নীরব অভিমান

চোখ ভরে আসে তপ্ত জলে,

কার উপর কীসের অভিমানে

বুকের জমিনে আহত শ্রাবণ নামে?

কী দিই জবাব যদি কেউ শুধায়?

জানা নেই, কিছু যে জানা নেই

কেন কাঁদে এই মন ব্যাকুল নিরুপায়।

দৃষ্টি যে তার শূন্য মলিন উদাসে

বুক ভাঙে পাঁজরের সস্তা দামে!

কে রোধে কণ্ঠ সারাবেলা

এই বিষন্ন আকুলি হুতাশে?

চোখ ভিজে যায় নোনা সন্তাপে

অমোঘের মেঘে জ্বলে

না পারার নি:স্ব প্রখর দহন।

কে হাসে যা কিছু ঘটেছে ভালো

তার সবটুকু আমূল খুইয়ে,

সর্বহারার উথল অভিমানে?

তাই নীরবতা, তোমায় চেয়েছি কাছে।

তুমি যে আজ আমার

বড়োই একান্ত আপন!

ফ্লার্টিং

– আপনার নামটা যেন কী?

নাম তো আমি বলিইনি!

– বলেননি! এখন তবে বলেন।

চাইলেই সব হয়, তাই বুঝি ভাবেন?

– নামই জানতে চেয়েছি, ঠিকুজি না!

বললেই সব উগরে দেবো, তাই না?

– আপনাকে চিনি না, ঝগড়া আমি চাই না

ওমা, কোথায় ঝগড়া? এ তো বাস্তবতা!

– আপনার দেখছি বড্ড বেশি দেমাগ!

সবারই তাই থাকে হলে খানিকটা সজাগ।

– হার মানছি, কেন মিছে লড়ে মরছি?

কে চেয়েছে? দিন না লড়াইয়ে যতি!

– আচ্ছা, এখন তবে নামটা পেতে পারি?

ও বাবা, কীভাবে? পরিচয় হলো নাকি?

– সেকি! হয়নি? এই তো আছি পাশাপাশি দিব্যি।

আপনি বড্ড গায়েপড়া, এভাবে কেউ বলে কি?

– আহা, নামই শুধু জানতে চেয়েছি, অন্যকিছু চাইনি!

এভাবেই সবে বলে, ভাজা মাছটি যেন উল্টোয়নি!

– আপনি তো দেখি অসাধারণ পেঁচুক!

কেউ জানি কলিকালের সরল ভাবুক!

– উফ! পেরে ওঠাই দায়, দস্যি মেয়ে বাবা!

এবার তবে থামি, কথা না বাড়ুক, টাটা।

– কিন্তু এ লগ্ন প্রেমের আবিরে মগ্ন, যাবে বৃথা?

ওমা, কবি নাকি? পালিয়ে বাঁচি, নেই যে আশা!

– অনেক হয়েছে, এবার নাহয় একটু মিল করি?

কী চাইছেন, তাই তো জানিনা, কীসে হবে কী?

– নামটা যেন কী? দুত্তরি ছাই, তলই না পাই!

নাম কটকটি। চলবে? নইলে আর না এগোই।

– হা হা হা, তবে ছলনা নয়, সত্যি?

হি হি হি, তাহলে আর বলছি কী!

বিজনবাবুর লঘুদণ্ড

এখানটায় একটু বসতে পারি?

প্রশ্নটা শুনে বিজনবাবু বেজায় ক্ষিপ্ত হয়ে গেলেন।

এটা পার্কের পাবলিক বেঞ্চ। সবারই বসার অধিকার আছে। আমাকে অহেতুক জিজ্ঞেস করার মানেটা কী? ইতোমধ্যে বিজন শীলের ভ্রুটা কুঁচকে গেছে।

তাতে অবশ্য আগুন্তুকের কোনো ভাবান্তর হলো না। একগাল হেসে ফেললেন।

স্যার মনে হয় বেশি কথা পছন্দ করেন না? ভদ্রতা করেই জিজ্ঞেস করেছি। আজকাল ভদ্রতা কিংবা সম্মান কেউ করে না, তাই না?

তা করবে না কেন? খুব করে। বামপাশেই তাকিয়ে দেখেন। লীলা চলছে, লীলা।

মধ্যদুপুরে একটা ঝোঁপের ফাঁকে কলেজ পালানো দুই তরুণ-তরুনী বেশ খানিকটা অন্তরঙ্গ হয়ে বুঁদ হয়ে আছে একে অপরে। আশেপাশে কে দেখছে কোনো ভাবান্তরই নেই, লজ্জাও নেই!

সেদিকে তাকিয়ে আবারও হেসে ফেলল আগুন্তুক।

ওদিকে না তাকালেই হয়। আপনি দেখছেন কেন?

আমি দেখছি কেন? পোড়াচোখ এখনও সবই দেখে। আচ্ছা, নাই দেখলাম। কানে তো আর খাটো হয়ে যাইনি। রিটায়ার করেছি কিন্তু সব ইন্দ্রিয় তো দান করে দিইনি!

স্যার খুব সুন্দর কথা বলেন। কী পড়াতেন? বাংলা?

এই যে তখন থেকে বকবক করে যাচ্ছেন, আপনি কে বলেন তো? বিজন শীল মোটা বাইফোকালের ভেতর দিয়ে উৎসুক মুখে চেয়ে থাকেন। আমার প্রাক্তন ছাত্রদের কেউ নয়তো?

কেন, স্মৃতি কি ক্ষয়ে গেছে? ইন্দ্রিয় তো সব ঠিক আছে শুনলাম। হাহা।

দেখেন, এমনিতে আমার মেজাজ ভালো নেই আজকে। বাড়ি থেকে রাগ করে বের হয়ে বসে আছি এই জঘন্য প্রেমমঞ্চে। আমার সাথে মশকরা না করলেই খুশি হবো।

মাফ করবেন যদি মশকরার মতো শোনায় আমার কথা! আচ্ছা, ত্রিশ বছর আগে একটা দুপুর মনে করিয়ে দিই। তখন করিমগঞ্জ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে বাংলাই পড়াতেন। বছর দশেকের একটি ছেলে বাংলায় বড়ো কাঁচা ছিল। সে পড়তে আসত আপনার কাছে। আপনি তার প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। অনুরক্ত শব্দটার সঠিক প্রয়োগ হয়েছে তো, স্যার?

