাঁচটা মেয়ের মত না। তা হাসব্যান্ডের কাছে যাওয়া হচ্ছে নাকি?

ধরে নিন তাই।

সেজন্য শাড়ি পরেছেন নাকি? আপনাকে কিন্তু দারুণ দেখাচ্ছিল একেবার ঋতুপর্ণার মত!

আবার ফ্লার্ট করছেন?

এই তো আপনাদের সমস্যা। সত্যটা শুনতে চান কিন্তু বলতে গেলে তেড়ে আসেন মারতে।

মনে হচ্ছে খুব অভিজ্ঞতা মেয়েদের ব্যাপারে। তা সত্যবাদী যুধিষ্ঠির, আপনার উম্যান সম্পর্কে কিছু বলেন দেখি!

সে ডিপার্টমেন্ট -এ তো লবডঙ্কা!

এই তো মিথ্যে বলছেন। জুলফিতে পাক ধরেছে আর বলছেন কেউ নেই!

নেই তো বানিয়ে বলব নাকি? সেজন্য তো হ্যাংলার মত তাকিয়ে ফেলি মাঝেমাঝে।

সে তো দেখতেই পাচ্ছি!

কী বললেন?

নাহ কিছু না। এই বোরিং জার্নিটা ভালই লাগছে। আপনি না থাকলে হয়তো ঘুমিয়ে পড়তাম। আর কেমন ফিল্মি লাগছে তাই না?

চয়ন নিজের প্রশস্ত কাঁধটা দেখিয়ে দিয়ে, চাইলে এখনও পড়তে পারেন। ওটা ফাঁকাই আছে বহুদিন। হা হা হা।

যাহ, ফান নয়। সত্যিই আপনার কেউ নেই? যদি আপত্তি থাকে বলতে হবে না। এই অল্প সময়ের পরিচয়ে খুব বেশি তো দাবী করা যায় না, শোভনও নয়!

যদি বলি, নাকে দড়ি পরতে যাচ্ছি…

ওমা, কী মজা! সত্যিই?

তা তো খুশি হবেনই। মেয়েরা তো জন্ম থেকেই স্যডিস্ট! মজা তো পাবারই কথা!

কী যে সব বলেন না আপনি!

এরপর আর কথা হয় না। অস্বস্ত নিরবতা নেমে আসে। যেন হঠাৎ করেই একে অপরের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে চলতে থাকে। মিথিলা জানলা দিয়ে রাতের চলমান নৈশব্দের দিকে তাকিয়ে কী যেন একটা খুঁজতে থাকে। চয়নও চোখ বুজে ফেলে। মনোভঙ্গের উত্তুঙ্গ যাতনার মত কী একটা হারানোর বিষাদ দুই জনের মাঝের ছোট্ট জায়গাটিতে ভারী হয়ে বসে যেতে থাকে। কী এর মানে? জেনেও অজানার মত ভেসে বেড়াতে থাকে উত্তরটা।

মিথিলাও ঘুমিয়ে পড়ে একসময়। হঠাত ঘাড়ের কাছটায় একটা মাথার স্পর্শ পেয়ে চমকে ওঠে চয়ন। মিথিলা! কী অদ্ভুত একটা সুগন্ধ আসছে ওর শরীর থেকে। আর একটা অসহ্য উত্তাপ। সে উত্তাপ ছুঁয়ে স্রেফ মরে যেতে ইচ্ছে হল। কিন্তু এ যে অন্যায়! প্রাণপণে নিজেকে শাসাতে লাগল সে। জগতের তাবৎ ক্রূর ঘটনাগুলিই কেন ঘটে ওর সাথে? সামিন -এর আদল কেন এই যুবতীর উপরে? অলক্ষ্যে চোখ জ্বালা করে ওঠে চয়নের। ঠিক তখনই বাসটা গন্তব্যে পৌঁছে যায়।

সবাই নেমে যেতে থাকে। চয়ন মিথিলাকে আলতো করে ডাকে। ঘুম ভেঙ্গে নিজেকে চয়নের কাঁধে আবিষ্কার করে লজ্জায় এতটুকু হয়ে আসে মিথিলা।

স্যরি, কী কাণ্ড বলেন! ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আপনাকে কষ্ট দিলাম!