কে, কে আপনি?

তারপর একদিন সুযোগ বুঝে এমনি চৈত্রের কোনো এক দুপুরে আপনি তাকে জবরদস্তি করলেন।

এই, আপনি থামবেন? কীসব বকতে লেগেছেন? কে আপনি? চেঁচিয়ে ওঠেন বিজন শীল।

চেঁচাবেন না। কাহিনিটা শোনেন আগে। তারপর যুবক বিজন শীল বড়ো ঘাবড়ে গেল। ভয়ার্ত শিশুটিকে দেখে নিজের অনিবার্য পতন দেখতে পেলেন। অতঃপর দুহাতের জোর দেখালেন কচি গলার চারপাশে। জংগলের গভীরে পরিত্যক্ত কুয়ায় ফেলে দেবার আগে বিস্ফারিত চোখের ভাষাটা কি মনে পড়ে, স্যার?

কে, কে তুমি? তপন?

আমি কে সেটা ব্যাপার না! আপনাকে শুধু মনে করিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। খুব ভালো। স্মৃতিতে এখনও মরচে ধরেনি তাহলে?

বাবা তপন! আমাকে ক্ষমা করে দে, বাবা! আমার ভুল হয়েছিল। হাতজোড় করেন বিজন।

ক্ষমা? খুব সহজ না, স্যার? আমি চাইলেই আপনাকে চরম শাস্তি দিতে পারি। কিন্তু সেটা করব না। আপনাকে গুরুপাপে লঘুদণ্ডই দিলাম। যান, লঘুদণ্ডই নিন। বিদায়!

পরের যা ঘটল তা স্রেফ ইতিহাস। আজকের টিকটক প্রজন্ম লুফে নিল দৃশ্যটা। ঘন্টায় লাখ ছাড়িয়ে গেল শেয়ার।

শহরের একমাত্র পার্কে মধ্য দুপুরে একজন বৃদ্ধ ব্যক্তিকে কিছু অত্যন্ত আপত্তিজনক কুরুচিপূর্ণ যৌন ভঙ্গীমায় দেখা গেল। বুড়োটা শূন্যের সাথে বেকুবের মতো কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে!

বিজন শীল সজ্ঞানেই সব করছেন। বেশ বুঝতে পারছেন কী করছেন, কিন্তু তাঁর কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই! অন্যভুবনের কেউ যেন নিদারুণ রোষে সব করিয়ে নিচ্ছে।

বিজনের মনে হলো এর থেকে মৃত্যুই ভালো ছিল!

সাক্ষাৎকার

‘স্যার কি চলে যাচ্ছেন?’

রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে যাবার মুহূর্তে বছর সাতাশ কিংবা আটাশের এক মেয়ের হন্তদন্ত মুখে প্রশ্নটা শুনে থমকে দাঁড়ালেন সদ্য চল্লিশের কোঠায় একজন সৌম্যদর্শন মানুষ।

প্রায় দেড়ঘন্টা ধরে তিনি শহরের বেশ নিরিবিলি এই জায়গায়টায় অপেক্ষা করেছেন। তাঁর সময়ের দাম আছে। সময়ের অপচয় তিনি ভালোবাসেন না। তবুও অপেক্ষাটা করেছেন কারণ প্রতিশ্রুতি দিলে সেটা রাখেন এ সময়ের প্রখ্যাত রহস্য গল্প লেখক অধ্যাপক আহমেদ হাসিব।

একটা ফোন অবশ্য করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটাও করেননি। তাঁর বিশ্বাস যা ঘটে, তার পেছনে কোনো না কোনো কারণ থাকেই। রহস্য থাক বা না থাক। তিনি আগ্রহভরে অপেক্ষা করেন কখন সেটি স্বমহিমায় প্রকাশ পাবে।

‘হ্যাঁ, সেরকমই আমার ধারণা!’ ভারী কাচের চশমা ভেদ করে ভীষণ গাম্ভীর্য এনে দুই ভ্রু উঁচিয়ে উত্তর দিলেন আহমেদ। মেয়েটি হকচকিয়ে গেল।

সরি, স্যার। আপনাকে এতক্ষণ বসিয়ে রেখেছি। কিন্তু আমার না কোনো উপায় ছিল না। সাক্ষাৎকারটা আমার খুবই দরকার। খুব কাঁচুমাচু মুখ করে বলল অনসূয়া।

এবারে আহমেদ হেসে ফেললেন। চমৎকার ভুবনভোলানো হাসি।

এত লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। যদিও রিপোর্টার হয়ে দেরী করে আসাটা ভালো কথা নয়। কিন্তু আমি কিছু মনে করিনি। আমার আরেকটা জায়গায় যাবার কথা আছে। এজন্য আর অপেক্ষা না করে উঠে পড়েছি। কী যেন নাম আপনার?

অনসূয়া, স্যার।

হ্যাঁ, অনসূয়া এবারে তাহলে আর হলো না! আরেকদিন হবে, কেমন?

অনসূয়া শশব্যস্তে হা হা করে উঠল। আপনার বেশি সময় নিব না, স্যার। ঐ পার্কের পাশেই তো পার্ক করেছেন আপনার নিশানটা। ওখানে যেতে পাঁচ মিনিট লাগবে। হাঁটতে হাঁটতেই কথা হোক যদি অনুমতি দেন?

ভালোই নাছোড়বান্দা দেখছি আপনি! আচ্ছা, চলুন। পাঁচ মিনিটের বেশি কিন্তু আমি দিতে পারব না। ওকে, শুট!