স্যরি কেন? আমার তো ভালই লাগল! মুখ টিপে হাসতে থাকে চয়ন।

কী! চোখ পাকিয়ে তাকায় মিথিলা কিন্তু হঠাত চয়নকে টপকে আসনের উপরের তাকে রাখা ছোট্ট হ্যাণ্ড লাগেজটা নামাতে যায়। আর তখনি ওর উন্মুক্ত নাভীমূল আর ফর্সা পেটের অনেকটা চয়নের ঠোঁট ছুঁয়ে যায়! ঘটনার আকস্মিকতায় স্থাণু হয়ে যায় দুজনেই। যুগল পর্বতের মধ্যস্থিত গিরিখাদ পেরিয়ে চিবুকের কিনারা চুমে একজোড়া হরিণ চোখে আটকে যায় চয়ন। ক্ষণমাত্র, কিন্তু তাতেই কোথায় যেন একটা ভয়াবহ ভাংচুর হয়ে যায়। সে খবর যার ভাঙ্গে, সেই কেবল জানে!

বাইরে বেরিয়ে ঠাণ্ডার প্রকোপটা বুঝতে পারে মিথিলা। একটা গরম কিছু না নেয়াটা বিরাট বোকামি হয়ে গিয়েছে। শেষ রাতের হাড় কাঁপানো হাওয়ায় মিথি থেকে থেকে কেঁপে উঠতে থাকে। নাটক-সিনেমার বহুল চর্বিত চর্বণের মত হলেও চয়ন নিজের জ্যাকেটটা দিয়ে মিথিকে মুড়ে দেয়। মিথি বাধা দেয় কিন্তু কোন কথা না বলে শক্ত হাতে তা প্রতিহত করে চয়ন।

বিমান বন্দরের ডিপার্চারের বিশাল পর্দায় যার যার গন্তব্য দেখে নেয় দুজনে। এখান থেকে আলাদা হয়ে যাবে তারা। হয়তো আর কোনোদিন দেখা হবে না। শুধু বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে একে অপরের চোখে। সেখানে কীসের একটা বোঝাপড়া যেন সব বাধা ছাপিয়ে উপচে পড়ে যাচ্ছে! কান্না পেয়ে যায় মিথির। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে, আপনার জ্যাকেটটা?

থাক, তুমিই রাখ। আমাদের বন্ধুত্বের নিদর্শন!

আর কোন কথা হয় না। ওরা বোধহয় হারিয়ে গেল চিরতরে একে অপরের থেকে…

———–০০০০০০————-

কিছু দিন পর… জ্যাকেটের পকেটে একটা চিরকুট পেল মিথিলা,

মিথিলা, ইউ আর আ টেরিব্যল লায়ার! আর একটা ফোন নাম্বার। এগার ডিজিটের।

ওপাশে রুকস্যাকের পকেটে আরেকটা চিরকুট পেল চয়ন,

চয়ন চৌধুরি, কাওয়ার্ড কোথাকার! আমি তোমাকে ঘৃণা করি। কেন বলতে পারলে না?

চয়নের হৃদপিণ্ডটা মুখে যে চলে এসেছিল, এটাও কি বলে দিতে হবে?

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Advertisements

বরং অচিনই থাকি

বরং অচিনই থাকি, কাছে না আসি
হেঁটে যাই আজন্ম সমান্তরালে
আছো জানি হাত-ছোঁয়া নাগালে
তবুও কী দুর্লঙ্ঘ দূরে!
কিছু কিছু কথা না-বলাই ভালো
চাপা থাক কিছু ব্যথা।
কিছু চাওয়া না পাওয়ায় মিশে থাক
অপ্রাপ্তিতেই পূর্ণতা পাক বিষম জ্বালা।
বরং দূরেই থাকি, নীরবে দেখি
লুকোনোই থাক ভালবাসা।
কিছু বাধা অ-পেরোনোই থাক
তৃষ্ণা হয়ে থাক কান্না-গভীর ঘুমে মাখা।
বরং অচিনই থাকি, আমায় না চিনলে
সেই ভালো, সেই ভালো
জেনেও না জানলে!

ভাল নেই আমি!