শেষ বিকেলে সূর্য ডুবি ডুবি করছে। পার্কের শতবর্ষী গাছগুলোর ফাঁক দিয়ে কমলাটে কুসুম আলো এসে পড়েছে মেয়েটির মুখে। এতক্ষণে ভালো করে খেয়াল করলেন অকৃতদার আহমেদ। মেয়েটি ভীষণ সুশ্রী। চমৎকার দেহসৌষ্ঠব। উচ্চতাও গড়পড়তা বাঙালি মেয়েদের থেকে বেশি।

আচ্ছা, শুরু করা যাক। স্যার, ভূত কি আছে?

সত্যি বলব? না, ভূত নেই! সব বাজে কথা।

সেকি, স্যার! ভূত-প্রেত নিয়ে লিখেই যাচ্ছেন প্রায় দশ বছর। এখন বলছেন, ভূত নেই!

দেখুন, লেখাটা একপ্রকারের মনোরঞ্জনের বিষয়। মানুষ ভয় পেতে ভালোবাসে। যা সে জানে না, সেটা নিয়ে মানুষের নানান জল্পনা থাকে। আসলে আঁধারকে ভয় মানুষের। আমরা সেটিকেই ভাঙিয়ে খাই আরকি!

এটা কি অফরেকর্ড রাখব?

না, সবই ছাপতে পারেন। যারা বিশ্বাসী, তাঁদের আপনি এভাবে চোখে আঙ্গুল দিয়েও কিছুই বুঝাতে পারবেন না। আঁধারের ভয় এক অদ্ভুত জিনিস। ভয়ের সাথে তীব্র আকর্ষণও। ব্যাপারটা হয়তোবা শুরু হয় মাতৃজঠর থেকে। আঁধারের মধ্যেই তো ডুবে থাকি। অতঃপর আলোর সন্ধানে বের হয়ে আসি। তারপর কোনো এক অব্যখ্যেয় কারণে সব ভুলে যাই। অন্ধকারের প্রাচীন অভিজ্ঞতা তখন অজানা ভয় হয়ে চেপে থাকে।

তাহলে এই যে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও নানা ভৌতিক ঘটনা ঘটছে, সেগুলি শুধুই জল্পনা-কল্পনা?

হ্যাঁ, ভালো করে খতিয়ে দেখলে বুঝা যাবে, সবকিছুর পেছনে কিছু না কিছু কার্যকারণ আছে। ভূত স্রেফ কল্পনাপ্রবণ মনের আদুরে বিলাসিতা।

আচ্ছা, আপনার জীবনে কি কোনো ভৌতিক কিংবা অলৌকিক কিছু ঘটেছে?

টাইম ইজ টিকিং, ইয়াং লেডি! আর দুই মিনিট।

তাহলে দ্রুত বলেন। আমি বেশি সময় নিব না।

অনেস্টলি বললে, ভূতের দেখা আমি পাইনি এখনও। কিন্তু আমার কল্পনাটা আবার বড়োই বিস্তৃত। অসুবিধা হয় না। বরঞ্চ নিজের লেখা পড়ে বেশ বিস্ময়াভিভূতও হই মাঝেমধ্যে।

মানে বলছেন যে সবচে ভালো ভূতের গল্প আসে নিতান্ত ভূতে অবিশ্বাসীর কাছ থেকে? আপনার মতো একজন প্রথিতনামা লেখকের সৃষ্টি কিন্তু সেটাই নির্দেশ করছে।

আমার লেখার গুণ নিজে বিচার করতে পারি না! তবে, বলতে গেলে ব্যাপারটা সেরকমই। হাহাহা।

আচ্ছা, স্যার আর বেশি সময় নিব না। সময়ও নেই আমার! ক্লিক করে ছোট্টো রেকর্ডারটা বন্ধ করে অধ্যাপক আহমেদের হাতে দিয়ে দিলো অনসূয়া।

এটা তো আপনার রাখার কথা! আমাকে দিচ্ছেন কেন? অবাক হয়ে গেলেন আহমেদ।

স্যার, আপনার নিশানটা বোধহয় রাস্তার ওপারে। দেখুন তো একটু?

আহমেদ সেদিকে চেয়ে বললেন, হ্যাঁ, ওটাই আমার!

তারপর পাশ ফিরে আরও কিছু বলার জন্য ফিরে দেখলেন, অনসূয়া নেই। আজব ব্যাপার তো! কিছু না বলেই চলে গেল! বিদায় বলার সংস্কৃতি বোধহয় উঠে যাচ্ছে এখন। এমনই ঝপ করে আসে, ঝপ করে যায়। কী একটা অদ্ভুত জেনরেশন!

সন্ধ্যে হয়ে এসেছে। আহমেদ আর দাঁড়ালেন না।

গাড়িতে বসেই একটা কল পেলেন সাপ্তাহিক রোমাঞ্চের সম্পাদকের কাছ থেকে। খবরটা শুনেই প্রচণ্ড ধাক্কায় বিহ্বল হয়ে গেলেন অধ্যাপক আহমেদ হাসিব। রহস্য বিষয়ক রিপোর্টার অনসূয়া আবেদীন সাক্ষাৎকার নেবার জন্য বের হয়ে গুরুতর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। সৌজন্যবশত তাঁকে খবরটা জানালেন।

এই বিয়াল্লিশ বছরের জীবনে একবারও অদ্ভুত অব্যাখ্যেয় কিছু ঘটেনি তাঁর জীবনে। তবুও নিরন্তর লিখে গেছেন কল্পনার জাল বুনে। আজ একটি ঘটনা সব ওলটপালট করে দিলো। এতক্ষণ কাকে সাক্ষাৎকার দিলেন তিনি? গায়ে একেবারে কাঁটা দিয়ে উঠল।

আহমেদ হাসিব সেই যে লেখা ছেড়েছেন, আর কোনোদিন কিছু লিখেননি। তবে, এখনও মাঝেমধ্যে রেকর্ডকৃত আলাপটা শোনেন তিনি। মেয়েটি তাঁকে এভাবে জব্দ করে চলে যাবে, ভাবতেও পারেননি কখনও! মেয়েটির জন্য একটা অদ্ভুত ভালোবাসা লালন করতে থাকেন তিনি।