কেউ জানে না এ ব্যথা কোথায় গিয়ে জ্বালায়?
কেউ বোঝে না এ অনাদর কোথায় গিয়ে কাঁদায়?
আমায় যত পার দুঃখ দিয়ে যাও, কিছুই বলব না।
যত পার আঘাতে কর রক্তাক্ত, তবু ক্ষত দেখাব না।
কেউ জানে না চেয়ে চেয়ে কেবলি দেখি শিখরের স্থানচ্যুতি।
কেউ বোঝে না আলগোছে কখন ক্ষয়ে যায় হৃদয়ের মোহন দ্যুতি!
আমায় যত পার উপেক্ষা করে যাও, প্রতিবাদ করব না।
যত পার প্রচ্ছন্নে সরিয়ে দাও বাড়িয়ে দেয়া হাত, অভিযোগ করব না।
কেউ জানে না কোন্‌ গভীর ব্যথায় নীল হয়ে আছি এই আমি…
কেউ বোঝে না কোন্‌ অব্যক্ত অভিমানে কী বড্ড খারাপ আছি!
আমি ভাল নেই, সত্যিই ভাল নেই। তুমি কি বেশ আছ?
আমায় পুড়িয়ে কোন্‌ অনলে স্বস্তির মরীচিকা সারারাত খুঁজেছ?

একদিন তোমার কাছে যাব

একদিন তোমার কাছে যাব।
ভরা নিবিড় একাকী সাঁঝে
তোমায় করজোড়ে মাঙ্গব।
একদিন আকাশের মন ভালো থাকবে
বেদনারা নেবে ছুটি; আনন্দ ভিজে থাকবে।
সেদিন হৃদয়ের দ্বারে থাকবে না কোন আগল
দুঃসাহসী হবে তুমি। আর আমিও।
একদিন প্রতিরোধ সব ভেসে যাবে,
সেদিন দেখে নিও, দেখে নিও।
রইবে কেবল বিধুর লগন – লুপ্ত মগ্ন পাগল।
একদিন তোমার কাছেই ফিরব।
হাঁটু গেড়ে মেনে নিব আমার যত পরাজয়।
একদিন আত্মাভিমানে দিব যতি,
বলব – নিয়ে নাও, বুঝে নাও
এই দলিত মনের যাবতীয় বিষয়-আশয়।

সেই দিন দূরে নয় – জেনে রেখ
তোমার কাছেই যাব।
ভিখিরির মত হলেও একটা চুম্বন,
কালের বুকে জেগে আছে নিয়ে
অযুত দাগের বকেয়া…
ধর বাঁচার শেষ অবলম্বন –
তোমায় কাছে হাত পাতব।
একদিন তোমায় নিরাভরণ চাইব
পারস্পরিক বাঘবন্দী খেলা পিছে ফেলে
নিতান্ত সরলে গা ভাসাব।

একদিন তোমার কাছে যাব
ভরা নিবিড় জমাটি ক্ষণে
কেবল তোমায়, তোমাতে নিলীন হব।

প্রার্থনা!

একটা ভাল কিছু দাও, প্রভু
একটা অদ্ভুত কিছু দাও।
নিয়েছ সব কেড়ে – কিছুই বলি নি।
দিয়েছ দুখের উষর ভূমি – রা কাড়ি নি।
আর কত ভোগালে একটু তাকাবে?
নিন্দা করবে যে মন্দেরাও…
অন্তত একটা মন্দের ভাল দাও!
 
থেকেই যদি থাক তুমি, মৌনতা ঝেড়ে ফেল।
একটা অভূতপূর্ব কিছু বল।
মুক্তি দাও প্রভু, আমায় মুক্তি দাও।
একটা স্বস্তি মেশান হাসি দাও।
নিয়ে নাও এই জটিল জীবন, কুটিল মারপ্যাঁচ
এই বিদগ্ধ জ্ঞানের অকেজো মুখোশ –
নৈরাশ্যের ক্লেশকর দিন-মাস!
একটা নিছক সাদাসিধে জীবন দাও –
প্রত্যাশা বিহীন…
আমায় একটা ভাবনাহীন প্রহর দাও
যার কবোষ্ণ আলোয় দেখব গহীনের আমিকে।
যতই থাকুক অপূর্ণতা কিংবা পতনের হাহাকার,
ভালবাসব তাকে। যত দীন হোক না সে
তুলে নেব এই দু’হাতের অতল-ছোঁয়া স্পর্শে!
একটা নির্বোধের জীবনই দাও তবে!
ডুবে থাকি দিন-আনি-দিন-খাই সুখের
কন্টকহীন প্রস্রবণে!
 

একটা ভাল কিছু দাও প্রভু,
একটু দয়া দেখাও।
কারুকাজের জটিলতা আর চাই না – ফিরিয়ে নাও।
আমায় আনমনে একটা সহজিয়া সুর ভাজতে দাও!