ব্যত্যয় (Anomaly)

ক্রায়োজেনিক চেম্বারের স্বচ্ছ ঢাউস জানালা দিয়ে বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছে লিঙ্গমুক্ত দুনিয়ার দুই গবেষক – ১২১৩৯৩ এবং ১৯৬৪১৮।নামের প্রচলন বহু আগেই লুপ্ত হয়েছে। সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত করাটা সরল এবং কার্যকর। আর সেই সাথে অনেক অনুভূতিও বাতিলের খাতায় নাম লিখিয়েছে।

অনুভূতির পুরাতাত্ত্বিক গবেষণা তুলনামূলকভাবে একটি শিশু বিজ্ঞান। কয়েকজন প্রাচীনবাদী সত্তা সহস্র বছরের পুরোনো ধ্যানধারণার পুনর্জাগরণ চান। চরম মিনিমালিস্ট সমাজে এমন চিন্তা স্রেফ পেছনে হাঁটার নামান্তর হলেও তাঁরা থেমে থাকেননি।

এই গবেষণার জন্য অনন্ত ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা হয়েছে দুজন নরনারীকে। লিঙ্গ দিয়ে এভাবে ভেদাভেদ করাটা এখন হাস্যকর এবং কুরুচিকর হলেও ১২১৩৯৩ এবং ১৯৬৪১৮ সেটা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। তাদের কাছে কাগজ নামক বিলুপ্ত একটা মাধ্যম দিয়ে বেশ কয়েকটা তথ্যভান্ডার এসেছে। প্রাচীন এক লাইব্রেরির ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এগুলোকে নাকি বই বলা হতো। অদ্ভুত হেয়ালিপূর্ণ শব্দের সমাবেশ। তাদের মাথায় বসানো জেটাফ্লপ বায়োচিপ বাক্যে শব্দগুলির ব্যবহার বিশ্লেষণ করেছে।পারস্পরিক আকর্ষণজনিত উদ্ভট কথামালা! তবুও গবেষণার খাতিরে ভালোবাসা এবং কবিতা নামক ব্যাপারগুলো হজম করতে হচ্ছে ওদের।

এখন দেখা যাক কী হচ্ছে সেই ক্রায়োজেনিক গবেষণাগারে? ঘুম থেকে জাগানো দুই প্রাচীন নরনারী প্রবল আলিঙ্গনে রত। ছেলেটির কাঁপা কাঁপা আঙ্গুল মেয়েটির ভরাট ঠোঁটের সঙ্গমে। অদ্ভুত সংক্রামক দৃশ্য! এসবের চল উঠে গেছে সহস্র বছর আগে।

কিন্তু হঠাৎ কী হয় বুঝা যায় না! ১২১৩৯৩ নিজের ঠোঁটে অজান্তে হাত দিয়ে ছুঁয়ে ফেলে। কোনো এক বিষম আলোড়নে সে কাঁপছে! ঘাড় ঘুরিয়ে চোখে চোখ রাখে ১৯৬৪১৮। ১২১৩৯৩ কে কাছে টেনে আনে। নিছক অনুকরণই হয়তো!

অনন্য কৃত্রিম প্রাণ ইউ-০ রিপোর্ট লিখল।

সাংঘাতিক ব্যত্যয়! ১২১৩৯৩ এবং ১৯৬৪১৮ কে আশু কোয়ারিন্টিনে নেবার সুপারিশ করা হলো। অভিযোগ গুরুতর। নিষিদ্ধ বাতিল অনুভূতি প্রকাশ করে ফেলেছে। সত্তার পোলারিটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে কীভাবে প্রকাশ পেল, এটি যথেষ্ট কৌতূহলউদ্দীপক হলেও আরো নিবিড় পর্যবেক্ষণের দাবীদার।

ভালোবাসা এমনই। ব্যত্যয় হয়েও হয়তো বেঁচে থাকবে অনন্তকাল!

যতীনের ইলিশ

যতীনের একটা ইলিশ খাবার বড়ো শখ হয়েছে। তেলেতুলে একাকার আবার ডিমভরাও হতে হবে। রুপার মতো চকচকে ইলিশের চার আনা সাইজের আঁশগুলো বুড়ো আঙ্গুলের নখ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তুলবে। মালতীর হাত থেকে আঁশবটিটা কেড়ে নিয়ে নিজেই পাখনা, লেজ আর মাথাটা কাটবে। ইলিশের মনকাড়া সুগন্ধী রক্তে রাঙা হাত একটু শুঁকেও নিলো সে এক ফাঁকে। মালতীর রান্নার হাত বড়ো ভালো। কিন্তু এই চ্যাপ্টা পাকা ইলিশটা সে নিজেই রাঁধবে। মাঝেমধ্যে খুব ভাবে থাকলে সে এই কাজটা করে।

এই যে হারামজাদা যতীন, এই গুঁড়ি গুঁড়ি বিষ্টিতে পথের মাঝে দাঁড়ায় থাকলে হবে? একটা মাছ টানতেই ক্লান্ত হয়ে গেলি? খেঁকিয়ে উঠলেন রহমত শেখ।

গম চুরির পবিত্র টাকায় শেখের ব্যাটা বিরাট হোমড়া-চোমড়া লোক। বাজারের সবচে বড়ো ইলিশটা তিনিই কিনেছেন। আর দেখিয়ে দেখিয়ে নেওয়ার জন্য ভাড়া করেছেন তাঁর গুদামের বস্তাটানা নিয়মিত মজুর যতীনকে। কিন্তু খেলাটা জমছে না ভালো। শালা থেকে থেকেই তাল হারাচ্ছে। থমকে দাঁড়িয়ে খালি মিটিমিটি হাসে চোখ বন্ধ রেখে।

এ নিয়ে তিনবার এমন হলো। কোথায় উৎসুক জনতার মৎসজনিত প্রশ্নের জবাব যতীন দিবে তা না, ভাবুকসম্রাটের জন্য দুইবার তাঁকেই বলতে হলো। ভিতরে ভিতরে ম্যালা চটে গেলেন।

চারবারের বেলায় ধৈর্যচ্যুতি হলো। বাদলার দিনে এমনিতেই আলো মরে এসেছে অনেক আগে। ছাতা আর মাছসহ যতীন যথারীতি চোখ বুজে মিটিমিটি হাসছে। কাছে এসে কষে একটা লাথি ঝেড়ে দিলেন।

ছাতাটা ছিটকে পড়ল সাথে মহার্ঘ ইলিশটাও। রাস্তার কাদায় উল্টে যতীন মাখামাখি হয়ে গেল। দৃশ্যটায় বহুক্ষণের জমানো রাগ উপশমের মলম খুঁজে পেল যেন রহমত শেখ।

কিন্তু যতীন নির্বিকার উঠে দাঁড়াল। মুখের মিটিমিটি হাসিটা একটুও নিভেনি।

বাজান, লাত্থি দিলেন ক্যান? ভুইল্যা যাইয়েন না হাজার হইলেও আমি আপনার পোলা!

কী, কী কইলি তুই? তোর জিভ টাইন্যা ছিঁড়্যা ফেলমু!

আহা, রাগ করেন ক্যান? কাছে এসে মনে মনে দেখা ইলিশটার মতো রহমতের গায়ে হাত বুলাতে থাকে যতীন।

একটা অদ্ভুত পরিবর্তন হতে থাকে রহমত শেখের। কোনো এক অব্যখ্যেয় কারণে তিনি আর  কোনো খিস্তি করতে পারছেন না। পেট আর পিঠটা কেন জানি সুড়সুড় করে উঠল। হালকা চাকা চাকা পুরো শরীর জুড়ে। নিজের শরীরের বেলিফুল আতরের তীব্র গন্ধ ছাপিয়ে একটা হালকা আঁশটে গন্ধ নাকে এসে ঘাঁই মারতে থাকল। যতীন সেরকমই ঘোরলাগা মিটিমিটি হাসি চালিয়ে গেল।

গভীর রাতে দুইদুইটা ইলিশ পেয়ে যারপরনাই আহলাদে গলে গেল যতীনের বউ মালতী। একটা ছোটো আর একটা বিরাট সাইজের। গায়ে চার আনা সাইজের আঁশ। ওটার মুখে আবার একটা সোনার চেন লাগানো।

তাড়াতাড়ি ঘোমটা টেনে যতীনের মুখে একটা ঠোনা মেরে বলল, মরণ আমার, যতীন শেখের মাথা ঠিক আছে নি?

খুব অন্তরঙ্গ ভাবে থাকলে মালতী যতীনকে যতীন শেখ বলে ফেলে মাঝেমধ্যে।  

গল্পগুলি গাঁজাখুরি!

পিতা : কাপুচিনো

সকালে কাপুচিনো খেয়েছিল মুনিয়া। সে থেকেই তার পেটটা গর্ভবতীদের মতো বড়ো হতে থাকল। সকালে কাপুচিনো ছাড়া আর কিছু খায়নি সে। প্রচন্ড বিবমিষা। বিকেল হতে হতেই সে স্পষ্ট নড়াচড়া টের পেল। কে জানি একটা লাথিও মারল ভেতর থেকে।  মুনিয়ার পার্টনার চুন্নু একরাশ বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে। একসঙ্গে থাকার চুক্তিবলে চুন্নুর দ্বিমত করা বারণ। হাল সমাজে এমনই চলছে। চুন্নু মাথা দুলিয়ে বলতে থাকল, অবশ্যই কাপুচিনো খেয়েই তুমি গর্ভবতী হয়ে গেছ। এই সংবাদ সে বাইফাইতে (বায়ো ওয়াইফাই) দিয়ে দিলো। চুন্নু একজন প্রতিষ্ঠিত মূর্খ তার্কিক। তাই অন্য সবাই বলামাত্রই মেনে নিল। এই একবিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে কারও বিশেষ কোনো মাথাব্যথা নেই। বাইজেনরা (বাইফাই এর বিদগ্ধ তালমার* সমাজ) সবাই অতি দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেল যে নিশ্চিত ভাবে কাপুচিনোটাই অনাগত সন্তানের পিতা। ২০০০ : ১০ ভোটে তা সাদরে গৃহীত হলো। বিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ ভোটটা দিয়েছেন গন্ডমূর্খ উপাধিধারী প্রফেসর জগলু। বহু বছর আগে মগজের ফ্রন্টাল লোবের ঐতিহাসিক আরোপিত পরিবর্তন প্রমাণ করে তিনি হাসির পাত্র হয়েছেন। সিরামটা তাঁরই তৈরি। পুরো প্রক্রিয়াটাকে নয় ঘন্টার মধ্যে এনে ফেলেছেন। অথচ গর্দভগুলোর সেটা বুঝার ক্ষমতাই নেই। যুক্তি আর সমালোচনা এখন কাউকে করতে দেখা যায় না। তবে এই খেলাটায় তিনি বড্ড আনন্দ পান। এখন যেমন জংগলের মতো গোঁফের তল দিয়ে হাসতে হাসতে বিড়বিড় করে বলছেন – হ্যাঁ, কাপুচিনোটাই তোমার সব্বনাশ করেছে!