 

প্রচ্ছন্ন রূঢ়তা

কোনো কোনো কথা জন্মান্তরের দাগের মত লেগে যায়
কোনো কোনো গরল অমৃতের মুখোশে হত্যার সনদ পায়!
জানা কথা – যাবতীয় তির বোঝেই না লক্ষ্যের চাপা ক্ষত
কী আসে যায় যদিবা অপ্রস্তুতে হয় আহত কিংবা নিহত!

কেউ কেউ অহেতুক রূঢ়তায় খুঁজে আত্মপ্রসাদ
আঘাতে আঘাতে ব্যথিত বুক – নিষণ্ণ নাভিশ্বাস।
কারো কারো দেখার চোখ থেকেও নেই –
শুধুই ব্যবচ্ছিন্ন আঁধার – অসংবেদি রাশি রাশি।

কারো ক্রুর হাসি সাদা চোখে তাচ্ছিল্যেরও কিছু বেশি
কারো বুকে স্রেফ বিঁধে যায় অফেরতা কথামালা
বোঝে না হায়, কারো স্বভিমান পায় নির্দয় ফাঁসি!

কোনো কোনো কথার ছাপ নির্মোচ্য পদচিহ্ণ রেখে যায়।
থেকে থেকে জাগে ক্ষরণকাল – আঘাতে দুর্মর!
কোনো কোনো বিষাদ নিশাতি উল্লাসে
ফিরে ফিরেই ভাঙ্গে বুকের পাঁজর।

—————————————
শব্দার্থঃ
নিষণ্ণঃ অবস্থিত
ব্যবচ্ছিন্নঃ কাটা-ছেঁড়া করা হয়েছে এমন।
অসংবেদিঃ সংবেদনশীল নয় এমন।
নির্মোচ্যঃ মোছার অযোগ্য।
দুর্মরঃ কিছুতেই মত বদলায় না এমন।
নিশাতঃ ধারালো, তীক্ষ্ণ অর্থে।

একটা রিমোট গাড়ির বেদনা

মনে পড়ে বহুদিন আগে
একটা রিমোট কন্ট্রোলড্‌ গাড়ির জন্য
কত কান্নাটাই না কেঁদেছি।
মনে পড়ে মিলিদের দোতলায়,
মিলনের উদ্ধত মুখ।
ধরে রেখেছে একটা লাল গাড়ি –
কালো ডোরায় পাশ কাটা।
আর আত্মরম্ভিতায় স্ফীত বুক!
মনে পড়ে, সব মনে পড়ে
একটা ঝা চকচকে চার চাকার লোভ…
পাঠিয়েছে তার কাকা
সুদূর আমেরিকায় যার নিত্য থাকা।
মনে পড়ে ছোট্ট বুকে অপ্রাপ্তির দাবানল ক্ষোভ,
মিলিদের করুণা মিশ্রিত হাসি –
যেন ধন্য করেছে চাখতে দিয়ে
আরাধ্যের সুখ – রাশি রাশি!

মনে পড়ে মাকে কত জ্বালিয়েছি।
শপথ করেছি সুবোধের অলীক অসম্ভব মন্ত্রে!
ভালো হয়ে যাবো মা, একটুও দুষ্টুমি করবো না।
কিনে দেবে একখানা রিমোট গাড়ি?

আজ মনে পড়ে, খুব মনে পড়ে…
হঠাতই যেন বুঝে যাই কতকাল আগের
মায়ের অসহায় মুখ, তাতে বেদনার আঁকিবুকি!
অবুঝ শিশুর কাতর চাহনি…
বুঝবে সে কীসে? নিত্য টানাপোড়ার
অকথ্য দর কষাকষি!

মনে পড়ে কতকাল আগে
একটা অধরার জন্য কত কেঁদেছি।
আজও তাই আনমনে হেঁটে যাই খেলনার ভূবনে।
রিমোট গাড়ির পাশে এখনো চাই জুলজুলে চোখে।
দাঁড়িয়ে থাকে সময় অবধূত ঔদাসীন্যে,
আর আমার আহত শৈশব।
এখনো সুযোগ পেলেই সেটি
হ্যাংলার মত বিমুগ্ধ হারাতে চায়…

একটা রিমোট গাড়ির বেদনা
এ জীবনে যে ভুলবার নয়!!