*তালমার সম্প্রদায় – যারা তেল মেরেও তালগাছটি আমার তত্ত্বে প্রাণপাত করে বিশ্বাসী।

প্রকৃতির ডাক

বিমানের আসনে বসামাত্রই মবিন মিয়ার পেটটা মুচড়ে উঠল। বিয়ানে সোয়াকেজি উঠানের ধারে আধাপাকা টাট্টিখানায় দিয়ে এসেছিল। এখন তো লাগার কথা না। তারপর ম্যালা কাঠখড় পুড়িয়ে বিমানে উঠেছে। মুসা মিয়া বাপেরে উঠায় দিয়েই চম্পট মেরেছে। মবিন মিয়া প্লেনের বামও বুঝে না, ডানও না! দরদর করে ঘামছে। বায়ুর নিম্নচাপ ছোটোবেলায় দেখা সাইক্লোনের তান্ডবের মতো ঠেকছে। আর পারল না সে। চটের থলে থেকে প্লাস্টিকের লাল বদনাটা বের করল। এদিকওদিক তাকিয়ে নিমেষে প্লেনের দরজাটা খুলে বাইরে গেল মবিন মিয়া প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে। সবাই হায় হায় করে উঠল। এই ডাক যে একবার শোনে সে কি আর উপেক্ষা করতে পারে? খালি ত্যাগের আশায় শুধুই ঘামতে থাকে।

ছাগী

ক্যামডেন মার্কেটে বেশ কয়েকটা পুরোনো জিনিসের দোকান আছে। পার্থ জেনিকে নিয়ে বেড়াতে এসেছে। জেনি নাকি কোনোদিন এখানে আসেনি। মেয়েবন্ধুর আবদার ফেলা দুঃসাধ্য! জেনির সবই ভালো কিন্তু অত্যন্ত ন্যাকামি করে। এত বিরক্ত লাগে মাঝেমধ্যে। এই এখন যেমন ইজিপসিয়ান ধাপ্পাবাজটার হাতে সিল খাচ্ছে। সাধারণ একটা আংটি উচ্চমূল্যে কিনে দিতে হলো। অতঃপর বেশ পুরোনো জিনিসে ঠাসা একটা নিরিবিলি আফ্রিকান দোকানে ঢোকা হলো। বেশি খদ্দের নেই! জেনি স্বভাবসুলভ আহ্লাদি করে এটা ধরে তো ওটা ছাড়ে। পুরো দোকান একেবারে তছনছ করে দেবার জোগাড়। একবার বহুমূল্য একটা শোপিস ফেলেই দিয়েছিল প্রায়। মোটামতো বৃদ্ধা দোকানি একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে যেন এখনই ভস্ম করে দেবে। পার্থ গিয়ে সেই আগুনে লাইন অভ সাইট ভন্ডুল করে দিলো। হাজার হোক তার বান্ধবীকে সেই বুড়ির রোষানলে পড়তে দিতে পারে না।

এমন সময় জেনি চেঁচিয়ে উঠল। সে একটা ছাগীর মুখোশ পেয়েছে। সেটা সে পরে দেখতে চায়। মুখোশটার দিকে তাকিয়েই পার্থ নাক-মুখ কুঁচকে হেসে ফেলল। অত্যন্ত জীবন্ত যেন এখনই ম্যাহ করে উঠবে। মুখোশটা ধরামাত্রই বুড়ি তেড়েফুঁড়ে এলো। একগাদা সতর্কবাণীতে যা বুঝা গেল – সব জিনিস সবার জন্য নয়! জেনির এটা পরা যাবে না। সে বারবার একই কথা ভাঙা রেকর্ডের মতো বলতে থাকল।

কুসংস্কার পার্থ মোটেই মানে না। জেনিও না। বিত্তবান ঘরের আদুরী ভাবল দোকানি বিরক্ত হয়েই ভালো জিনিসটা ওকে দিতে চাচ্ছে না। সে যা চেয়েছে, বরাবর তা-ই পেয়ে এসেছে। ঐ ছাগীর মুখোশ তার চাই চাই-ই! পার্থ কিছুক্ষণ বুঝাবার চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিলো। ম্যালা বাকবিতণ্ডার পর নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও বৃদ্ধা রাজী হলো। ভাবখানা এরকম – মারা খেতে চাইলে খাও গিয়ে। আমার কী!

রাস্তায় একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করল পার্থ। কোন্‌ ফাঁকে জেনি যে মুখোশটা পরে নিয়েছে, খেয়ালই করেনি। মুখোশটা বেশ ভালোভাবে সেঁটে গিয়েছে জেনির মুখে। একটু বেশিই নিঁখুতভাবে। কলকল করে একটানা আগামাথাহীন কথা বলে যাচ্ছে জেনি। তাকে যে একটা আস্ত ছাগীর মতো দেখা যাচ্ছে এটা যেন সে খেয়ালই করছে না। অজানা আশংকায় বুকটা ধ্বক করে উঠল।

ছয়মাস পরের কথা। মানুষের নানান পোষ্য প্রাণির প্রীতির কথা শোনা যায়। কিন্তু একটা অভিজাত অ্যাপার্টমেন্টে কেউ একটা দুগ্ধবতী ছাগী পুষতে পারে, এ নিয়ে পার্থর প্রতিবেশীদের বিরাট কানাঘুষা। ওঃ, জেনি নামের আহ্লাদী মেয়েটাকে আর কোথাও দেখছে না কেউ! পার্থর কোলে থাকা ছাগীটা ম্যাহ্যাহ্যা করে উঠল।

কাকেদের একদিন

ঘন বরষার সন্ধ্যায় পাড়ার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতেই শান্ত একটা কাক হয়ে গেল। কীভাবে এই রুপান্তর হলো, বুঝা গেল না। কেউ দেখতে পেয়েছিল কিনা তাও জানে না। অবশ্য অমন ঝুম বৃষ্টিতে নিমেষে জমে যাওয়া হাঁটু পানিতে একমাত্র শান্তর মতো আধাপাগলই সান্ধ্যভ্রমণে বের হবে। কিন্তু এত পাখি থাকতে কাকই কেন হতে হলো তাকে? কাকপক্ষীটাকে তার খুবই অপছন্দ। কেমন কুতকুতে চোখে তাকিয়ে থাকে। স্পষ্ট অনুভূতি হয় যেন পর্যবেক্ষণ করছে। এই কদিন আগেও গুলতি দিয়ে একটাকে লাশ বানিয়ে দিয়েছিল। যদিও ইচ্ছা ছিল না, কিন্তু হয়ে গেছে আরকি!

কাক তো হওয়া গেল, কিন্তু এই প্রবল বর্ষণে ভেজা কাক হয়ে থাকা ভালো ঠেকল না ওর। পাখা ঝাপটিয়ে বরই গাছের ডালে গিয়ে বসল। উড়তে বেশ লাগছে কিন্তু এই বৃষ্টিটা অসহ্য হয়ে গেল। একটু উষ্ণতা দরকার। সে তার কাকচক্ষু দিয়ে কোনো একটা পাখির বাসায় আতিথ্য গ্রহণের অভিপ্রায়ে ইতিউতি তাকাতে লাগল। বরইয়ের ঘন পাতা ভেদ করে কাছেই একটা বাসা দেখতে পেল। সেটা যে আরেকটা কাকের বাসা, এ সে কী করে বুঝল, কে জানে?

পুরুষ পাখিটি এগিয়ে এল। সাথে চোয়াড়ে চেহারার আরও দুটি কমবয়সী পাখি। অজানা কারণে ব্যাপারটা ভালো ঠেকল না শান্তর।

আপনাকে স্বাগতম যদিও আমরা আপনাকে চিনতে পেরেছি। কাকেদের নিয়ম অনুসারে আমরা আতিথেয়তায় কোনো ত্রুটি রাখব না। কিন্তু আপনাকে ছাড়বও না। শেষের বাক্যটি চোয়াড়ে চেহারার বাচ্চা কাকগুলি সমস্বরে বলল। শুনে শান্তর কাকের রক্ত হিম হয়ে গেল। মানে কী এর?

গুরুতর জখম হয়ে বরইয়ের ডাল থেকে পড়ে যাওয়াটা শান্ত নিমেষের মধ্যে দেখে ফেলেছিল। কিন্তু শেষ দুঘন্টায় যা চলছে তা অবিশ্বাস্য! শুকনো বরই পাতার আরামদায়ক কুশনে হেলান দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে তাকে। চোয়াড়েদের একটা কোত্থেকে দুটো জোনাক ধরে শান্তর তাকিয়ার সামনে জ্বালিয়ে দিয়েছে। আর তরতাজা কতগুলো কেঁচো খেতে দিয়েছে। কেঁচোটা গিলতে গিলতে শান্ত মনে মনে বলে উঠল, জীবন হয় সুন্দর!

তিনটি কাকই বিন্যাস আর সমাবেশ করে কা কা করে উঠল। যার মানে দাঁড়ায়, আমাদের পুরোপুরি জেন্টস ক্লাব করে ফেললেও আমরা কৃতজ্ঞ! ঘষেটি বেগম আমাদের জীবন জ্বালিয়ে খেয়েছিল। আয়েসে পাখা নড়াতে নড়াতে শান্তর মনে হলো গুলতি দিয়ে মেরে ফেলা কাকটা মহিলা ছিল সম্ভবত।

মাছি

মাছি মারতে গিয়ে একটা আস্ত মাছিই গিলে ফেলল রন্টু। এমন নয় যে সে হাঁ করে ছিল। একটা নীল মোটাসোটা মাছি চোখের সামনে ঠোঁটের ভাঁজ খুলে ঢুকে গেল। প্রাণিসমাজে আত্মহত্যার কথা অজানা নয় তবে একটা মাছি এরকম করবে তা অন্তত রন্টু ভাবতে পারেনি। মাছিটা গেলার পর রন্টুর আম খাওয়াটা লাটে উঠার কথা কিন্তু সেরকম কিছুই ঘটল না। বরং রমিজুন বিবি আনন্দে আটখানা হয়ে গেলেন। তাঁর আমে অরুচি ছেলে নিজে থেকে দুটো আম চেয়ে নিল। এ খুশি তিনি কই রাখবেন?

আম-ঘুমে রন্টু দারুণ মত্ত। ফুলি ঘরের কাজ শেষে স্বামীর পাশে মাত্র শুয়েছে। এই ভরা দুপুরের নিরিবিলিতে একটু আদরসোহাগ সে চাইতেই পারে। সে রন্টুকে একটা মৃদু গুঁতো দিলো। সংকেত আরকি! রন্টু অভ্যাসবশেই একহাতে ফুলিকে টেনে বুকের উপর ফেলল কিন্তু তার ঘুম ভাঙে না। ঠোঁট ফুলায় রন্টুর অষ্টাদশী বউ। অভিমানে বুকের উপর কান পেতে দেয়।

মাছির একটানা ভনভন কারও অজানা থাকার কথা না। লোকটার বুক এবং নাক থেকে অবিকল সেই শব্দই আসছে।

বিকেলে হাঁটে গেল রন্টু আর তার ছোটো ভাই মন্টু। মাথায় এক ঝাঁকা আম। প্রচুর আম হয়েছে এবার। ভালো বিক্রির আশায় ফুলির জন্য একটা লাল ছাপা শাড়িও দেখে ফেলল সে। দিনের আলো কমে আসছে। মাগরিবের আজান পড়ে গেল। ঝট করে দাঁড়িয়ে রন্টুর মনে হলো সে কিছুই ভালো দেখতে পারছে না। দুহাতে চোখ কচলাল ভালো করে। সবই ঝাপসা থেকে ঝাপসাতর হচ্ছে। অবস্থা আরও খারাপ হবার আগে সে চিৎকার করে ডাকল, মন্টু আমারে বাড়ি নিয়া চল।

রমিজুন আর ফুলি বিবি দুজনেই সুর করে কাঁদছে। লেপা উঠানের মাঝখানে চিকন সুরের কান্নার রাগিনী ভেদ করে পুরো ব্যাপারটা গোড়া থেকে চিন্তা করে দেখতে চাইল রন্টু। কিন্তু খুব অলসতায় পেয়ে বসেছে। ঝিমঝিমে ঘুমঘুম ভাব। এরই মাঝে ত্যক্ত করছে মতিন মুন্সি। অনবরত কীসব পড়ে যাচ্ছে, রন্টু ঝিমুনিতে কিছুই ঠাহর করতে পারল না। রাত বাড়লে মতিন তাঁর হাদিয়া নিয়ে পাট গুটালো বটে কিন্তু রন্টুর তেমন পরিবর্তন হলো না। পাকঘরের পাশে ঝুপড়ি লেবুগাছের পাতার নিচে জড়সড় হয়ে তাকে বসে থাকতে দেখে ফুলির কেমন ভয়ভয় করতে লাগল। ‘মানুষটা কি পাগল হয়া গেল?’

সবচে বড়ো অঘটনটা হলো এক্কেবারে কাঁচা বিয়ানবেলায়।  

গাইটাকে খড় আর পানি দিয়ে লাউয়ের মাচান থেকে শাক ছিঁড়তে গিয়ে আম বাগানের দিকে চোখ গেল ফুলির। প্রত্যন্ত গ্রামে বাগানের মধ্যে প্রকৃতির ডাক সারা সাধারণ বিষয়। ব্যাপার সেটা না। এই ভোরে ওখানে উপুড় হয়ে শুয়ে আছে মন্ডলের পো। সদ্য নিঃসৃত ধোঁয়া ওঠা হলুদাভ মানব বর্জ্য বিভোর হয়ে শুঁকছে রন্টু মন্ডল। ফুলি বিবি ওখানেই মূর্ছা গেল।  

নিরল বাদলে একলা মনপাখি

এই নিরল ধারাপাত একটানা প্রপাতে
কী আশ্চর্য চাপা মূক!
আলগোছে ভিজে যায় নির্মম এ শহর
আর ভিজে তোমায় চেয়ে কেবল বঞ্চনা চুমে
উদাসীন কোনো এক নিঃসঙ্গ বুক।
এই নিরেট যন্ত্রণা অভিমানের জল পেয়ে
কী অদ্ভুত কাতর আর্দ্র!
যোজন যোজন দূরে, আয়ত চোখের তপ্ত নীড়ে
তাকেও কি ছুঁয়েছে এই অবুঝ বেদনার্ত?
এই রোদনের একলা বাদল,
কেন বাজাও মন কেমনের চাপা মাদল?
বুক ভাঙে, পাঁজর ভাঙে
আর ভাঙে মনপাখি নিষেধের যত আগল!

মন ভালো নেই আমার

মন ভালো নেই আমার
মিলন-মেলা যে ভেঙ্গে গেল।
তিলে তিলে গড়া ঠাসবুনোটের বাঁধন
আজ নিমেষে গুঁড়িয়ে গেল!

রুদ্ধশ্বাসের ক্রুর নীরবতা
অস্বস্ত ছন্দে বহমান।
বুক ভাঙার তীব্র ব্যথা
ফেনায় মনো-নদীর মোহনায়।
আজ পূর্ণতা পেল অগোচরে জমা
অন্তর্লীন যত অযাচ্য শূন্যতা!

আমি নির্বাক হয়ে শুধু চেয়েই রই।
পাড় ভাঙা নদীর মতো
বিনাশের আদিম উল্লাস,
এতটুকু ছোঁয় না আমায়।
আমি কান পেতে শুনি
ভাঙনের নিগুঢ় ধ্বনি।
আস্তাকুঁড়ে সহসা ফেলে দেয়া
স্মৃতির মালাগুলি কেবলই হাতড়ে ফিরি।

মন ভালো নেই যে আমার।
মেলা শেষের শশ্মান-নৈঃশব্দে
আমি আজ স্তব্ধ।
কেঁদে কেঁদে ডেকে চলে স্মৃতির পাপিয়া
ফিরে পেতে চায়
হারিয়ে ফেলা যত অবুঝ স্বপ্ন।

মন ভালো নেই আমার…

দশটি অনুকবিতা

১. 

মন্দির জ্বলে, মসজিদ ভাঙে

লোভী হায়েনারা হাসে।

বিশ্বাস পুড়ে, শেকড় ছিঁড়ে

কে দেখে মানবতা কাঁদে?

২.

আমি তোমাদের কেউ নই

কেউ নও তোমরা আমার।

তবুও থাকি পাশাপাশি

যেন চিনি জন্ম-জন্মান্তর!

৩.

দিনগুলি গড়াচ্ছে দ্রুত

যেন বল্গাহীন ত্বরণ

নুয়ে যাচ্ছি, ক্ষয়ে যাচ্ছি

বিদ্রুপে অমোঘ মন্দন!

৪.

নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবো

কী ভয়ানক মূঢ়তা!

তুমি যে কিছুই নও

জানো কি পরম সত্যটা?

৫.

ভিড়ের মাঝেও একা আমি

তুমিহীন শূন্যতা

কোলাহলেও নৈশব্দ ছুঁই

বুঝ কি এই যন্ত্রণা?

৬.

ভালোবাসতেই হবে এমনটা নয়;

অনাদরে রেখো না।

আড়ম্বরের চুম্বন নাইবা পেলাম

শুধু অনীহা পুষো না!

৭.

হাসিমুখ তোমাদের বিস্মিত করে

সুখ তোমরা পাও না।

চোখের তারায় নিখাদ দুর্বোধ্যতা

দুখও তোমরা জানো না।

৮.

জীবনের কোনো বিশেষ মানে নেই

এবেলা স্বীকার করে নাও।

যাপনের কোনো দৃঢ় কারণও নেই

অহেতুক মোহপাশে যতি দাও।

৯.

মুখে বলো ভাই ভাই

ভেতরে ঘৃণার সীমা নাই।

মনে নাকি কিছু নাই

অথচ নিনাদে নিকুচিটাই!

১০.

যার যার আমিটাই বড়ো

আর সব ফাঁকা

অহংভারে পিষ্ট থাকো

চক্ষু দুটি বাঁধা।